এনট্রপি: মহাবিশ্বের অবিরাম পাশা খেলা
· Prothom Alo

কিশোর বয়সের অগোছালো ঘরের কথা মনে আছে? মা যখন ঘর গোছাতে বলতেন, তখন হয়তো আপনিও ভেবেছেন, কী লাভ গুছিয়ে? পদার্থবিজ্ঞানে শিক্ষার্থী হলে এখন হয়তো ভাববেন, এনট্রপির কারণে তো এমনিতেই সব এলোমেলো হয়ে যাবে, ঘর ঘুছিয়ে কী হবে!
Visit freshyourfeel.com for more information.
এনট্রপি নিয়ে আমাদের মনে সাধারণ একটা ধারণা আছে। যারা পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী নন, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী, তাদেরও একটা ধারণা আছে। অনেকের ধারণাতেই এনট্রপি মানে কোনো সিস্টেমে বিশৃঙ্খলা। অবশ্য এমন ভাবনার জন্য আপনাকে কাঁঠগড়ায় দাড় করানো যায় না। কারণ সত্যি বলতে, বিজ্ঞানের সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝা এবং নিন্দিত কনসেপ্টগুলোর একটি হলো এই এনট্রপি।
তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী, একটি বিচ্ছিন্ন সিস্টেমের মোট এনট্রপি সময়ের সঙ্গে কমে না। এই ধারণা বোঝাতে অগোছালো ঘরের উদাহরণটি বেশ বিভ্রান্তিকর। এনট্রপি মানে কোনো বিশৃঙ্খলা বা ক্যাওস নয়; বরং এটি একটি সিস্টেমের সামগ্রিক অবস্থা পরিবর্তন না করে এর ভেতরের অংশগুলোকে কতগুলো ভিন্ন উপায়ে সাজানো যায়, তার একটি হিসাব।
এনট্রপি কী?এনট্রপি মানে কোনো বিশৃঙ্খলা বা ক্যাওস নয়; বরং এটি একটি সিস্টেমের সামগ্রিক অবস্থা পরিবর্তন না করে এর ভেতরের অংশগুলোকে কতগুলো ভিন্ন উপায়ে সাজানো যায়, তার একটি হিসাব।
বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য ধরুন, আপনার কাছে বাতাসভর্তি একটি বাক্স আছে। অণুবীক্ষণিক পর্যায়ে দেখা যাবে, এর ভেতরের গ্যাসের অণুগুলো বাম্পার গাড়ির মতো এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। আপনি যদি কোনো এক মুহূর্তে প্রতিটি কণার নিখুঁত অবস্থান এবং গতি মেপে ফেলতে পারেন, তাহলে সেটি হবে কণাগুলোর একটি সম্ভাব্য বিন্যাস। কিন্তু বাক্সের ভেতর এমন অসীম সংখ্যক মাইক্রোস্টেট থাকা সম্ভব, যা প্রতি সেকেন্ডে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বার পরিবর্তিত হচ্ছে। আপনি তো আর খালি চোখে এসব দেখতে পান না। আপনি বাইরে থেকে কেবল বাক্সের ভেতরের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো দেখতে পান।
যেমন বাতাসের চাপ। আপনি যদি সমুদ্রপৃষ্ঠে বাক্সটি সিল করে দেন, তবে এর চাপ হবে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ১৪.৭ পাউন্ড। বাইরে থেকে তাপ বা শক্তি না দেওয়া হলে এই চাপ বদলাবে না। তার মানে, ভেতরের ওই অগণিত মাইক্রোস্টেটগুলো আসলে বাইরের এই ১৪.৭ পিএসআই ম্যাক্রোস্টেটকেই নির্দেশ করছে। সহজ কথায়, আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য জগতের সঙ্গে অদৃশ্য পারমাণবিক জগতের একটি গাণিতিক ও ধারণাগত সেতু হলো এনট্রপি।
অধরা এনট্রপিআপনি বাইরে থেকে কেবল বাক্সের ভেতরের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো দেখতে পান। যেমন বাতাসের চাপ। আপনি যদি সমুদ্রপৃষ্ঠে বাক্সটি সিল করে দেন, তবে এর চাপ হবে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ১৪.৭ পাউন্ড।
মহাবিশ্বের পাশা খেলা এবং সম্ভাবনার গণিত
এখন প্রশ্ন হলো, এত এত সম্ভাব্য ফলাফলের মধ্যে ঠিক কোনটি বাস্তবে ঘটবে? ব্যাপারটি একেবারেই র্যান্ডম। অর্থাৎ এটি মূলত সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে। এনট্রপির মূল ভিত্তিই হলো এই সম্ভাবনা, যা ওই অগোছালো ঘরের উদাহরণ দিয়ে কোনোভাবেই বোঝানো যায় না। আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর মহাবিশ্ব নিয়ে পাশা খেলেন না’। চলুন, পাশা বা ছক্কার গুটির একটি উদাহরণ দিয়েই বিষয়টা পরখ করে দেখি!
