এতিম কিশোর, ৩ লাখ ডলারের ঋণ আর ‘বিষপান’, বিশ্বজুড়ে গাড়িশিল্পের নেতৃত্বে আসলেন ওয়াং চুয়ানফু

· Prothom Alo

সামনে রাখা একটি কাচের গ্লাসে ভরা ব্যাটারির তরল (ইলেকট্রোলাইট)। সাধারণ মানুষের জন্য যা হতে পারে প্রাণঘাতী, তা-ই অবলীলায় চুমুক দিয়ে পান করে নিলেন এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি। বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের প্রতিনিধিরা এই দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না, মানুষটি কি ‘পাগল’ নাকি ‘জিনিয়াস’?

২০০৮ সালের সেই রোমাঞ্চকর ঘটনার মূল চরিত্রটি বিশ্বের বৃহত্তম বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) নির্মাতা ওয়াং চুয়ানফু। নিজের প্রতিষ্ঠানের তৈরি ব্যাটারি কতটা নিরাপদ, তা বাফেটের প্রতিনিধিদের কাছে প্রমাণ করতে তিনি এই দুঃসাহসী কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। মূলত এই ঘটনার পরেই বাফেট বিওয়াইডিতে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেন।

Visit rocore.sbs for more information.

অনাথ শৈশবের দারিদ্র্য ও ত্যাগ

ওয়াং চুয়ানফুর সাফল্যের গল্পটি কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। ১৯৬৬ সালে পূর্ব চীনের আনহুই প্রদেশের এক অতি দরিদ্র কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। মা–বাবা দুজনেই ছিলেন ধানচাষি। ওয়াংয়ের যখন মাত্র ১৩ বছর বয়স, তখন তাঁর বাবা মারা যান। এর মাত্র দুই বছর পর তাঁর মা-ও হঠাৎ একদিন কাজের চাপে ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।

আট ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন ওয়াং। বাবা-মাকে হারানোর পর তাঁর পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে বড় ভাই ও মেজ বোন বড় ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। বিজনেস ইনসাইডার ও এল পাইস জানায়, ওয়াংয়ের পড়ার খরচ জোগাতে মেজ বোন বিয়ে করে ফেলেন এবং বড় ভাই স্কুল ছেড়ে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন।

পরবর্তী সময়ে আমরা দেখব, ওয়াংয়ের জন্য ভাই-বোনদের এই নিঃস্বার্থ ত্যাগ ছিল তাঁর জীবনের মূল চালিকা শক্তি। তিনি রসায়নশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা নিতে সেন্ট্রাল সাউথ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন এবং পরে ব্যাটারি প্রযুক্তিতে বেইজিং থেকে মাস্টার্স করেন।

স্বপ্নের শুরুটা যেভাবে

১৯৯৫ সাল। শেনজেন তত দিনে চীনের এক ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ২৯ বছর বয়সী ওয়াং তাঁর আত্মীয় লু জিয়াংইয়াংয়ের কাছ থেকে ৩ লাখ ডলার ঋণ নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন বিওয়াইডি। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্যমতে, শুরুতে এটি ছিল মুঠোফোনের রিচার্জেবল ব্যাটারি তৈরির একটি ছোট কারখানা।

যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর জন্য বিওয়াইডির দেওয়া সার্জিক্যাল মাস্কের কার্টন তুলছেন কর্মীরা

সে সময় বাজারে জাপানি কোম্পানিগুলোর রাজত্ব ছিল। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময় ওয়াং লক্ষ্য করলেন, জাপানিরা দামি রোবট ও যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি।

ওয়াং জাপানের ঠিক উল্টো পথে হাঁটেন। তিনি দামি যন্ত্রপাতির বদলে নিজে সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি নকশা করেন এবং দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে খরচ কমিয়ে আনেন। তাঁর এই কৌশল এতটাই সফল ছিল যে ২০০২ সালের মধ্যেই বিওয়াইডি মটোরোলা ও নকিয়ার মতো বড় প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যাটারি সরবরাহকারীতে পরিণত হয়।

তবে ইলন মাস্কের সঙ্গে ওয়াংয়ের অমিল চোখে পড়ার মতো। বাণিজ্যবিষয়ক সাময়িকী ব্লুমবার্গ তাঁকে সরাসরি ‘অ্যান্টি-ইলন মাস্ক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। মাস্ক যেখানে প্রচারের আলোয় থাকতে পছন্দ করেন, ওয়াং সেখানে নিভৃতচারী। তিনি আজও শেনজেনে তাঁর কারখানার ক্যানটিনে সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার খান।

