মাথা নষ্ট অ্যাকশন, এই সিনেমা না দেখলে মিস করবেন
· Prothom Alo

মনমেজাজ খারাপ? কিছুই ভালো লাগছে না? অ্যাকশন সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন, কিন্তু আজকাল ধুন্ধুমার অ্যাকশন সিনেমা খুব বেশি দেখার সুযোগ হয় না বলে আফসোস করছেন? তাহলে এই সিনেমা আপনার জন্যই। না, গল্প বিশেষ কিছু নয়। এমন ‘ক্লিশে’ গল্প আপনি হাজারবার শুনেছেন। আসলে নির্মাতা গল্প বলার জন্য এ সিনেমা বানানইনি! তিনি চেয়েছেন, দুই ঘণ্টা অ্যাকশনের জাদুতে বুঁদ করে রাখবেন। ছবির প্রায় পুরোটাই অ্যাকশন, থামাথামি নেই। আসলে অ্যাকশন কত প্রকার ও কী কী, সেটাই সংজ্ঞাসহ হাজির করেছেন তিনি। এই সিনেমা দেখার পর অস্ফুটে মুখ দিয়ে বের হয়ে যাবে, ‘এমন অ্যাকশন বাপের জন্মে দেখিনি!’ ও, যে সিনেমা নিয়ে এত কথা, সেটার নামটাই তো বলা হয়নি—‘দ্য ফিউরিয়াস’।
একনজরেসিনেমা: ‘দ্য ফিউরিয়াস’ধরন: অ্যাকশন, মার্শাল আর্টপরিচালনা: কেনজি তানিগাকিঅভিনয়: শি মিয়াও, জো তসলিম, ব্রায়ান লেদৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৫৩ মিনিটস্ট্রিমিং: প্রাইম ভিডিও (রেন্ট)
প্রায় দুই ঘণ্টার এই ছবিতে এমন পাঁচ মিনিটও নেই, যখন কেউ না কেউ ঘুষি খাচ্ছে না, লাথি মারছে না বা টেবিলের ওপর মুখ আছড়ে পড়ছে না। পরিচালক কেনজি তানিগাকি মূলত অ্যাকশন কোরিওগ্রাফার হিসেবেই পরিচিত। তাই অপহৃত মেয়েকে উদ্ধারের চিরচেনা গল্পটি খুব একটা নতুনত্ব না আনলেও তাঁর আসল শক্তি ফুটে উঠেছে অ্যাকশনে।
Visit grenadier.co.za for more information.
‘দ্য ফিউরিয়াস’–এর দৃশ্য। আইএমডিবিগল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন ওয়াং ওয়ে (শি মিয়াও)। কথা বলতে পারেন না। অপহরণকারীদের হাত থেকে মেয়েকে উদ্ধার করতে তিনি জীবন বাজি রেখে লড়াই শুরু করেন। কাহিনি অনেকটাই ‘টেকেন’-এর আদলে এগোলেও পরিচালক সেটিকে কেবল অজুহাত হিসেবেই ব্যবহার করেছেন। দীর্ঘ সংলাপের বদলে তিনি বিশ্বাস রেখেছেন অ্যাকশনে। সেটা যে ভালোভাবে কাজ করেছে, বলাই বাহুল্য। কারণ, ‘দ্য ফিউরিয়াস’ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দম ফেলার সুযোগ দেয় না।
সময় যত এগোতে থাকে, অ্যাকশন দৃশ্যগুলোর বিন্যাস ধাপে ধাপে আরও বড় ও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। শুরুতে ট্রাকের চারপাশে ও ভেতরে জ্যাকি চ্যান ঘরানার কুংফু লড়াই দেখা যায়, যেখানে স্টান্টগুলো রক্তপাতের চেয়েও কৌশলনির্ভর। কিন্তু এরপর প্রতিটি সংঘর্ষ আগের চেয়ে আরও নির্মম ও বিস্ফোরক হয়ে ওঠে।
১৫ দিনে ২ কোটি ভিউ! ঝড় তুলেছে যে সিনেমাছবির সাউন্ড ডিজাইন এমনভাবে করা যেন আঘাতগুলো নিজেরই গায়ে লাগে। ক্যামেরাও দুর্দান্ত, গতিশীল ক্যামেরা প্রতিটি লড়াইয়ের ভেতর ঢুকে পড়ে। মনে হয় যেন ক্যামেরাটিও যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়ছে। এর সঙ্গে ইলেকট্রনিক সংগীত যোগ হয়ে পুরো অভিজ্ঞতাকে আরও তীব্র করে তোলে। প্রতিটি সেট-পিসের পরিকল্পনা এবং সম্পাদনার ছন্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ খুব কম। চরিত্রগুলোর চলাফেরা, আঘাত ও প্রতিঘাত এমনভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে যে টানা অ্যাকশন থাকলেও বিরক্ত হওয়ার সুযোগ নেই।