আপনি যখন সাধারণ লুডুর ছক্কা চালেন, তখন ১ থেকে ৬ পর্যন্ত যেকোনো একটি সংখ্যা উঠতে পারে। অর্থাৎ এখানে সম্ভাব্য ফলাফল বা স্টেট ৬টি। কিন্তু ডানজিয়নস অ্যান্ড ড্রাগনস (D&D) গেমের ২০-পাশের ছক্কা চাললে সম্ভাব্য ফলাফল দাঁড়ায় ২০টিতে। যেহেতু এই ছক্কায় ফলাফলের সংখ্যা বেশি, তাই আপনি বন্ধুদের চমকে দিয়ে বলতেই পারেন যে এই ছক্কার এনট্রপি বেশি!
বিশৃঙ্খলা কিন্তু বিশ্রী নয়!সিস্টেমের এনট্রপি বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য কোনো রহস্যময় শক্তি কাজ করছে না, বরং যে অবস্থার এনট্রপি বেশি, তার ঘটার সম্ভাবনা প্রাকৃতিকভাবেই বেশি থাকে।
ধরুন, আপনি D&D গেমে চরিত্রের সক্ষমতা নির্ধারণের জন্য তিনটি সাধারণ ছক্কা একসঙ্গে চাললেন। এগুলোর যোগফল ৩ থেকে ১৮ পর্যন্ত যেকোনো সংখ্যা হতে পারে, কিন্তু সব যোগফল আসার সম্ভাবনা সমান নয়। আপনি যদি সর্বোচ্চ দক্ষতা পেতে চান, তবে আপনার ১৮ লাগবে। আর এটি পাওয়ার একটিমাত্র উপায় আছে—তিনটি ছক্কাতেই ৬ উঠতে হবে।
কিন্তু আপনার যদি মাঝারি দক্ষতায় কাজ চলে যায়, তবে আপনি হয়তো ১০ পেলেও খুশি হবেন। এটি পাওয়া বেশ সহজ, কারণ এমন ৬টি ভিন্ন সংখ্যার সেট আছে যাদের যোগফল ১০ হবে। আর যদি ছক্কাগুলো একে একে চালেন এবং কোনটার পর কোনটা উঠল সেই ক্রম হিসেব করেন, তবে বিন্যাস আরও বেড়ে যাবে। যেমন, ৬-৩-১ সেটটিকে আপনি ১-৬-৩, ৩-১-৬, ৩-৬-১, ৬-১-৩, ১-৩-৬ এবং ৬-৩-১—এই ছয়ভাবে সাজাতে পারবেন। সময় শুধু সামনের দিকে চলে বলে এমন ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল। সব মিলিয়ে ১০ পাওয়ার মোট উপায় আছে ২৭টি।
তিনটি ছক্কার ক্ষেত্রে মোট ২১৬টি ভিন্ন ভিন্ন মাইক্রোস্টেট হওয়া সম্ভব। এখানে ১৮ পাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ০.৪ শতাংশ, মানে ২১৬ ভাগের ১ ভাগ। কিন্তু ১০ পাওয়ার সম্ভাবনা ১২.৫ শতাংশ, অর্থাৎ ২১৬ ভাগের ২৭ ভাগ। যেহেতু ১০ পাওয়ার উপায় বেশি, তাই আমরা বলতে পারি ১০ স্টেটের এনট্রপি বেশি। আর যেহেতু এর উপায় বেশি, তাই এটি ঘটার সম্ভাবনাও বেশি। এখানে সিস্টেমের এনট্রপি বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য কোনো রহস্যময় শক্তি কাজ করছে না, বরং যে অবস্থার এনট্রপি বেশি, তার ঘটার সম্ভাবনা প্রাকৃতিকভাবেই বেশি থাকে।
জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন কি সম্ভবআপনার যদি মাঝারি দক্ষতায় কাজ চলে যায়, তবে আপনি হয়তো ১০ পেলেও খুশি হবেন। এটি পাওয়া বেশ সহজ, কারণ এমন ৬টি ভিন্ন সংখ্যার সেট আছে যাদের যোগফল ১০ হবে।