বড় বাজি

২০০৩ সালে ওয়াং একটি দেউলিয়া সরকারি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘কিনচুয়ান অটোমোবাইল’ কিনে নেন। তখন তাঁর বিনিয়োগকারীরা তাঁকে ‘পাগল’ ভেবেছিলেন। শেয়ারবাজারে বিওয়াইডির দর এক ধাক্কায় ৩১ শতাংশ কমে যায়। সবাই ভেবেছিল, একজন ব্যাটারি নির্মাতা কেন গাড়ি বানাতে যাবেন?

ইলন মাস্ক‘ওদের গাড়ি আমি দেখেছি, আমার মনে হয় না ওদের পণ্য খুব একটা উন্নত।’

কিন্তু ওয়াংয়ের দূরদর্শিতা ছিল প্রখর। তিনি জানতেন, ভবিষ্যতের গাড়িশিল্প হবে ব্যাটারিনির্ভর। ফরচুন সাময়িকীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ সালে তিনি ‘এফ-৩’ মডেলের একটি সাশ্রয়ী সিডান গাড়ি বাজারে আনেন।

এই গাড়িটি দেখতে টয়োটা করোলার মতো হলেও এর দাম ছিল জাপানি গাড়ির অর্ধেক। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সাল নাগাদ এই গাড়িটিই চীনের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত মডেলে পরিণত হয়।

ওয়ারেন বাফেটের সমর্থন ও ‘অ্যান্টি-ইলন মাস্ক’ পরিচয়

২০০৮ সালে বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের সহযোগী চার্লি মুঙ্গার প্রথম ওয়াং চুয়ানফুকে ‘আবিষ্কার’ করেন। ফরচুন সাময়িকী বলছে, মুঙ্গার বাফেটকে বলেছিলেন, ‘এই লোকটা হলো টমাস এডিসন আর জ্যাক ওয়েলচের (যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা ব্যবসায়ী ও ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ) এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। তিনি কারিগরি সমস্যা সমাধানে এডিসনের মতো দক্ষ আর লক্ষ্য অর্জনে জ্যাক ওয়েলচের মতো কঠোর।’

২০১৮ সালের এপ্রিলে চীনের বেইজিংয়ে অটো শোর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে ওয়াং চুয়ানফু

বাফেটের বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে ২০০৮ সালে বিওয়াইডিতে ২৩২ মিলিয়ন ডলার (২৩ কোটি ২০ লাখ) বিনিয়োগ করে। এই এক বিনিয়োগই ওয়াংকে রাতারাতি বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করে তোলে। ফোর্বস ও হুরুনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে তিনি প্রথমবারের মতো চীনের শীর্ষ ধনীর তালিকায় স্থান পান।

তবে ইলন মাস্কের সঙ্গে ওয়াংয়ের অমিল চোখে পড়ার মতো। বাণিজ্যবিষয়ক সাময়িকী ব্লুমবার্গ তাঁকে সরাসরি ‘অ্যান্টি-ইলন মাস্ক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। মাস্ক যেখানে প্রচারের আলোয় থাকতে পছন্দ করেন, ওয়াং সেখানে নিভৃতচারী। তিনি আজও শেনজেনে তাঁর কারখানার ক্যানটিনে সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার খান।

স্পেনের এল পাইস পত্রিকা জানিয়েছে, ওয়াং বিদেশ ভ্রমণে গেলে ইকোনমি ক্লাসে যাতায়াত করেন এবং নিজের সুটকেস নিজেই বহন করেন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর মিতব্যয়িতা এতটাই যে একবার বিনিয়োগকারীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভায় যোগ দেওয়ার আগে তাঁর কাছে ভালো কোনো পোশাক ছিল না। তখন তিনি রাস্তার পাশের সাধারণ দোকান থেকে সস্তা এক জোড়া জুতো ও শার্ট কিনে পরে সেই সভায় অংশ নিয়েছিলেন।

ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন

বিওয়াইডির সাফল্যের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো তাদের ‘ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন’ বা স্বনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা। রয়টার্স ও ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, টেসলা বা ফোর্ডের মতো কোম্পানিগুলো যখন ব্যাটারি বা চিপের জন্য অন্য সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করে, বিওয়াইডি সেখানে নিজেদের গাড়ির আসন থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টর চিপ পর্যন্ত সবই তারা নিজেরা তৈরি করে।

