জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনের নতুন প্রক্রিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার কেন আপত্তি
· Prothom Alo

জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি আনালেনা বেয়ারবকের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, বেয়ারবক বর্তমানে সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ করছেন।
Visit afnews.co.za for more information.
নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বেয়ারবক যে ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তা বিতর্কিত।
রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের এ সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের এক দিন আগে করা সমালোচনার সঙ্গে মিলে যায়। আগের দিন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বেয়ারবকের বিরুদ্ধে ‘ভণ্ডামি’র অভিযোগ তুলেছিলেন।
জার্মানির টেলিভিশন চ্যানেল জেডডিএফকে জাতিসংঘের সাবেক রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টোফ হয়গেন বলেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের এ সমালোচনা অযাচিত এবং মোটেও কাম্য নয়।
এই সাবেক রাষ্ট্রদূতের মতে, এর পেছনে মূলত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের মধ্যে পুরোনো একটি বিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে নতুন মহাসচিব নিয়োগ ও নির্বাচন নিয়ে দুই সংস্থার মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
গত কয়েকটি মহাসচিব নির্বাচনের সময় সাধারণ পরিষদকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়ার একটি প্রবণতা দেখা গেছে। সাবেক জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি বেয়ারবক এবার সেই বিষয় জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। এ কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছেন।
জার্মানির গ্রিন পার্টির সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেয়ারবক একাধিকবার বলেছেন, তিনি একটি স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, কাঠামোবদ্ধ, সময়োপযোগী ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনপ্রক্রিয়ার পক্ষে কাজ করতে চান।
মহাসচিব নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা গোপন ভোটের মাধ্যমে একজন প্রার্থী বাছাই করেন। এরপর ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদ সেই প্রার্থীকে মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়।
আন্তোনিও গুতেরেস চলতি বছরের শেষে মহাসচিবের পদ ছাড়বেন। বর্তমানে এ পদের জন্য প্রার্থিতার প্রক্রিয়া চলছে।
এ প্রেক্ষাপটে বেয়ারবক গত কয়েক বছরের প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করে মহাসচিব পদের প্রার্থীদের জন্য প্রকাশ্য শুনানির আয়োজন করেন। পাশাপাশি নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে তিনি নিরাপত্তা পরিষদের কাছে চিঠিও পাঠান।
শুনানিতে প্রার্থীদের বক্তব্য ও বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর শোনার পর অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের তাঁদের বিষয়ে মতামত জানানোরও সুযোগ দেওয়া হয়। কূটনীতিকদের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা এবারই প্রথম করা হয়েছে।
এ ছাড়া বেয়ারবক নিরাপত্তা পরিষদের কাছে অনুরোধ করেন, সাধারণ পরিষদের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেননি, এমন প্রার্থীদের বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে।
বেয়ারবকের এ উদ্যোগের সমালোচনা করে জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেনিফার লোসেটা তাঁর পদক্ষেপকে এখতিয়ারবহির্ভূত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে অভিহিত করেন।
লোসেটা বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া রয়েছে। তারা এমন প্রার্থীদেরও বিবেচনা করতে পারবে, যাঁরা কখনো সাধারণ পরিষদের কোনো সংলাপে অংশ নেননি।
লোসেটা আরও অভিযোগ করেন, বেয়ারবক নিজেকে একজন কূটনৈতিক সুপারস্টার হিসেবে দেখছেন এবং পরোক্ষভাবে বোঝাচ্ছেন যে নিরাপত্তা পরিষদ ঠিকভাবে কাজ করছে না। তাঁর মতে, সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বেয়ারবকের এ পদক্ষেপ ভণ্ডামির প্রকাশ। সামগ্রিকভাবে তা সাধারণ পরিষদের কাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জার্মানির টেলিভিশন চ্যানেল জেডডিএফের তথ্যমতে, এ বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুতে সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বেয়ারবকের এক বছরের মেয়াদ শেষ হবে।
বেয়ারবকের পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। সেপ্টেম্বর থেকে তিনি সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেবেন।
খলিলুর রহমান এক বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর মেয়াদ শুরু হবে আগামী ৮ সেপ্টেম্বর। শেষ হবে ২০২৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর।
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৯৯টি দেশ খলিলুর রহমানের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ৭২ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক সাইপ্রাসের কূটনীতিক আন্দ্রেয়াস কাকোরিসকে পরাজিত করেন। কাকোরিস পেয়েছিলেন ৯১টি ভোট।
বর্তমান সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা চাকরিটি পেতে যাচ্ছেন।
জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় সংস্থা সাধারণ পরিষদের এই শীর্ষ পদের মূলত প্রোটোকলগত গুরুত্ব রয়েছে। তবে এর মাধ্যমে পর্দার আড়ালে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সীমিত প্রভাবও বিস্তার করা সম্ভব।
সাধারণ পরিষদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর প্রায়ই প্রতীকী গুরুত্ব থাকে। এসব সিদ্ধান্তকে বিশ্বব্যাপী জনমতের একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবেও দেখা হয়।
জেডডিএফ জানিয়েছে, জাতিসংঘে খলিলুর রহমানের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছেন।
বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনের সংস্কার, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন, নারী ও কন্যাশিশুদের উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার মতো বিষয়গুলোয় কাজ করতে চান।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে বেয়ারবক বলেছিলেন, জাতিসংঘকে আধুনিকীকরণ ও সংস্কার করা জরুরি। তাঁর ভাষায়, এ আন্তর্জাতিক সংস্থা না থাকলে বিশ্বে আরও নৈরাজ্যের সৃষ্টি হতো।
সম্প্রতি বেয়ারবক বলেছেন, সব দুর্বলতা সত্ত্বেও জাতিসংঘই বিশ্বব্যাপী একমাত্র এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে সব সদস্যরাষ্ট্র সমানভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পায়।
জার্মানির গ্রিন পার্টির এই রাজনীতিক ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ৪৫ বছর বয়সী বেয়ারবক জাতিসংঘের দায়িত্ব ছেড়ে কী করবেন, সে বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে কিছু জানাননি।