৩০ বছর আগে ‘ওয়াগ দ্য ডগ’ যে বার্তা দিয়েছিল, আমরা কি এখন সেই বাস্তবতায়
· Prothom Alo

পশ্চিমা বিশ্বের রাজনীতি কি জনমতকে অনুসরণ করে, নাকি রাজনীতিই জনমত তৈরি করে? গণমাধ্যম কি জনগণকে সত্য জানায়, নাকি ক্ষমতাবানদের তৈরি করা গল্পকে সত্যের রূপ দেয়? দুই দশকের বেশি আগে নির্মিত ‘ওয়াগ দ্য ডগ’ চলচ্চিত্রটি এই প্রশ্নগুলো তুলেছিল এমন এক সময়ে, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণ ঘটেনি, ‘ফেক নিউজ’ শব্দটি দৈনন্দিন রাজনৈতিক অভিধানের অংশ হয়ে ওঠেনি। অথচ আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে ছবিটি দেখলে মনে হয়—এ যেন ভবিষ্যৎ থেকে পাঠানো এক অস্বস্তিকর সতর্কবার্তা।
Visit biznow.biz for more information.
১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া এই রাজনৈতিক স্যাটায়ার চলচ্চিত্রটির পরিচালক ব্যারি লেভিনসন। ডেভিড ম্যামেট ও হিলারি হেনকিনের চিত্রনাট্যে অভিনয় করেছেন ডাস্টিন হফম্যান, রবার্ট ডি নিরো, অ্যান হেচে, ডেনিস লিয়ারি, উইলি নেলসনসহ একঝাঁক শক্তিশালী অভিনেতা। ছবিটির গল্প নির্মিত হয়েছে এক কাল্পনিক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ঘিরে। নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে গুরুতর যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক উপদেষ্টা কনরাড ব্রিন—রবার্ট ডি নিরো যোগাযোগ করেন হলিউডের কিংবদন্তি প্রযোজক স্ট্যানলি মটস—ডাস্টিন হফম্যানের সঙ্গে।
সমাধান? বাস্তব কোনো সংকট মোকাবিলা নয়; বরং একটি কাল্পনিক যুদ্ধ তৈরি করা।
স্ট্যানলি মটসের নেতৃত্বে শুরু হয় এক অসাধারণ রাজনৈতিক প্রযোজনা। আলবেনিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের গল্প বানানো হয়। তৈরি হয় ভুয়া যুদ্ধের ফুটেজ, আবেগঘন দেশাত্মবোধক গান, ‘আমেরিকান সৈনিক’-এর গল্প এবং সংবাদমাধ্যমের জন্য একের পর এক চমকপ্রদ দৃশ্য। উদ্দেশ্য একটাই—জনগণের মনোযোগ যৌন কেলেঙ্কারি থেকে সরিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার দিকে নিয়ে যাওয়া।
এখানেই ‘ওয়াগ দ্য ডগ’-এর সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গটি। যুদ্ধ, যা বাস্তবে নেই, তা-ই হয়ে ওঠে দিনের সবচেয়ে বড় খবর। আর যে কেলেঙ্কারিটি বাস্তব, সেটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় সংবাদ-স্রোতের নিচে।
ছবিটির নামটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘ওয়াগ দ্য ডগ’ নামটি এসেছে একটি প্রচলিত ইংরেজি প্রবাদপ্রতিম ধারণা থেকে—কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে কুকুর লেজ নাড়ায় না; বরং লেজই কুকুরকে নাড়ায়। অর্থাৎ যেটি মূল বিষয় নয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত মূল বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করে। চলচ্চিত্রে রাজনীতির সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্কটি ঠিক এমনই। রাজনীতি সংবাদ তৈরি করে, আবার সেই সংবাদই জনমত ও রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
ছবিটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো—এটি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট প্রেসিডেন্টকে আক্রমণ না করে ক্ষমতার একটি সর্বজনীন কৌশলকে ব্যঙ্গ করেছে। ক্ষমতা যখন সংকটে পড়ে, তখন সত্যকে অস্বীকার করার চেয়ে অনেক সময় আরও কার্যকর কৌশল হলো সত্যের ওপর নতুন একটি গল্প চাপিয়ে দেওয়া। মানুষের মনোযোগকে একটি বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে সরিয়ে দেওয়া। ভয়, দেশপ্রেম, শত্রু, যুদ্ধ—এসব আবেগের শক্তি কাজে লাগিয়ে জনগণকে এমন একটি বাস্তবতায় নিয়ে যাওয়া, যার অস্তিত্বই নেই।
এই জায়গায় রবার্ট ডি নিরোর কনরাড ব্রিন চরিত্রটি অসাধারণ। তিনি জানেন যে মিথ্যা তৈরি করছেন, কিন্তু তাঁর কাছে সেটি নৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা। বিপরীতে ডাস্টিন হফম্যানের স্ট্যানলি মটস একজন শিল্পী—তবে তাঁর শিল্পের বিষয় সিনেমা নয়, বাস্তবতা। তিনি ক্যামেরা, আলো, সংগীত, আবেগ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব ব্যবহার করে এমন একটি ‘বাস্তবতা’ নির্মাণ করেন, যা বাস্তবের চেয়েও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
হফম্যানের অভিনয় ছবিটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। তাঁর চরিত্রটি একই সঙ্গে হাস্যকর, আত্মম্ভরী, সৃজনশীল এবং ভয়ংকর। একজন হলিউড প্রযোজক কীভাবে যুদ্ধকেও একটি বিনোদনমূলক প্রোডাক্টে পরিণত করতে পারেন, তাঁর অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সেটি যেমন হাস্যকর হয়ে ওঠে, তেমনি ভয়াবহও মনে হয়।
ছাত্ররাজনীতির নির্মম বাস্তবতার এক রূপক চিত্র ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’‘ওয়াগ দ্য ডগ’–এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গণমাধ্যমের ভূমিকা। চলচ্চিত্রে সংবাদমাধ্যমকে শুধু প্রতারিত জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখানো হয়নি; বরং দেখানো হয়েছে, সংবাদ কীভাবে তৈরি হয় এবং কোন সংবাদ মানুষের সামনে যাবে—তার ওপর নিয়ন্ত্রণ কতটা ক্ষমতাশালী হতে পারে। একটি দৃশ্য, একটি ছবি, একটি আবেগঘন গান কিংবা একটি আকর্ষণীয় শিরোনাম কীভাবে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বদলে দিতে পারে, ছবিটি তা নির্মম হাস্যরসের মাধ্যমে দেখিয়েছে।
আজকের ডিজিটাল যুগে এই ব্যঙ্গ আরও ভয়ংকরভাবে প্রাসঙ্গিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অ্যালগরিদম, ডিপফেক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্যের যুগে একটি মিথ্যা গল্প তৈরি করতে আর হলিউডের বিশাল স্টুডিও দরকার হয় না। একটি ভিডিও, একটি ভুয়া ছবি কিংবা কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টই যথেষ্ট। ফলে ‘ওয়াগ দ্য ডগ’-এর প্রশ্নটি এখন আর কেবল রাজনৈতিক প্রচারণা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি হলো—আমরা যে বাস্তবতা প্রতিদিন আমাদের স্ক্রিনে দেখি, তার কতটুকু সত্য এবং কতটুকু নির্মিত?
চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই। এটি দর্শককে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয় না; বরং সন্দেহ করতে শেখায়। সংবাদ দেখার সময় প্রশ্ন করতে শেখায়। যে গল্পটি সবচেয়ে আবেগ তৈরি করছে, সেটিই কি সত্য? যে ঘটনা নিয়ে সবাই কথা বলছে, সেটিই কি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? আর আমরা কি নিজেরাই কোনো এক অদৃশ্য ‘প্রযোজক’-এর নির্মিত গল্পের দর্শক হয়ে বসে আছি?
চলচ্চিত্রটির কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। এর ব্যঙ্গ কখনো কখনো এতটাই অতিরঞ্জিত যে বাস্তব রাজনীতির জটিলতা সরলীকৃত মনে হতে পারে। কিছু চরিত্র ও ঘটনা ইচ্ছাকৃতভাবে কার্টুনধর্মী। কিন্তু সেটিই সম্ভবত এর ব্যঙ্গের ভাষা—বাস্তবতাকে সামান্য বাড়িয়ে দেখিয়ে বাস্তবের অস্বস্তিকর সত্যটিকে আরও স্পষ্ট করে তোলা।
প্রায় তিন দশক আগে নির্মিত ‘ওয়াগ দ্য ডগ’ আজও তাই পুরোনো হয়ে যায়নি; বরং প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ছবিটির সতর্কবার্তা আরও প্রাসঙ্গিক হয়েছে। তখন চলচ্চিত্রটি প্রশ্ন তুলেছিল—ক্ষমতা কি গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে বাস্তবতা তৈরি করতে পারে? আজ আমাদের প্রশ্ন করতে হচ্ছে—ক্ষমতা, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং প্রযুক্তি একসঙ্গে মিলে কি এমন এক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে, যেখানে সত্যের চেয়ে গল্পই বেশি শক্তিশালী?
‘ওয়াগ দ্য ডগ’ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের গল্প নয়; এটি বাস্তবতা নির্মাণের গল্প। এটি দেখায়, মানুষের চোখের সামনে সত্য লুকিয়ে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় সব সময় সত্যকে মুছে ফেলা নয়; বরং তার চেয়ে আরও আকর্ষণীয় একটি মিথ্যা তৈরি করা।
সেই কারণেই প্রায় ৩০ বছর পরও ছবিটি দেখে অস্বস্তি হয়। কারণ, আমরা বুঝতে পারি হয়তো পৃথিবী বদলায়নি; শুধু গল্প বানানোর প্রযুক্তি আরও উন্নত হয়েছে।