একই সময়ে দুই রকম দূরত্ব পার হওয়ার অদ্ভুত প্যারাডক্স
· Prothom Alo

ট্রেনে জানালার পাশের সিটে বসে আছেন। আপনার ট্রেনটি বেশ দ্রুতগতিতে সামনের দিকে ছুটছে। হঠাৎ দেখলেন, উল্টো দিকের লাইন দিয়ে আরেকটি ট্রেন সাঁই করে আপনাদের পার হয়ে গেল। মনে হলো, উল্টো দিকের ট্রেনটা যেন অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটে গেল! অথচ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো মানুষের চোখে আপনার ট্রেনের গতি ছিল একেবারেই স্বাভাবিক।
Visit extonnews.click for more information.
একই ট্রেন, একই গতি; অথচ দুই জায়গা থেকে গতির হিসাব দুই রকম মনে হচ্ছে! আমরা সবাই জানি, এটা শুধু আপেক্ষিক বেগের ব্যাপার। কিন্তু আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিসের এক দার্শনিক যদি আপনার পাশে বসে থাকতেন, তিনি কী বলতেন জানেন? তিনি আপনার কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর মুখে বলতেন, ‘ভাই, এই পুরো গতির ব্যাপারটাই একটা ধাপ্পাবাজি! আসলে এই দুনিয়ায় কেউ জায়গা থেকে এক চুলও নড়ে না। আর সময় বলে তো কিছুই নেই!’
পাঠক, ঘাবড়াবেন না! এই পাগলাটে দার্শনিকের নাম জেনো। আগেও আপনাদের জেনোর পাগলামির কথা বলেছি। সেগুলো একনজরে দেখে আসতে পারেন: অ্যাকিলিস ও কচ্ছপের দৌড় এবং এক কদমও এগোতে না পারার গোলকধাঁধা।
প্রাচীন গ্রিসের এই ভদ্রলোকের কাজই ছিল অদ্ভুত সব যুক্তির মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষকে বোকা বানানো। তাঁর মতে, গতি বলতে আসলে কিছু নেই, পুরোটা আমাদের চোখের ভুল। জেনো তাঁর এই দাবি প্রমাণের জন্য অনেকগুলো প্যারাডক্স তৈরি করেছিলেন। আজ আমরা তাঁর তেমনই একটি মাথা ঘোরানো ধাঁধা নিয়ে কথা বলব। এই ধাঁধায় তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন, আপনি চাইলে একই সময়ে দুটি ভিন্ন দূরত্ব পার হতে পারেন! দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছানো এই ধাঁধাটির নাম স্টেডিয়াম প্যারাডক্স। এই একই প্যারাডক্স আবার মুভিং রো প্যারাডক্স নামেও পরিচিত।
বোতল, বাক্স ও মজার গণিতপ্রাচীন গ্রিসের এই ভদ্রলোক জেনোর কাজই ছিল অদ্ভুত সব যুক্তির মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষকে বোকা বানানো। তাঁর মতে, গতি বলতে আসলে কিছু নেই, পুরোটা আমাদের চোখের ভুল।
এবার চলুন, জেনোর ধাঁধাটা একটু সহজ করে বোঝা যাক।
এই ধাঁধা বুঝতে হলে আপনাকে একটু কল্পনার আশ্রয় নিতে হবে। ধরুন, পাশাপাশি তিনটি রেললাইন আছে। এই তিনটি লাইনে তিনটি ছোট ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেনগুলোর নাম যথাক্রেম ট্রেন A, ট্রেন B এবং ট্রেন C। প্রতিটি ট্রেনের একটি ইঞ্জিন এবং দুটি বগি আছে। এবার খেলা শুরু। ট্রেন A স্টেশনেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। কিন্তু ট্রেন B এবং ট্রেন C একে অপরের ঠিক উল্টো দিকে চলতে শুরু করল। ট্রেন B যাচ্ছে পশ্চিম থেকে পূর্বে, আর ট্রেন C যাচ্ছে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। দুই ট্রেনের গতি একদম সমান। নিচের ছবি দুটির দিকে একটু খেয়াল করুন, আরও ভালো বুঝতে পারবেন।
প্রথম ছবিতে একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে ট্রেনগুলোর অবস্থান দেখানো হয়েছেঠিক এক সেকেন্ড পর, দ্বিতীয় ছবিতে ট্রেনগুলো একে অপরের ঠিক সমান্তরালে চলে এসেছেজেনোর আসল ধাঁধাটা লুকিয়ে আছে ঠিক এই এক সেকেন্ডের ভেতরেই! জেনো বললেন, B ট্রেনের যাত্রার দিকে একবার তাকান। এই এক সেকেন্ডে B ট্রেন স্থির থাকা A ট্রেনের সাপেক্ষে ঠিক একটি বগির সমান দূরত্ব পার হয়েছে। কিন্তু চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, ঠিক একই সময়ে (ওই এক সেকেন্ডেই) B ট্রেন উল্টো দিক থেকে আসা C ট্রেনের সাপেক্ষে দুটি বগির সমান দূরত্ব পার হয়ে গেছে!
