৪ হাজারের বেশি বই পড়ে ফেলেছেন এই বই বিক্রেতা

· Prothom Alo

মোহাম্মদ আজিজ একজন ৭১ বছর বয়সী বই বিক্রেতা। ১৯৬৭ সাল থেকে তিনি মরক্কোর রাবাত শহরের একটি পুরোনো বাজারে নিজের বইয়ের দোকান চালাচ্ছেন। তিনি কেবল বই বিক্রিই করেন না; বরং দোকানে নতুন কোনো বই এলে সেটা আগে নিজে মন দিয়ে পড়েন।

Visit h-doctor.club for more information.

মোহাম্মদ আজিজ এ পর্যন্ত আরবি, ফরাসি, স্প্যানিশ, ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় ৪ হাজারের বেশি বই পড়ে শেষ করেছেন। জ্ঞান অর্জন ও বইয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা জীবনের শুরু থেকেই।

মাত্র ছয় বছর বয়সে মোহাম্মদ আজিজ মা-বাবাকে হারিয়ে এতিম হন। জীবনসংগ্রামের অংশ হিসেবে তিনি মাছ ধরে নিজের পড়ার খরচ জোগাতেন। এভাবে হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করেন। তবে ১৫ বছর বয়সে তিনি বুঝতে পারেন, ওপরের ক্লাসের পাঠ্যবই কেনা তাঁর পক্ষে খুবই কঠিন। আর এই খরচের কারণে হয়তো পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।

তাই ১৯৬৩ সালে মোহাম্মদ আজিজ নিজে বই বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর প্রথম দোকানটি ছিল একটি গাছের নিচে। একটি গালিচা পেতে মাত্র ৯টি বই নিয়ে তিনি ব্যবসা শুরু করেন। চার বছর কঠোর পরিশ্রমের পর তিনি রাবাতের মূল শহরের কেন্দ্রে একটি স্থায়ী বইয়ের দোকান চালু করতে সক্ষম হন।

গাছপালা ও পাখির ডাক মাত্র ১০ মিনিটে কমায় মানসিক চাপ

পাঁচ বাই পাঁচ ফুটের এই ছোট্ট দোকানে ক্রেতারা সব ধরনের বই খুঁজে পান। হালকা বিনোদনের পত্রিকা থেকে শুরু করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল পাঠ্যবই—সবই রয়েছে এখানে। মোহাম্মদ আজিজ কেবল একজন সাধারণ বই বিক্রেতা নন। তিনি শিক্ষা ও সাহিত্যের আসল শক্তিতে বিশ্বাস করেন ও মানুষকে পড়তে উৎসাহিত করেন।

মরক্কো ওয়ার্ল্ড নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ আজিজ বলেন, ‘নিজের শৈশব, কঠিন পরিস্থিতি ও দারিদ্র্যের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই আমি এভাবে বইকে আঁকড়ে ধরেছি।’ মরক্কোর রাজধানী রাবাতের প্রাচীন মদিনা এলাকায় একই জায়গায় ৪৩ বছরের বেশি সময় ধরে বই বিক্রি করায় তিনি সেখানকার সবচেয়ে প্রবীণ বই বিক্রেতা হিসেবে পরিচিত। নিজের ছোট্ট দোকানের সামনে মন দিয়ে বই পড়ার দৃশ্যটি পুরো এলাকার মানুষের কাছেই খুব পরিচিত এক দৃশ্য।

মোহাম্মদ আজিজ তাঁর এই ভালোবাসার জায়গা সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতে চান। যাতে মানুষ বই পড়ে নিজেদের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখতে শেখে। তিনি প্রতিজ্ঞা করে বলেছেন, ‘যত দিন না দেশের প্রতিটি মানুষ পড়তে শিখবে, তত দিন আমি এই দোকানেই থেকে যাব।’

