কোরআন কেন নবীজির শ্রেষ্ঠ অলৌকিক নিদর্শন
· Prothom Alo

অলৌকিকতাকে আরবিতে বলে ‘মুজিজা’। শব্দটির আভিধানিক অর্থ মানুষকে অক্ষম করে দেওয়ার মতো অসাধারণ ঘটনা। ইসলামি পরিভাষায়, মানুষের সাধ্য ও প্রথাগত সামাজিক-প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে মহান আল্লাহর বিশেষ কুদরতে নবী-রাসুলদের হাত ধরে সংঘটিত সত্যতার প্রমাণকে ‘মুজিজা’ বলা হয়।
Visit mwafrika.life for more information.
বলে রাখা ভালো, এটি কোনো নবীর নিজস্ব ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং তাঁদের নবুয়তের সত্যতা প্রমাণের স্বার্থে আল্লাহ–তাআলা প্রয়োজন অনুযায়ী তা প্রকাশ করেন। তাই কোনো নবীর মর্যাদা কেবল অলৌকিকতা দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং তাঁর আনীত বার্তার গভীরতা দিয়ে নির্ধারিত হয়।
মুজিজার মূল উদ্দেশ্যই হলো সত্যবিমুখ মানুষের সামনে নবুয়তের সত্যতা সুপ্রতিষ্ঠিত করা, যাতে তারা আসমানি ধর্মের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে।
নবীজির বহু অলৌকিক ঘটনার মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও কালজীয় মুজিজা হলো পবিত্র কোরআন। তাঁর অন্যান্য ভৌতিক ও দৃশ্যমান মুজিজা একটি নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও প্রত্যক্ষদর্শী মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল।
নবীদের ঐতিহাসিক মুজিজা
মানব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আল্লাহ–তাআলা যুগে যুগে প্রেরিত নবী-রাসুলদের সমকালীন যুগের চাহিদানুযায়ী বিভিন্ন মুজিজা দান করেছেন।
নবী মুসার লাঠি সাপে পরিণত হওয়া এবং তাঁর আঘাতে লোহিত সাগর দ্বিখণ্ডিত হওয়া, নবী ইব্রাহিমের জন্য প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড সুশীতল ও নিরাপদ হওয়া কিংবা নবী ইসার পক্ষে আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করা, জন্মান্ধকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া এবং কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করে তোলার মতো ঘটনাগুলো তারই প্রমাণ। আলাইহিমুস সালাম (তাদের সকলের ওপর শান্তি নেমে আসুক)।
আমাদের প্রিয় নবীর জীবনও অসংখ্য অলৌকিকতায় সমৃদ্ধ। তাঁর আঙুলের ইশারায় বায়ুমণ্ডলে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া, পাত্রের সামান্য পরিমাণ দুধ শত শত সাহাবির জন্য যথেষ্ট হয়ে যাওয়া, মিরাজের রাতে মক্কা থেকে জেরুজালেমের মসজিদে আকসা এবং সেখান থেকে সপ্তাকাশে আরোহণ করে বেহেশত ও দোজখের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে ফিরে আসা কিংবা খন্দকের যুদ্ধের সংকটকালে এক সা (প্রায় সাড়ে তিন সের) আটা ও একটি মাত্র বকরি দিয়ে প্রায় এক হাজার সাহাবির আহারের ব্যবস্থা হওয়া—এসবই তাঁর প্রামাণ্য মুজিজার অন্তর্ভুক্ত।
উটের মুজিজা ও জাহান্নামের দরজাকোরআন এক জীবন্ত মুজিজা
নবীজির বহু অলৌকিক ঘটনার মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও কালজীয় মুজিজা হলো পবিত্র কোরআন। তাঁর অন্যান্য ভৌতিক ও দৃশ্যমান মুজিজা একটি নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও প্রত্যক্ষদর্শী মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল।
যেমন চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনা তৎকালীন মক্কাবাসী প্রত্যক্ষ করেছিল এবং ঘটনা শেষে চাঁদ আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। কিন্তু পবিত্র কোরআন কোনো নির্দিষ্ট সময়ের কাঠামোয় বন্দী নয়; এটি এক জীবন্ত, চিরন্তন ও সর্বজনীন অলৌকিক বাণী, যার অস্তিত্ব কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকবে।
