জ্বালানি ছাড়া পুরো পৃথিবী ঘুরে রেকর্ড করল যে সৌরচালিত বিমান

· Prothom Alo

জ্বালানি ছাড়া উড়োজাহাজে চেপে পুরো পৃথিবী ঘুরে আসা একসময় রূপকথা মনে হতো। প্রকৃতির নিজস্ব শক্তি সূর্যকে কাজে লাগিয়ে মানুষ সেই অসম্ভবকে সত্যি করেছে। বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের এই গল্প আমাদের ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার স্পষ্ট সংকেত দেয়। সূর্যরশ্মিকে পাথেয় করে গড়া এক অবিশ্বাস্য অভিযাত্রার নাম সোলার ইমপালস–২।

উড়োজাহাজটি ২০১৬ সালের জুলাই মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে ফিরে আসে। এর মাধ্যমে তৈরি হয় নতুন এক ইতিহাস। কোনো প্রকার প্রথাগত জ্বালানি ছাড়া সোলার ইমপালস–২ সম্পূর্ণ পথ অতিক্রম করে। বিমানটি মোট প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দেয়। এই ঐতিহাসিক অভিযানে সময় লেগেছিল ১৬ মাস। আকাশপথে বিমানটি সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০ ঘণ্টা সময় কাটায়। এই মিশন বাণিজ্যিকভাবে সৌরচালিত বিমান চালু করার উদ্দেশ্যে পরিচালনা করা হয়নি। উন্নত প্রকৌশল, হালকা উপাদান, নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে আকাশপথে বহুদূর যাওয়া সম্ভব, তা প্রমাণের লক্ষ্য ছিল।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

২০১৫ সালের ৯ মার্চ আবুধাবি থেকে যাত্রা শুরু হয়। একানাগাড়ে ওড়ার বদলে মিশন সম্পন্ন হয় ১৬টি বিরতির মাধ্যমে। বিভিন্ন স্থানে আবহাওয়ার চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। নিরাপদ উড্ডয়নের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ফলে পুরো সফর শেষ হতে এক বছরের বেশি সময় লাগে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্বালানি ছাড়া বিশ্বভ্রমণ হিসেবে ঘটনাটি ইতিহাসে স্থান পায়। এটি পরিচ্ছন্ন শক্তিনির্ভর বিমান চলাচলের এক বড় মাইলফলক। বিমানটি পুরোপুরি সূর্যালোক থেকে তৈরি বিদ্যুতে চলেছে। ডানায় ১৭ হাজারের বেশি সৌরকোষ বসানো ছিল। এগুলো সারা দিন শক্তি সংগ্রহ করত। সংগৃহীত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জমা থাকত ব্যাটারিতে। সূর্যালোক না থাকলে ওই সঞ্চিত শক্তি চারটি ইলেকট্রিক ইঞ্জিন সচল রাখত। বোয়িং ৭৪৭ বিমানের চেয়েও এর ডানা বড় ছিল। তবে বিমানটির ওজন ছিল সাধারণ গাড়ির সমান। বিশাল ডানা, হালকা কাঠামোর অনন্য সমন্বয় কম শক্তিতে বিমানটিকে ভেসে থাকতে সাহায্য করেছে।

গতির চেয়ে কার্যকারিতার ওপর বেশি নজর দেওয়া হয়েছিল। বিমানটির গতি ছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৯০ কিলোমিটার। আকাশপথে এটি ৯ হাজার মিটার উচ্চতা পর্যন্ত উঠতে পেরেছিল। সুইজারল্যান্ডের দুই অভিযাত্রী বার্ট্রান্ড পিকার্ড, আন্দ্রে বোর্শবার্গ পর্যায়ক্রমে বিমানটি চালান। দীর্ঘ সময় একলা ককপিটে বসে মহাসমুদ্র পার হওয়া ছিল অনেক কঠিন। প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি ছাড়া মানসিক দৃঢ়তার দরকার ছিল।

অভিজ্ঞতা নিয়ে বার্ট্রান্ড পিকার্ড বলেন, ‘আমরা মহাসমুদ্রের মুখোমুখি হয়েছিলাম। শুধু বিমান বা প্রযুক্তি নয়, আমাদের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গিও গড়ে তুলতে হয়েছিল। এই সফলতা সোলার ইমপালস দলের কাছে কেবল একটি বিমানের অর্জন ছিল না। বিমানটিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি সাধারণ জীবনে কার্বন নির্গমন কমাতে সাহায্য করবে। বিমান চলাচলের ইতিহাসের চেয়েও সোলার ইমপালস শক্তির ইতিহাসে নতুন পথ দেখিয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমরা ৫০ জন যাত্রী বহনে সক্ষম বৈদ্যুতিক বিমান দেখতে পাব। এগুলো স্বল্প থেকে মাঝারি দূরত্বের ফ্লাইটে উড়বে।’

আবুধাবিতে অবতরণের পর অভিযান শেষ হয়ে যায়নি। পিকার্ড ও বোর্শবার্গ বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য শক্তি প্রযুক্তির প্রসার চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নেন। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহারে সরকারগুলোকে পরামর্শ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। এর জন্য আন্তর্জাতিক পরিষদ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এই দুই অভিযাত্রীর মতে, বিশ্বভ্রমণ কোনো শেষ গন্তব্য ছিল না। এটি ছিল পরিষ্কার শক্তি ব্যবহারের এক নতুন সূচনামাত্র।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

Read full story at source