বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় যে ভাষায় দুজন ছাড়া আর কেউ কথা বলতে পারেন না
· Prothom Alo

বাংলাদেশের সবচেয়ে কম মানুষের মধ্যে প্রচলিত একটি স্বতন্ত্র ভাষা রেংমিটচার টিকে থাকার খবর কয়েক বছর ধরে আলোচিত হচ্ছে। বান্দরবানের ম্রো জনগোষ্ঠীর ছয়জন এই ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন। কমতে কমতে এই সংখ্যা তিনজনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সেই তিনজন আবার একই পরিবারের তিন ভাই। তাঁদের একজন সম্প্রতি মারা যাওয়ার পর রেংমিটচা ভাষায় কথা বলা লোকের সংখ্যা দুজনে দাঁড়াল। তবে এই ভাষা এখনো বোঝেন, টুকটাক জানেন কিন্তু অনর্গল বলতে পারেন না, এমন সাতজন এখনো বেঁচে রয়েছেন। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিলুপ্তির একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে ভাষাটি।
Visit mwafrika.life for more information.
বান্দরবানের আলীকদমের কয়েকটি পাড়ার ১০ জন মানুষ এই ভাষা জানতেন। এর মধ্যে তিন ভাই সাবলীলভাবে এই ভাষায় কথা বলতে পারতেন। গত ৫ মে ওই তিন ভাইয়ের একজন মাংওয়াই ম্রো ৬৬ বছর বয়সে মারা যান। এখন তাঁর দুই ভাই কেবল এ ভাষায় কথা বলতে পারেন। সব মিলিয়ে এখন রেংমিটচা ভাষা জানা মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ জনে। গবেষকেরা বলছেন, রেংমিটচা জানা যে গুটি কজন আছেন, তাঁরাও পরিবারে ম্রো ভাষায় কথা বলেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা ভাষাটি জানেন না বলে তাঁরা বাধ্য হন ম্রো ভাষায় কথা বলতে। আর পরিবারের ভেতরে ভাষাটির চর্চা না থাকায় এটি বিলুপ্তির কাছাকাছি চলে গেছে।
গত মঙ্গলবার মুঠোফোনে কথা হয় মাংওয়াই ম্রোর ভাইয়ের ছেলে সিংরা ম্রোর সঙ্গে। সিংরা নিজেও ভাষাটি জানেন, তবে সাবলীলভাবে বলতে পারেন না। সিংরা ম্রো মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর চাচা মাংওয়াই ম্রো মারা যাওয়ার পর তাঁর বাবা মাংপুং ম্রো (৭৪) ও আরেক চাচা রেংপুং ম্রো (৭০) এখন এই ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন। তবে তাঁরা দুজন দুই পাড়ায় থাকেন।
আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের রেংমিটচা ভাষা নিয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন গবেষক আফসানা ফেরদৌস। তাঁর গবেষণার মাঠ জরিপ অনুযায়ী, সাবলীলভাবে কথা বলতে পারা দুই ভাই, অর্ধভাষী (ভাঙা ভাঙা বলতে পারেন) স্তরে দুই নারীসহ তিনজন ও মোটামুটি জানা চারজনসহ নয়জন জীবিত ব্যক্তি রেংমিটচা ভাষা জানেন। একক কোনো পরিবারের মধ্যে ভাষাটি এখন আর টিকে নেই বলে জানান তিনি। গবেষক আফসানা ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, রেংমিটচা সাবলীলভাবে জানা দুই ভাই পৃথক দুই ম্রোভাষী পাড়ায় থাকেন। কুনরাও (৬২) ও কুনরাও (৬৫) একই নামের দুই বোন ভাষাটি জানেন ভাঙা ভাঙা। তাঁরা থাকেন ক্রাংসিপাড়ায়। আবার ওই পাড়াতেই থাকেন সাবলীলভাবে রেংমিটচা বলতে পারা মাংপুং ম্রো। কিন্তু তিনজনই থাকেন আলাদা পরিবারে। আরেকজন অর্ধভাষী থোয়াইনলক ম্রো (৬৪) থাকেন মেনসিংপাড়ায়। পরিবারে চর্চা না থাকায় ভাষাটি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। ভাষা পারিবারিক চর্চায় টিকে থাকে এবং পরিবার থেকেই মানুষ ভাষা শেখে।
বিভিন্ন পাড়ার সাতজন রেংমিটচা ভাষা জানলেও এখন সবলীলভাবে কথা বলতে পারেন রেংপুং ম্রো (বামে) ও তাঁর ভাই মাংপুং ম্রোআলীকদম উপজেলার দুর্গম ক্রাংসিপাড়া, মেনসিংপাড়ার রেংমিটচা ভাষাভাষী ও স্থানীয় ম্রোদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় রেংমিটচা ভাষা হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কথা হয়েছে। মাংপুং ম্রো, সিংরা ম্রো ও কুনরাও ম্রো জানিয়েছেন, ব্রিটিশ শাসনের শেষের দিকে ও পাকিস্তানের প্রথম দিকে রেংমিটচা পাড়াগুলোতে গুটিবসন্ত ও কলেরা ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় কয়েক বছর পরপর মহামারিতে রেংমিটচা পাড়াগুলোর বহু মানুষ মারা যায়। মহামারিতে বনসুপাড়া, কুইকিপাড়া, রানিপাড়াসহ বেশ কয়েকটি রেংমিটচা পাড়া উচ্ছেদ হয়ে যায়। এমনিতে জনসংখ্যা কম, মহামারিতে আরও দুই–তৃতীয়াংশ কমে যাওয়ায় তাঁরা ম্রোভাষাভাষী পাড়াগুলোতে বসবাস শুরু করেন। ম্রোদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে জড়াতেও বাধ্য হন। এভাবে রেংমিটচা ভাষাভাষীরা ম্রো ভাষাভাষীদের সঙ্গে মিশে যান।
পরবর্তী সময়ে রেংমিটচা ভাষাভাষীরা একত্র হওয়ার চেষ্টা করেছেন। ক্রাংসিপাড়াসহ কয়েকটি ছোট পাড়া তৈরি হয়েছিল। ১৯৮০–এর দশকে পার্বত্য অঞ্চলের অশান্ত পরিস্থিতিতে পাহাড়ের ছোট ছোট পাহাড়ি পাড়াগুলো আবারও উচ্ছেদ হয়ে যায়। সেসব পাড়ার লোকজন আবার বড় ম্রো পাড়ায় বসবাস শুরু করেন। ম্রোদের সঙ্গে মিশে গিয়ে ধীরে ধীরে রেংমিটচা ভাষার চর্চা হারিয়ে যায়। এই ভাষার পরিবারগুলো ভেঙে যায়। পরিবারের কথোপকথন না হওয়ায় রেংমিটচাভাষী সবাই ম্রো ভাষায় কথা বলা শুরু করেন।
গবেষক আফসানা ফেরদৌস তাঁর গবেষণায় রেংমিটচা ভাষার বিলুপ্তির পথে ধাবিত হওয়ার একই কারণ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, রেংমিটচা ও ম্রো ভাষায় গুটিবসন্তকে রিনা বলা হয়। রিনার নীরব মহামারিতে বহু রেংমিটচা ভাষাভাষী মানুষের মৃত্যু ও পাড়া উচ্ছেদ হয়েছিল। এর ফলে ম্রো পাড়ায় মিশে গিয়ে ভাষাটি হারিয়ে গেছে। তিনি ১২টি ম্রো পাড়ায় ২৪টি পরিবার পেয়েছেন, যাদের পূর্বপুরুষেরা রেংমিটচা ভাষায় কথা বলতেন। তবে সবাই এখন ম্রো ভাষী হয়ে গেছেন। তাঁর মতে, রেংমিটচা ভাষাটি বাঁচাতে হলে শিশু-কিশোরদের পূর্বসুরিদের ভাষা শেখার উৎসাহ প্রদান, ভাষালিপি উদ্ভাবন, শব্দভান্ডার সংগ্রহ, সংরক্ষণ করা জরুরি। একই সঙ্গে পারিবারিক ভাষায় ফিরিয়ে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিতে হবে। তখন ভাষাটি জীবিত থাকবে। বিশ্বে সে রকম বহু উদাহরণ রয়েছে বলে তিনি জানান।