আরও বিস্ময়কর হলো, একজন ‘উম্মি’ বা প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন নবীর ওপর এমন এক অনুকরণীয় মহাগ্রন্থের অবতরণ হয়েছে, যা কেয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য দিশারি। ভাষা, সাহিত্য, যুক্তি, আইন, নৈতিকতা, সামাজিক সাম্য ও আধ্যাত্মিকতার প্রতিটি ক্ষেত্রে কোরআনের অনন্য অবস্থান তাঁর অলৌকিকতারই প্রকাশ।
সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩-২৪তোমরা যদি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি, সে সম্পর্কে সন্দেহে থাকো, তবে এর অনুরূপ একটি সুরা নিয়ে এসো। আর যদি সত্যবাদী হও, তবে আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সমস্ত সাহায্যকারীকে ডেকে নাও। আর যদি তোমরা তা করতে না পারো—আর নিশ্চিতভাবেই তা তোমরা কখনো পারবে না—তবে সেই আগুনকে ভয় করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যা অবিশ্বাসীদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।কোরআনের শাশ্বত চ্যালেঞ্জ
পবিত্র কোরআন শুধু নিজেকে আল্লাহর বাণী হিসেবে ঘোষণা করে ক্ষান্ত হয়নি; বরং সমকালীন ও ভবিষ্যৎ সকলের সামনে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। বলা হয়েছে, কেউ যদি দাবি করে যে এই বাণী কোনো মানুষের তৈরি, তবে সে যেন এর সমকক্ষ কিছু রচনা করে দেখায়।
আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, যদি মানব ও জিন এ কোরআনের অনুরূপ কিছু রচনা করার জন্য একত্র হয় এবং তারা একে অপরকে সাহায্যও করে, তবু তারা এর অনুরূপ কিছুই রচনা করতে পারবে না।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৮৮)
ইসরা ও মিরাজ: একটি অলৌকিক ভ্রমণের প্রেক্ষাপটউল্লেখ্য, আল্লাহর রাসুলের (সা.) আবির্ভাবের যুগটি ছিল আরবি ভাষা, অলংকার ও চমৎকার কাব্য সাহিত্যের স্বর্ণযুগ। সে সময়ের সেরা কবি, সাহিত্যিক ও প্রাজ্ঞ বাগ্মীরাও কোরআনের বাক্যবিন্যাস, শব্দচয়ন ও অলৌকিক ভাবগাম্ভীর্যের সমকক্ষ একটি লাইনও রচনা করতে পারেনি।
প্রথমেই কোরআন পুরো গ্রন্থের অনুরূপ কিছু রচনার চ্যালেঞ্জ দেয়। পরে সেই চ্যালেঞ্জকে আরও সহজ করে অন্তত ১০টি সুরা রচনার আহ্বান জানানো হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা কি বলে, সে (নবী) এটি নিজে রচনা করেছে? বলুন, তবে তোমরাও এর অনুরূপ ১০টি সুরা রচনা করে নিয়ে আসো এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো সাহায্যের জন্য ডেকে নাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ১৩)
প্রথমেই কোরআন পুরো গ্রন্থের অনুরূপ কিছু রচনার চ্যালেঞ্জ দেয়। পরে সেই চ্যালেঞ্জকে আরও সহজ করে অন্তত ১০টি সুরা রচনার আহ্বান জানানো হয়।
যখন বিরোধীরা এতেও সম্পূর্ণ অক্ষম প্রমাণিত হলো, তখন আল্লাহ মাত্র একটি ছোট সুরা রচনার আহ্বান জানান। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যদি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি, সে সম্পর্কে সন্দেহে থাকো, তবে এর অনুরূপ একটি সুরা নিয়ে এসো। আর যদি সত্যবাদী হও, তবে আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সমস্ত সাহায্যকারীকে ডেকে নাও। আর যদি তোমরা তা করতে না পারো—আর নিশ্চিতভাবেই তা তোমরা কখনো পারবে না—তবে সেই আগুনকে ভয় করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যা অবিশ্বাসীদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩-২৪)
দেড় হাজারেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। বিজ্ঞান, যুক্তি, সাহিত্য ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো শক্তি কোরআনের এই একটি সুরার চ্যালেঞ্জেরও জবাব দিতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না।
কারণ কোরআন কোনো মানুষের তৈরি সাহিত্য নয়; এটি সমগ্র বিশ্বজগতের একক অধিপতি মহান আল্লাহর অবিকৃত ও অলৌকিক কালাম।
নাহিদা সুলতানা : আলেমা, লেখক ও প্রাবন্ধিক