গরম কফি কেন ঠান্ডা হয়
প্রশ্নটি শুনে ভড়কে যাবেন না। কফি ঠান্ডা হওয়ায় এনট্রপির অংশ। ধরুন, ৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার এক গ্লাস ঠান্ডা পানিতে আপনি ১২০ ডিগ্রি তাপমাত্রার একটি গরম তামার বল ফেলে দিলেন। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, পানি কিছুটা গরম হবে, আর বলটি কিছুটা ঠান্ডা হবে, যতক্ষণ না দুটো মিলে ৫০ থেকে ১২০ ডিগ্রির মাঝামাঝি কোনো তাপমাত্রায় স্থির হয়। এই অবস্থাকেই থার্মাল ইকুইলিব্রিয়াম বা তাপীয় সাম্যাবস্থা বলা হয়।
কোনো কিছু গরম হওয়ার মানে, এর ভেতরের অণু-পরমাণুগুলোর গতিশক্তি বেড়ে যাওয়া বা সেগুলো আরও বেশি কাঁপতে শুরু করা। ধরুন, পানি ৫০ জুল তাপশক্তি গ্রহণ করল। যেহেতু শক্তি সবসময় সংরক্ষিত থাকে, তাই তামার বলটি ঠিক ৫০ জুল শক্তিই হারাবে।
কিন্তু এমনটা কি হতে পারে যে, কোনো এক মঙ্গলবার আপনি ঠান্ডা পানিতে গরম বলটি ফেললেন, আর গরম বলটি আরও ১০ জুল শক্তি শুষে নিয়ে আরও গরম হয়ে গেল এবং পানি ১০ জুল শক্তি হারিয়ে আরও ঠান্ডা হয়ে গেল? এতে কি পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম ভাঙবে?
একেবারেই না, কারণ এখানেও মোট শক্তি সংরক্ষিতই থাকছে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এমনটা ঘটা সম্ভব! কেন? কারণ এনট্রপি। শক্তির এমন বণ্টন হওয়াটা সম্ভাব্য মাইক্রোস্টেটগুলোর মধ্যে একটি, তবে এর ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ, যা আক্ষরিক অর্থেই লটারি জেতার সমতুল্য। মূলত, শক্তি যখন বৃহত্তর জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন শক্তির সম্ভাব্য মাইক্রোস্টেটের সংখ্যা বেড়ে যায় বহুগুণে। পরিসংখ্যানে এই ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি থাকে। এ কারণেই আপনার কাপের গরম কফি রেখে দিলে তা ঠান্ডা হয়ে যায়।
নিউটনের আপেল ও মাধ্যাকর্ষণের গল্পশক্তি যখন বৃহত্তর জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন শক্তির সম্ভাব্য মাইক্রোস্টেটের সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যায়। পরিসংখ্যানে এই ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি থাকে।
অণু-পরমাণুর জগৎ থেকে বাস্তবতার সমীকরণ
