ছয় মাসের শিশুটি হাম-ডেঙ্গু দুটি রোগেই আক্রান্ত
· Prothom Alo

ফারিস্তা নূরের বয়স ছয় মাস। দেশে আরও অনেক শিশুর মতো সে হামে আক্রান্ত। এখন ডেঙ্গুর মৌসুম। শিশুটি ডেঙ্গুতেও আক্রান্ত। একই সঙ্গে তার ডেঙ্গু ও হামের চিকিৎসা চলছে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে (শিশু হাসপাতাল)।
শিশুটি যেন বাড়তি জটিলতায় না পড়ে, সে জন্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালকসহ চিকিৎসকেরা সজাগ ও সতর্ক। শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘হঠাৎ শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে শিশুটির জন্য আইসিইউর প্রস্তুতিও আমাদের আছে।’
Visit mchezo.co.za for more information.
গতকাল দুপুরে শিশু হাসপাতালে গিয়ে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে মায়ের কোলে ফারেস্তা নূরকে দেখা গেল। শিশুটির শরীরে র্যাশ উঠেছে। মা নীলা বেগম ওর কান্না থামানোর চেষ্টা করছিলেন।
নীলা বেগমের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের মদনপুর। স্বামী নূর আলম মুদিদোকানদার। তাঁদের আরও দুটি ছেলে আছে। বড়টির বয়স ১৩, ছোটটির ৯ বছর। নীলা বেগম নিজে সব টিকা নিয়েছেন, দুই ছেলেও সব টিকা নিয়েছে। কোলের মেয়েটি কেন হামে আক্রান্ত হলো, তিনি বুঝতে পারছেন না। কীভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলো, তা–ও তিনি জানেন না।
নীলা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, গত মাসে শিশুটির নিউমোনিয়া হয়েছিল। এই হাসপাতালেই চিকিৎসা হয়। ২৫ জুলাই ছুটি নিয়ে তাঁরা বাড়ি যান। কয়েক দিন পর জ্বর হয়। জ্বর ছেড়ে যায়, আবার হয়। মদনপুরে পরীক্ষা করে শিশুটির ডেঙ্গু ধরা পড়ে। এরপর শরীরে র্যাশ দেখা দেয়।
শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম হঠাৎ শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে শিশুটির জন্য আইসিইউর প্রস্তুতিও আমাদের আছে।গত বৃহস্পতিবার ফারিস্তা নূরকে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গতকাল কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রথম আলোকে বলেন, র্যাশসহ হামের একাধিক লক্ষণ শিশুটির আছে। আবার এই হাসপাতালেই তার ডেঙ্গু পরীক্ষা হয়েছে, পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এখন শিশুটি একই সঙ্গে ডেঙ্গু ও হামের রোগী।
চিকিৎসকদের সঙ্গে যখন এই প্রতিবেদকের কথা হচ্ছিল, তখন নীলা বেগমের মুখ ছিল মলিন। করুণ স্বরে তিনি বলেন, বাড়ির আশপাশে কারও হাম হয়েছে বলে তাঁর জানা নেই। কয়েক মাস আগে শিশুটির একজন চাচা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
হাসপাতালের পরিচালক মির্জা জিয়াউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন ডেঙ্গুর মৌসুম, হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে হামের প্রাদুর্ভাব শেষ না হলেও হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। দুর্ভাগ্যক্রমে শিশুটি একই সঙ্গে দুটি ব্যাধিতে আক্রান্ত। আমরা তাকে বিশেষ নজরে রেখেছি।’
চিকিৎসকদের সঙ্গে যখন এই প্রতিবেদকের কথা হচ্ছিল, তখন নীলা বেগমের মুখ ছিল মলিন। করুণ স্বরে তিনি বলেন, বাড়ির আশপাশে কারও হাম হয়েছে বলে তাঁর জানা নেই। কয়েক মাস আগে শিশুটির একজন চাচা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে
শিশু হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, মে মাস থেকে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। মে, জুন ও জুলাই মাসে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিল যথাক্রমে ১০, ২৫ ও ৪৯ জন। এ বছর মোট ১৫০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশু এই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছে। অন্যদিকে মে মাস থেকেই হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা কমছে। মে, জুন ও জুলাই মাসে হামের রোগী ভর্তি হয়েছে ১৯৮, ১৫২ ও ১৪৫ জন। এ বছর ২ হাজার ১৩১ জন হামে আক্রান্ত এ হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিয়েছে। দেশের প্রায় সব জেলা থেকে জটিল রোগীরা শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে।
বিশিষ্ট শিশুবিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ফারিস্তা নূরকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে হবে। দেখতে হবে শরীরে যেন ফ্লুইডের ঘাটতি না দেখা দেয়। আবার শ্বাসকষ্টও যেন না থাকে। দুটি রোগকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি
গতকাল বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের ডেঙ্গু ও হামের সর্বশেষ পরিসংখ্যান জানিয়েছে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। তাতে দেখা যায়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় অর্থাৎ শনিবার সকাল আটটা থেকে রোববার সকাল আটটা পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় রোগী মারা গেছে। এ নিয়ে এ বছর হামে মোট ৮৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া ৬৭২ জন ডেঙ্গু রোগী সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা গেছেন দুজন। এ বছর জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ১৯ হাজার ৩৪৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, আর মারা গেছেন ৬১ জন। গতকাল ১ হাজার ৪৪১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল ভর্তি ছিলেন।
অন্যদিকে এ বছর ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩২০ জন ব্যক্তি হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। এর মধ্যে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৭ হাজার ১১৫ জনের। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭৭৫ জনের এবং নিশ্চিত হামে ৯৮ জনের মৃত্যু হয়।
শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলামের মতে, শিশুরা দুটি রোগের ঝুঁকিতেই আছে। এখন বাবা–মা ও অভিভাবকদের শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্নবান থাকা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। শিশুর টিকা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুকে মশা থেকে দূরে রাখতে হবে। শিশু অসুস্থ হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।