অষ্টাদশ সংশোধনী কি অনিবার্য
· Prothom Alo

বর্ষা এলে ময়ূরের পালকে নতুন দীপ্তি আসে। এটি তার স্বাভাবিক রূপান্তর—প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু সেই পরিবর্তনে ময়ূরের পরিচয় বদলে যায় না। সে ময়ূরই থাকে। পরিবর্তন তাকে নতুন করে প্রকাশ করে, নতুন পরিচয় দেয় না। রাষ্ট্রের সংবিধানের ক্ষেত্রেও কি একই কথা প্রযোজ্য নয়? সময়ের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধিত হতে পারে, কিন্তু প্রতি রাজনৈতিক পালাবদলে কি তার মৌলিক চরিত্রও বদলে যাবে?
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সংবিধান সংশোধনের প্রশ্ন নতুন নয়। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সম্ভাব্য অষ্টাদশ সংশোধনীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রেক্ষাপট নিঃসন্দেহে ভিন্ন। এটি কেবল একটি নতুন সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আদালতের সাম্প্রতিক রায়, রাষ্ট্রীয় পুনর্বিন্যাসের প্রশ্ন এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা।
Visit newsbetting.club for more information.
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংবিধান অনেক সময় ক্ষমতার পালাবদলের অভিঘাত বহন করেছে। কখনো রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালা, কখনো শাসনব্যবস্থার কাঠামো, কখনো নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন বদলেছে। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—সংবিধান কি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক চুক্তি, নাকি প্রতিটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের সম্প্রসারিত সংস্করণ।
সংবিধান কেন সর্বজনের হয়ে উঠে না২.
কার্যত সংবিধান সংশোধন স্বাভাবিক ঘটনা। প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশেই সংবিধান সংশোধনের ব্যবস্থা থাকে। কারণ, সমাজ পরিবর্তিত হয়, রাষ্ট্রের প্রয়োজনও সময়ের সঙ্গে বদলায়। কিন্তু সাংবিধানিক মৌল তত্ত্ব একটি স্থির বিষয় নির্দেশ করে—সংবিধান সংশোধন (কনস্টিটিউশনাল অ্যামেন্ডমেন্ট) এবং সংবিধানের চরিত্র পরিবর্তন (কনস্টিটিউশনাল ট্রান্সফরমেশন) এক জিনিস নয়।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের যাত্রা মসৃণ নয়। সেই ইতিহাসে পঞ্চদশ সংশোধনী (২০১১) এমন এক সন্ধিক্ষণ, যা শুধু একটি নির্বাচনকালীন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটায়নি; রাষ্ট্র, সংবিধান এবং জনগণের পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ককেও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তকে সেই সময়ের
সরকার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। অন্যদিকে তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এটিকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখেছে। এই দ্বৈত বৈপরীত্যের বয়ানই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান বিতর্ক।
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনীতে ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন এনেছিল। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান, জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বীকৃতির পাশাপাশি সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়।
চব্বিশে সরকারের পতনের পর পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরো আইন ও আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা নিয়ে ২০২৪ সালে দুটি রিট হয়। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট বাদ দেওয়া সংক্রান্ত সেই সংবিধান আইনের ২০ ও ২১ ধারা বাতিল ঘোষণা করা হয়। ওই দুটিসহ পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭(ক), ৭(খ), ৪৪(২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিলও ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।
রায়ের বিরুদ্ধে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং অন্যরা পৃথক লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন। শুনানির পর প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ ৯ জুলাই রায় দেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহাল–সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন।
বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার সংবিধানকে রাজনৈতিক অস্থিরতার বলি হতে হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায়ের পর এবং চব্বিশের বহুমাত্রিক পরিবর্তনকে আইনি ভিত্তি দিতে হলে অষ্টাদশ সংশোধনী আবশ্যক। একই রকম অভিমত দেন সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ ড.কাজী জাহেদ ইকবাল। ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে চূড়ান্তভাবে সংবিধানে অনুসমর্থন দিতে হবে।’ সে কারণেই অষ্টাদশ সংশোধনী এখন অনিবার্য।
সংবিধানও সময়ের সঙ্গে সংশোধিত হতে পারে, কিন্তু তার মৌলিক চরিত্র—গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, আইনের শাসন এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব যেন প্রতি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন রূপ না নেয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন যদি ঋতুচক্রের মতো ক্ষমতার চক্রে বন্দী হয়ে পড়ে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত শুধু একটি দল নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো ও মর্যাদা, নাগরিকের আস্থা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
৩.
সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের থাকলেও সেই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। গণতান্ত্রিক সাংবিধানিকতায় একটি মৌলিক নীতি হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনো সাংবিধানিক স্বেচ্ছাচারিতার ‘ব্ল্যাংক চেক’ হতে পারে না। সংসদ জনগণের প্রতিনিধি হলেও সংবিধান জনগণের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম অভিপ্রায়ের প্রতিফলন। তাই ‘পঞ্চবার্ষিক রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ দিয়ে স্থায়ী সাংবিধানিক মূল্যবোধকে বারবার পরিবর্তন করলে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
সংবিধানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পূর্বানুমানযোগ্যতা (প্রেডিক্টাবিলিটি)। নাগরিক,আদালত, প্রশাসন—সবাই ধরে নেয় যে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি সহজে বদলাবে না। যদি প্রতিটি সরকার নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধান পরিবর্তনের চেষ্টা করে, তবে আইনের শাসনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন সংবিধান আর সর্বোচ্চ আইন থাকে না; বরং ক্ষমতার পালাবদলের দলিল হয়ে ওঠে।
সংবিধান পরিবর্তনের বিরোধিতা নয়; বরং পরিবর্তনের সংস্কৃতিকে সাংবিধানিক সংযমের মধ্যে আনা আজ জরুরি। সংবিধান কেবল ক্ষমতা বণ্টনের দলিল নয়; এটি একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে রাষ্ট্রের দালিলিক অঙ্গীকার।
সংশোধনের প্রশ্নে কেবল বর্তমানের রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, ভবিষ্যতের সাংবিধানিক স্থিতিশীলতাও বিবেচ্য। বাংলাদেশের জন্যও চ্যালেঞ্জ সেখানেই। অষ্টাদশ সংশোধনী যদি আসে, তবে সেটি যেন কেবল একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া না হয়; দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
ময়ূরের পালক বদলায়, কিন্তু তার পরিচয় বদলায় না। সংবিধানও সময়ের সঙ্গে সংশোধিত হতে পারে, কিন্তু তার মৌলিক চরিত্র—গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, আইনের শাসন এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব যেন প্রতি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন রূপ না নেয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন যদি ঋতুচক্রের মতো ক্ষমতার চক্রে বন্দী হয়ে পড়ে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত শুধু একটি দল নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো ও মর্যাদা, নাগরিকের আস্থা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
এম এম খালেকুজ্জামান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
*মতামত লেখকের নিজস্ব