কোয়ান্টাম মেকানিকস আমাদের বলে, পরমাণুগুলোর কেবল নির্দিষ্ট শক্তির স্তর থাকতে পারে, ঠিক যেমন ছক্কায় ২ বা ৩ উঠতে পারে কিন্তু ২.৫ ওঠা সম্ভব নয়। অতি ক্ষুদ্র ১০টি ছক্কার মধ্যে তিন ৩ ইউনিট করে শক্তি দিলে ওই ছক্কার হিসাবের মতোই এই শক্তি ২৭টি ভিন্ন উপায়ে বণ্টিত হতে পারে।
এবার ধরুন, A ও B নামে দুটি বস্তুর মোট শক্তি ১০ ইউনিট। A বস্তু দুটি পরমাণু (ছক্কা) নিয়ে গঠিত এবং এর শক্তি ৩ ইউনিট। অন্যদিকে B বস্তু তিনটি পরমাণু (ছক্কা) নিয়ে গঠিত এবং এর শক্তি ৭ ইউনিট।
বস্তু দুটিকে একে অপরের সংস্পর্শে আনলে মোট ১০ ইউনিট ঠিক রেখে তাদের মধ্যে শক্তির নানা রকম আদান-প্রদান হতে পারে। A বস্তুর শক্তি যদি ২ ইউনিট হয়, তবে এটি কেবল একটি উপায়েই হতে পারে (১ + ১ = ২)। তখন B বস্তুর শক্তি হবে ৮ ইউনিট, আর এটি ঘটার উপায় আছে ২১টি।
আবার A বস্তুর শক্তি ৪ এবং B বস্তুর শক্তি ৬ হলে, সম্ভাব্য বিন্যাস হবে ৩০টি। এই অবস্থাকে আপনি ‘কম গোছানো’ বা ‘বেশি বিশৃঙ্খল’ বলতে পারেন এবং এটি ঘটার সম্ভাবনাই বেশি।
ইলেকট্রন কি মার্বেলের মতো গোলাকারবস্তু দুটিকে একে অপরের সংস্পর্শে আনলে মোট ১০ ইউনিট ঠিক রেখে তাদের মধ্যে শক্তির নানা রকম আদান-প্রদান হতে পারে। A বস্তুর শক্তি যদি ২ ইউনিট হয়, তবে এটি কেবল একটি উপায়েই হতে পারে।
এখান থেকেই এনট্রপির সংজ্ঞায় আসা যায়—এটি মূলত কোনো সিস্টেমে শক্তি সাজানোর সম্ভাব্য উপায়ের পরিমাপ। গণিতের ভাষায় এনট্রপি (S) হলো মাইক্রোস্টেট সংখ্যার (Ω) ন্যাচারাল লগারিদম এবং বোলজম্যান ধ্রুবকের (kb) গুণফল। এই সমীকরণটি দেখুন।
বাস্তবে বেশিরভাগ জিনিস মাত্র দু-তিনটি পরমাণু দিয়ে তৈরি নয়। এক ফোঁটা পানিতেই প্রায় ১.৭ সেক্সটিলিয়ন (১.৭ × ১০২১) পানির অণু থাকে। সংখ্যাটা যখন এত বিশাল হয়, তখন মাইক্রোস্টেটের সংখ্যাও অকল্পনীয়ভাবে বেড়ে যায় এবং সম্ভাবনার পাল্লা পুরোপুরিভাবে সর্বোচ্চ এনট্রপির দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। তাই ঠান্ডা পানিতে গরম বল আরও গরম হওয়ার গাণিতিক সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবে তা এতই অসম্ভব যে, এমনটা কখনো ঘটেনি। তাপীয় সাম্যাবস্থায় পৌঁছানোটা এতই সম্ভাব্য যে, এটিকে আমরা বাস্তবে নিশ্চিত সত্য হিসেবে ধরে নিই। তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র যে বলে ‘তাপ সবসময় গরম বস্তু থেকে শীতল বস্তুতে প্রবাহিত হয়’, সেটি আসলে কোনো অনড় সূত্র নয়; বরং সম্ভাবনার খেলা!
লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, শশিকর, মাদারীপুরসূত্র: ওয়্যার্ড ডটকমত্বরণ ও মন্দন কী, এদের সম্পর্কে আপনি কতটা জানেন