বইয়ের প্রতি এই ভালোবাসা স্পষ্ট বোঝা যায় মোহাম্মদ আজিজের সময় কাটানোর ধরন দেখলে। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বই বিক্রি করলেও ৭১ বছর বয়সী এই মানুষের কাজের উৎসাহ একটুও কমেনি। প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা কাজ করেন দোকানে। এর মধ্যে অন্তত ৮ ঘণ্টা সময় কাটান বই পড়ে। বাকি সময়ে তিনি শহরের অলিগলিতে হেঁটে নতুন বই ও বই বিক্রেতাদের খোঁজ করেন। হাঁটার ফাঁকে তিনি নতুন নতুন বই বিক্রেতাদের খোঁজ করেন। যাঁরা অনেকেই একসময় তাঁর নিজের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের কাছ থেকেই তিনি নিজের দোকানের জন্য নতুন বই সংগ্রহ করেন।

দই বানাতে দই লাগে, তাহলে প্রথমবার দই কীভাবে বানানো হয়েছিল

মোহাম্মদ আজিজ মনে করেন, ৪ হাজারের বেশি বই পড়ে তিনি আসলে ৪ হাজার মানুষের জীবনের গল্প কাছ থেকে জেনেছেন। তিনি চান, সবাই যেন বই পড়ে ঠিক এই অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। তবে দুটি ঘটনা তাঁকে খুব কষ্ট দেয় আর রাগিয়ে তোলে। এক, বইয়ের পাতা ছিঁড়ে হারিয়ে যাওয়া। আর দুই, শিশুদের পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে কাজ করতে বাধ্য করা। তাঁর সংগ্রহে ঠিক কতগুলো বই আছে, জানতে চাইলে তিনি মুচকি হেসে সহজ একটা উত্তর দেন, যত বই-ই থাক না কেন, তা আমার জন্য এখনো যথেষ্ট নয়।

আজিজের এই বিশেষ বইয়ের দোকানে ঢুকে দেখলে দেখা যায় নানা ধরনের বইয়ের সমাহার। মাত্র ৫ মরোক্কান দিরহাম থেকে শুরু করে দামি বই—সবই পাওয়া যায় তাঁর সংগ্রহে। শুধু খাওয়া, প্রার্থনা আর ক্রেতাদের বই দেওয়ার মতো জরুরি কাজ ছাড়া তিনি বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরান না। বিশাল সংগ্রহ থাকা সত্ত্বেও দিনে হয়তো মাত্র একটি বা দুটি বই বিক্রি হয়, কিন্তু এতে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই।

পাঠ্যবইয়ের বেশি দামের কারণে শিক্ষার্থীদের যে কষ্ট হয়, তা মোহাম্মদ আজিজ নিজের জীবন দিয়েই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তাঁর দোকানে যখন কোনো শিক্ষার্থী বই কিনতে আসে, তিনি তখনই বইয়ের দাম কমিয়ে দেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য, দামি বই যেন কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধের কারণ না হয়।

তবে কেবল বই বিক্রি করাই তাঁর একমাত্র চিন্তা নয়। মরক্কো সরকার চেষ্টা করে নিরক্ষরতার হার অনেক কমিয়ে এনেছে। তবু সেখানে এখনো অনেকে পড়তে জানেন না। মরক্কোয় প্রায় প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৩ জন মানুষই পড়তে বা লিখতে পারেন না। আজিজ জানান, এই সমস্যা কিন্তু নতুন কিছু নয়। ৫০ বছর আগের কথা মনে করে তিনি বলেন, তাঁর সময়েও অনেক কিশোর টাকা-পয়সার অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। আজিজের মতে, ৫০ বছর আগে তাঁর সঙ্গে যা ঘটেছিল, আজও অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঠিক সেটাই ঘটছে।

সূত্র: ১০০০ লাইব্রেরিস ম্যাগাজিন ও নেচার সিলেকশনপৃথিবী গোল না হয়ে সমতল হলে কী সমস্যা

Read full story at source