তবে ‘দ্য ফিউরিয়াস’ শুধু বাস্তবধর্মী অ্যাকশনেই থেমে থাকে না; বরং অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবেই অতিরঞ্জিত হয়ে ওঠে। মোটরসাইকেলের পেছনে বসে একটি শিশুর দুর্বৃত্তদের ওপর হামলার মতো দৃশ্যগুলো বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে গেলেও নির্মাতারা এগুলো উপস্থাপন করেছেন রসবোধের সঙ্গে। হংকং অ্যাকশন সিনেমার ঐতিহ্যের প্রতি এটি যেন একধরনের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আবেগঘন দৃশ্যগুলো অবশ্য সব সময় সমান কার্যকর নয়। সাংবাদিক নাভিন (জো তসলিম) ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি কিংবা শিশুদের ঘিরে নাটকীয় অংশগুলো মাঝেমধ্যে ছবির গতি কিছুটা কমিয়ে দেয়। তবে নির্মাতারা দ্রুতই আবার সেই পরিচিত অ্যাকশন–তাণ্ডবে ফিরে আসেন, যা দেখতেই মূলত দর্শক হলে যান।
‘দ্য ফিউরিয়াস’–এর দৃশ্য। আইএমডিবিছবির সবচেয়ে স্মরণীয় অংশগুলোর একটি মাঝামাঝি সময়ের বিশাল সংঘর্ষ, যেখানে হো (ব্রায়ান লে) হাজির হন। বিশাল এক স্লেজহ্যামার হাতে তাঁর উপস্থিতি ভয়ংকর ও আকর্ষণীয়—দুই-ই। গুদামঘরে চলা এই লড়াইয়ে হাতুড়ি এক চরিত্র থেকে আরেক চরিত্রের হাতে ঘুরে বেড়ায়, চারদিকে রক্ত আর ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়। এমনকি মানুষের দেহ লুকিয়ে রাখা বরফের ভাস্কর্যও হাতুড়ির আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। দৃশ্যগুলো এতটাই উন্মত্ত যে কিছুক্ষণের জন্য মনে হতে পারে—সিনেমা আসলে এমনই হওয়ার কথা।
ক্লাইমেক্সে পর্যন্ত পুলিশ স্টেশনের দীর্ঘ অ্যাকশন সিকোয়েন্স তো লা–জবাব। উশু, জুডোসহ নানা ধরনের মার্শাল আর্ট একসঙ্গে মিশে তৈরি করে অবিশ্বাস্য এক অ্যাকশন, যা ‘দ্য রেইড’ ফ্র্যাঞ্চাইজির কথাও মনে করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে দ্বিমুখী, ত্রিমুখী আর চতুর্মুখী অ্যাকশন দৃশ্যটি শুধু রক্তাক্ত নয়, একই সঙ্গে দারুণ সৃজনশীল। প্রযুক্তিগতভাবে অসাধারণ। নির্মাতা কেবল সহিংসতার ওপর নির্ভর করেননি; বরং অ্যাথলেটিক–দক্ষতা, নিখুঁত কোরিওগ্রাফি এবং চমকপ্রদ ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে অ্যাকশনকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছেন। ফলে ছবিটি যেমন শারীরিকভাবে দর্শককে ক্লান্ত করে, তেমনি রোমাঞ্চেও ভরিয়ে দেয়।
‘দ্য ফিউরিয়াস’ হংকংয়ের অসংখ্য ক্ল্যাসিক মার্শাল আর্ট ছবির প্রভাব বহন করলেও নিছক অনুকরণে আটকে থাকেনি। কেনজি তানিগাকি নিজের স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলীতে এমন এক অ্যাকশন চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন, যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শককে আসন ছেড়ে ওঠার সুযোগ দেয় না। তবে একটা সতর্কবর্তা—এক বসায় এই সিনেমা দেখার পর ঘোর থেকে বের হতে নিশ্চিতভাবেই কিছুক্ষণ বিশ্রামের প্রয়োজন হবে।
‘দ্য ফিউরিয়াস’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি