বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে বাংলাদেশের অর্জন কী
· Prothom Alo

এক মাসের বেশি সময় ধরে বিশাল কর্মযজ্ঞের পর পর্দা নামল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর বিশ্বকাপ ফুটবলের। ৩২টি দল থেকে পরিবর্তন করে এবার ৪৮টি দলের খেলা ছিল। প্রায় পাঁচ লাখ জনসংখ্যার কেপ ভার্দে থেকে শুরু করে ৪৬ লাখ জনসংখ্যার দেশ পানামা বিশ্বকাপ আসরে খেলে এল। যে দেশের নামই অনেকে জানত না, সেই কেপ ভার্দের দারুণ খেলে ফুটবলপ্রেমীদের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
Visit betsport.cv for more information.
চূড়ান্ত পর্বে স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের নৈপুণ্যে ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার পরাজয় হলেও এই পরাজয় হয়েছে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশের কোটি কোটি আর্জেন্টিনাপ্রেমী ফুটবল সমর্থককে কাঁদিয়ে স্পেন শিরোপা অর্জন করেছে। আর্জেন্টিনার ফাইনাল খেলার দিন সেই দেশের কোনো পত্রিকা বিশেষ সংখ্যা বের করেছিল কি না, চোখে পড়েনি; কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম আলোসহ অনেক পত্রিকা ফিফার এই ফাইনাল খেলা নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল।
চার বছর পরপর এ দেশের মানুষদের বিশ্ববাসী চেনে। ফক্স স্পোর্টসের খেলার মাঝেমধ্যে ঢাকায় ফুটবল দর্শকদের উন্মাদনা দেখে বিশ্ববাসী। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও বাংলাদেশের সমর্থক গোষ্ঠীর উন্মাদনা নিয়ে প্রতিবেদন করে আসছে। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়।
দেশের ফুটবল ফেডারেশন থেকে শুরু করে এই জায়গায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দীর্ঘদিন ধরে ছিল। ফলে ফুটবল পরিচালনায় পেশাদারত্বের ঘাটতি, দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব, পরিকল্পনার অভাব ও জবাবদিহির সংকট খেলাটিকে পিছিয়ে দিয়েছে।
বিশ্বকাপ ফুটবলে নিজেদের আসর না থাকলেও মূলত লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী কয়েক যুগ ধরে বাড়ছে। বাসাবাড়িতে প্রিয় দলের রং করা থেকে শুরু করে পতাকায় পতাকায় ছেয়ে যায় পুরো বাংলাদেশ। ফলে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার কারণে ওই দুই দেশের কোচ ও খেলোয়াড়েরা ভালো করে জানেন, বাংলাদেশে তাঁদের একটি বড় সমর্থক গোষ্ঠী আছে, যা তাঁরা সংবাদ সম্মেলনেও স্বীকার করেন।
আমাদের দেশের শিশুরা মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পে, ইয়ামাল কিংবা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের নাম জানে। তাঁদের খেলার ধরন, ব্যক্তিগত জীবন, ক্লাব ক্যারিয়ার—সবকিছু নিয়েই আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু একই শিশুকে যদি বাংলাদেশের জাতীয় দলের প্রথম একাদশের খেলোয়াড়দের নাম জিজ্ঞাসা করা হয়, অনেকেই উত্তর দিতে পারবে না।
শুধু শিশু নয়, আমাদেরও যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তাহলে গুগল করে জানতে হবে। এটা দোষের নয়, এটি দেশের সামগ্রিক ফুটবলব্যবস্থার ব্যর্থতারও প্রতিফলন। কারণ, মানুষ সফলতাকে অনুসরণ করে। যখন দেশের ফুটবল নিয়মিত ভালো ফল করতে পারে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের আগ্রহ বিদেশি ফুটবলের দিকে ঝুঁকে যায়।
বাংলাদেশ কেন বিশ্বকাপ ফুটবল খেলতে পারে নাএ–ই যখন দেশের ফুটবলপ্রেমীদের অবস্থা, তখন নিজ দেশের ফুটবলের খবর কী? যে দেশে ছেলেমেয়েরা মেসি, নেইমার, এমবাপ্পে কিংবা ইয়ামালদের জার্সি পরে ঘুরে বেড়ায়, সে দেশে ফুটবলের অবস্থান বিশ্বমঞ্চে কত? পাঁচ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে থেকে যখন ১১ জন খেলোয়াড় কেপ ভার্দে পাঠাতে পারে, সেখানে ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ কেন পারে না?