স্বনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার বড় সুফল মিলেছে করোনা মহামারির সময়। যখন বিশ্বজুড়ে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) ভেঙে পড়েছিল, বিওয়াইডি তখন রেকর্ড মুনাফা করেছে। বিজনেস ইনসাইডারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যন্ত্রাংশের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর না করায় মহামারির চরম সংকটেও বিওয়াইডির উৎপাদন থমকে থাকেনি।

মহামারির শুরুর দিকে ওয়াংয়ের ব্যবসায়িক অগ্রগতি ছিল অবিশ্বাস্য। তিনি মাত্র সাত দিনের মধ্যে মাস্ক তৈরির মেশিন তৈরি করে ফেলেন। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বিওয়াইডি বিশ্বের বৃহত্তম মাস্ক উৎপাদনকারীতে পরিণত হয়।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানিয়েছে, সে সময় প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ মাস্ক তৈরি করত বিওয়াইডি। ফরচুন ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩ হাজার প্রকৌশলীর একটি বিশেষ দল নিয়ে রাতদিন কাজ করে ওয়াং এই অসাধ্য সাধন করেছিলেন।

‘ব্লেড ব্যাটারি’

ইলেকট্রিক গাড়ির (ইভি) প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল ব্যাটারির নিরাপত্তা। বিওয়াইডি উদ্ভাবন করেছে তাদের বিখ্যাত ‘ব্লেড ব্যাটারি’। রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) সমৃদ্ধ এই ব্যাটারি এতটাই নিরাপদ যে এটি গাড়ির কাঠামোর শক্তিও বৃদ্ধি করে।

বিওয়াইডির এই প্রযুক্তির ওপর এখন ভরসা রাখছে খোদ প্রতিদ্বন্দ্বী টেসলাও। ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ইলন মাস্কের টেসলা তাদের কিছু মডেলে বিওয়াইডির এই ব্লেড ব্যাটারি ব্যবহার শুরু করেছে।

২০১১ সালে ব্লুমবার্গের এক সাক্ষাৎকারে বিওয়াইডির গাড়ির নাম শুনে ইলন মাস্ক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিলেন। মাস্ক বলেছিলেন, ‘ওদের গাড়ি আমি দেখেছি, আমার মনে হয় না ওদের পণ্য খুব একটা উন্নত।’

২০২৩ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে বিক্রির হিসাবে টেসলাকে ছাড়িয়ে বিশ্বের ১ নম্বর ইভি নির্মাতা হয়েছে বিওয়াইডি। ইলন মাস্কের আগেকার সেই তাচ্ছিল্যের সুর অনেকটাই বদলে গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে মাস্ক নিজেই স্বীকার করেছেন, বিওয়াইডির গাড়িগুলো বর্তমানে বাজারে বেশ শক্তিশালী প্রতিযোগীতে পরিণত হয়েছে। ফোর্বস রিয়েল-টাইম বিলিয়নিয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, ওয়াং চুয়ানফুর বর্তমান সম্পদ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। তিনি এখন চীনের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যক্তি।

বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের মালিকানাধীন বহু বিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠান টেসলা

ভবিষ্যৎ

বিওয়াইডি এখন শুধু চীনের গণ্ডিতে নেই। ইউরোপের হাঙ্গেরি ও তুরস্কে তারা কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে। তবে বিওয়াইডির এই অভাবনীয় সাফল্য পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোয় একধরনের ‘অস্তিত্বের সংকট’ তৈরি করেছে।

ওয়াং চুয়ানফুর লক্ষ্য এখন আরও সুদূরপ্রসারী। ২০২৭ সালের মধ্যেই পুরোপুরি চালকবিহীন গাড়ি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করছে বিওয়াইডি। তাদের নতুন ‘জুয়ানজি’ স্মার্ট আর্কিটেকচার প্রতিটি গাড়িকে মূলত একেকটি শক্তিশালী রোবটে পরিণত করবে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, সিএনএন, এল পাইস, ফোর্বস রিয়েল-টাইম বিলিয়নিয়ার ইনডেক্স, বিজনেস ইনসাইডার, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, ব্লুমবার্গ নিউজ, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, ফরচুন সাময়িকী,বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস

Read full story at source