গণিত যেভাবে খাবারের মেনু ঠিক করে দেয়জেনো বললেন, B ট্রেনের যাত্রার দিকে একবার তাকান। এই এক সেকেন্ডে B ট্রেন স্থির থাকা A ট্রেনের সাপেক্ষে ঠিক একটি বগির সমান দূরত্ব পার হয়েছে।
একটু ভেবে দেখুন, একই ট্রেন, একই সময়ে, একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব এবং তার ঠিক দ্বিগুণ দূরত্ব কীভাবে পার হতে পারে? জেনো দূরত্বটাকে সময়ের হিসাবে রূপান্তর করে বললেন, B ট্রেনটি যদি একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলে, তবে তার দুটি আলাদা দূরত্ব পার হতে দুটি আলাদা সময় লাগার কথা। সেক্ষেত্রে একটির সময় হবে অন্যটির দ্বিগুণ। কিন্তু এখানে তো দুটো ঘটনাই ঠিক এক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটেছে! তার মানে কি একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন সময় চলছে? নাকি সময় ও গতির এই পুরো ব্যাপারটাই একটা বিশাল বিভ্রম?
পাঠক, এখনই বিভ্রান্ত হবেন না। অবশ্য জেনোর ব্যাখ্যা শুনলে প্রথমে মাথাটা একটু চক্কর দিয়ে ওঠারই কথা! জেনোর যুক্তি আপাতদৃষ্টিতে নিখুঁত মনে হলেও, এর সমাধান কিন্তু খুব সোজা। ভুলটা কোথায় হচ্ছে, তা নিশ্চয়ই এতক্ষণে অনেকেই ধরে ফেলেছেন। হ্যাঁ, জেনো এখানে আপেক্ষিক বেগের ধারণাটা পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন।
স্থির থাকা A ট্রেনের সাপেক্ষে B ট্রেনের যে গতি, উল্টো দিক থেকে ছুটে আসা C ট্রেনের সাপেক্ষে তার গতি কিন্তু মোটেও এক নয়! দুটি বস্তু যখন একে অপরের বিপরীত দিকে ছোটে, তখন তাদের আপেক্ষিক বেগ যোগ হয়ে যায়। অর্থাৎ, C ট্রেনের যাত্রীদের কাছে মনে হবে B ট্রেন দ্বিগুণ বেগে ছুটে আসছে।
গণিতে প্রাচীন সভ্যতার পুরস্কারের ইতিহাসজেনো দূরত্বটাকে সময়ের হিসাবে রূপান্তর করে বললেন, B ট্রেনটি যদি একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলে, তবে তার দুটি আলাদা দূরত্ব পার হতে দুটি আলাদা সময় লাগার কথা।
যেহেতু C ট্রেনের সাপেক্ষে B ট্রেনের আপেক্ষিক বেগ দ্বিগুণ, তাই ওই একই সময়ে (এক সেকেন্ডে) এটি A ট্রেনের তুলনায় C ট্রেনের দ্বিগুণ দূরত্ব (দুটি বগি) পার হবে। এটাই তো স্বাভাবিক বিজ্ঞানের নিয়ম! এখানে একই সঙ্গে দুটো ভিন্ন সময় চলার কোনো গাঁজাখুরি ব্যাপার নেই।
জেনো কি আপেক্ষিক বেগের এই সহজ নিয়মটা জানতেন না? নাকি তিনি জেনেবুঝেই গতির বিভ্রম নিয়ে আরও সূক্ষ্ম কোনো দার্শনিক বার্তা দিতে চেয়েছিলেন? সেটা আজ এত বছর পর নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে আজকের দিনে স্কুলের যেকোনো ছেলেমেয়েও এই ধাঁধার ফাঁকিটা ধরে ফেলতে পারবে। এখানে আসলে কোনো প্যারাডক্সই নেই, পুরোটাই আপেক্ষিকতার দারুণ এক বুদ্ধির খেলা!
৩৫০ বছরের পুরোনো যে গাণিতক রহস্য আজও মুগ্ধ করে