এ প্রশ্ন তুললাম এই কারণে যে আমাদের দেশের মানুষ যতটা ক্রীড়ামোদী, অনেক দেশ বিশ্বকাপ ফুটবলে খেললেও সেই দেশের মানুষ ততটা আগ্রহী নয়। এই ধরুন জাপানের কথা, যেদিন ব্রাজিল ও জাপানের ম্যাচ ছিল, সেই ম্যাচের খবর দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন থেকে শুরু করে পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় ছিলই না। অথচ দেখেন, আমরা নিজেরা ফুটবল নিয়ে পুরো মাস মাতিয়ে রেখেছিলাম। চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছিলাম। কিন্তু নিজ দেশের ফুটবল উন্নয়নে গত এক মাসে কোথাও আলোচনা হয়েছে বলে আমার চোখে পড়েনি।
বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশে উন্মাদনা নতুন নয়বাংলাদেশের এককালের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হিসেবে ফুটবলই এগিয়ে ছিল। মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। ঢাকা স্টেডিয়াম কিংবা দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে একসময় মাইকিং করে মাঠে দর্শকদের আনা হতো। ঢাকায় আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচ ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হতো বলে অনেকের কাছ থেকে শোনা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেটের উত্থান এবং ফুটবলের ধারাবাহিক অব্যবস্থাপনার কারণে এই জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে।
ফুটবলার তৈরির সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো নিয়মিত মাঠে খেলা। জেলা-উপজেলা কিংবা ইউনিয়নে যেসব ফুটবল মাঠ ছিল, তা অনেক জায়গায় হারিয়ে গেছে কিংবা ক্রিকেটের মাঠ হয়ে গেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও উন্নয়নের কারণে অনেক মাঠ হারিয়ে গেছে।
শিশু-কিশোরদের খেলার সুযোগ কমে গেছে। আবার যেখান থেকে ফুটবলের কারিগরেরা বের হবে, সেই স্কুল পর্যায়ে অনেক বিদ্যালয়ে নেই ভালো কোনো মাঠ কিংবা ফুটবলসামগ্রী। এ কারণে ফুটবলহীন প্রজন্মই বেড়ে উঠছে। আগ্রহ দেখাচ্ছে না সরকার। ফুটবলের উন্নয়নে বিগত সরকার যেমন আগ্রহ দেখায়নি, নতুন সরকার কতটা আগ্রহ দেখাবে, তা নিয়ে সংশয় আছে।
এবারের বিশ্বকাপে ফুটবল যেভাবে ‘পলিবলে’ রূপ নিলদেশের ফুটবল ফেডারেশন থেকে শুরু করে এই জায়গায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দীর্ঘদিন ধরে ছিল। ফলে ফুটবল পরিচালনায় পেশাদারত্বের ঘাটতি, দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব, পরিকল্পনার অভাব ও জবাবদিহির সংকট খেলাটিকে পিছিয়ে দিয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাঝেমধ্যে দেশের ফুটবলদের অর্জন কিছুটা পরিবর্তন এলেও তা কিছুতেই প্রত্যাশিত অর্জনের মধ্যে নেই। বিশ্বমঞ্চে এখনো আমরা পিছিয়ে। ফিফার ২১১টি দেশের র্যাঙ্কিংয়ের মধ্যে বাংলাদেশের (পুরুষ) ফুটবলে অবস্থান ১৮১।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের নারী ফুটবল আশার আলো দেখিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য এনে তারা প্রমাণ করেছে, সুযোগ, প্রশিক্ষণ ও সঠিক পরিবেশ পেলে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরাও ভালো করতে পারে। নারী দলের এই অগ্রগতি পুরুষ ফুটবলে প্রভাব পড়েনি।
বাংলাদেশ ক্রীড়ামোদী দেশ, এটা প্রমাণের প্রয়োজন নেই। জাতিগতভাবে আমরা খেলাধুলা ভালোবাসি। কিন্তু ফুটবলকে এগিয়ে নিতে হলে সরকারকেই আগ্রহী হতে হবে। বিশেষ করে দেশের জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফুটবলের প্রচারণার জন্য নিয়মিত খেলাধুলার আয়োজন করতে হবে। ফুটবলার হান্টিং প্রজেক্ট হাতে নিতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দারুণ খেলছে বাংলাদেশের মেয়েদের জাতীয় ফুটবল দলমনে রাখতে হবে, ফুটবল কখনোই জাতি ও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে না। ফুটবল মূলত দক্ষতা, চর্চা ও সুযোগের বিষয়। আপনি যখন ফুটবলকে ব্র্যান্ডিং করবেন, ফুটবলারদের সুযোগ-সুবিধা দেবেন, মাঠ তৈরি করবেন, খেলার আয়োজন করবেন, পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে প্রচারণা চালাবেন, তখন দেশে ফুটবলের উন্নতি ঘটবে।
যে দেশের মানুষ ভিনদেশি খেলোয়াড়দের নিয়ে মাতোয়ারা, সেই দেশ ফুটবলে পিছিয়ে থাকতে পারে না। প্রয়োজন পড়লে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পেশাদার খেলোয়াড় ও কোচদের সহায়তা নিন। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ সরকার যদি তাদের আহ্বান করে, তাহলে নিশ্চয় তারা সাড়া দেবে।
দিন শেষে ফুটবলের এই মাদকতা আমাদের চলুক। এখন সময় এসেছে নিজেদের মাদকতাকে শক্তিতে রূপান্তর করার। বিদেশি দলের জার্সি পরে উল্লাস করার পাশাপাশি নিজের দেশের ফুটবলের প্রতিও সমান দায়িত্ববোধ তৈরি হোক। নীতিনির্ধারক, ফুটবল প্রশাসক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষ—সবাইকে সম্মিলিতভাবে জাতীয় ফুটবলের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে। একদিন বাংলাদেশও বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াবে—সে প্রত্যাশা কোটি বাঙালির হৃদয়ে।
ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: [email protected]