মানুষের হাজার হাজার ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে যে কারণে
· Prothom Alo

মানুষের মনের ভাব প্রকাশের আদিমতম মাধ্যম হলো ভাষা। কালের পরিক্রমায় হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে উঠেছে বহু ভাষার অনন্য বৈচিত্র্য। তবে এই বৈচিত্র্যের বড় একটি অংশ ইতিহাস থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। আমরা আজ যতগুলো ভাষা সম্পর্কে জানি, তা অতীতে থাকা সুবিশাল ভাষাতাত্ত্বিক সম্পদের অতি সামান্য অংশমাত্র। সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্সে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঔপনিবেশিক শাসনের অনেক আগেই পৃথিবী থেকে হাজার হাজার প্রাচীন ভাষা চিরতরে হারিয়ে গেছে। এক হাজার থেকে তিন হাজার বছর আগে মানব সমাজে ভাষা বৈচিত্র্যের এক সুবর্ণ যুগ ছিল। সেই সময়ে পৃথিবীতে একই সঙ্গে হাজার হাজার ভাষা প্রচলিত ছিল। পরবর্তী সময় বড় বড় সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য আঞ্চলিক ভাষা বিলুপ্ত হতে শুরু করে।
Visit freshyourfeel.org for more information.
ঠিক কতগুলো ভাষা হারিয়ে গেছে, তা সরাসরি বলা কঠিন। ইয়েল ইউনিভার্সিটির ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানী ও গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ক্লেয়ার বাওয়ার্ন বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ভাষার সুনির্দিষ্ট সংখ্যার কোনো সরাসরি প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। প্রাচীনকালের অত্যন্ত অসম্পূর্ণ ও বিচ্ছিন্ন রেকর্ডগুলোর ওপর আমরা সরাসরি নির্ভর করতে পারি না।’
গবেষকেরা প্রথমে ১৭১টি যাযাবর, শিকারি ও মৎস্যজীবী সমাজের তথ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রায় ১২ হাজার বছর আগে অর্থাৎ হলোসিন ভূতাত্ত্বিক যুগের শুরুতে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৪৪ থেকে ৭০ লাখ। গবেষণার ধারণা ও কৌশল ব্যাখ্যা করে ক্লেয়ার বাওয়ার্ন বলেন, ‘যেহেতু ভাষা ও মানব সমাজের সম্পর্ক নিয়ে আমরা অনেক কিছু জানি, তাই সময়ে–সময়ে ভাষার বৈচিত্র্য বোঝার জন্য আমরা বেশ কিছু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সিমুলেশন মডেল তৈরি করেছি। এই মডেল হাজার হাজার বার পরিচালনা করে আমরা গত ১২ হাজার বছরে ভাষার বিবর্তন ও বিভাজনের একটি হিসাব বের করতে পেরেছি।’
কৃষিবিপ্লব ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানব সমাজ নতুন নতুন দলে বিভক্ত হয় এবং নতুন ভাষার সৃষ্টি করে। তবে বিশাল সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রের বিকাশের পর এক ভাষার ভূমিকা বৃদ্ধির ফলে অন্য ভাষাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, হলোসিন যুগে ভাষার বৈচিত্র্য প্রায় দুই হাজার বছর আগে চূড়ান্ত চূড়ায় পৌঁছায়। এর পরপরই তা দ্রুত কমতে শুরু করে।
মডেলিংয়ের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে বাওয়ার্ন বলেন, ‘এমন মডেলের অবশ্যই অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে এটি আমাদের একটি আনুমানিক হিসাব দেয়, যা ভবিষ্যতের গবেষণায় আরও পরিমার্জন করা সম্ভব। আমাদের গবেষণায় ভাষার এই পতনের সময়ই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ। আমরা মডেলের অনেকগুলো রূপ পর্যবেক্ষণ করেছি এবং সব কটিই একই গতিপথ দেখায়। এটি ঐতিহাসিক নথির সঙ্গেও দারুণভাবে মিলে যায়। ইতিহাস অসম্পূর্ণ হলেও আমরা জানি কীভাবে আঞ্চলিক ভাষার চাপে স্থানীয় ভাষাগুলো হারিয়ে গেছে।’
কাতালান ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভান্সড স্টাডিজের নৃবিজ্ঞানী দামিয়ান ব্লাসি বলেন, ‘ভাষা বৈচিত্র্যের এই ক্ষয় এত দ্রুত ও এত বড় পরিসরে ঘটেছে, বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে প্রচলিত ভাষার বৈশিষ্ট্যগুলোকে মানব মস্তিষ্কের পছন্দ বলা কঠিন। হতে পারে এটি কেবলই এক ঐতিহাসিক সংকটের ফল। ব্যবহারিক অর্থে, কোনো বৈশিষ্ট্য সাধারণ বা প্রচলিত বলেই তাকে প্রাকৃতিক বলে চালিয়ে দেওয়া আমাদের বৈজ্ঞানিক অনুধাবনের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য পথ নয়।’
ভাষা বিলুপ্তির ধারা আজও থামেনি। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭ হাজার ৫০০টি ভাষা প্রচলিত রয়েছে। ২০২২ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে চলতি শতাব্দীর শেষের দিকে ১ হাজার ৫০০টির বেশি ভাষা হারিয়ে যাবে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট