নামাজ ও জিকির মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে
· Prothom Alo

নফসে আম্মারা তথা ষড়্রিপু এবং জিন, শয়তান ও মানবশয়তান মানুষকে পাপের কাজে প্ররোচিত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শয়তান আদমসন্তানের অন্তরে ওত পেতে থাকে। যখন সে জিকির বা আল্লাহর স্মরণে থাকে, তখন শয়তান দূরে সরে যায়। আর যখন সে গাফিল বা উদাসীন হয়, তখন শয়তান কুমন্ত্রণা দেয়।’ (বুখারি, মিশকাত: ২২৮১)
Visit asg-reflektory.pl for more information.
সব ইবাদতই জিকিরের অংশ। সর্বোত্তম ইবাদত নামাজের উদ্দেশ্যও জিকির। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম করো।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১৪)
আল্লাহ–তাআলা আরও বলেন, ‘তুমি কোরআন তিলাওয়াত করো, যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং সালাত কায়েম করো। নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অশ্লীল ও অশোভন কর্ম থেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহর জিকিরই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা অবগত আছেন।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
‘শয়তান আদমসন্তানের অন্তরে ওত পেতে থাকে। যখন সে জিকির বা আল্লাহর স্মরণে থাকে, তখন শয়তান দূরে সরে যায়। আর যখন সে গাফিল বা উদাসীন হয়, তখন শয়তান কুমন্ত্রণা দেয়।’ (বুখারি, মিশকাত: ২২৮১)
জিকির অর্থ স্মরণ ও আলোচনা। পরিভাষায় জিকির হলো আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি স্মরণ, আলোচনা ও চর্চা করা। উপদেশ দেওয়া অর্থে ‘জিকর’ কোরআনে এসেছে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তুমি জিকির বা আলোচনা করো বা উপদেশ দাও; জিকির বা উপদেশে মুমিনদের কল্যাণ হয়।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ৫৫)
জিকিরের তিনটি স্তর রয়েছে। যথা—মনে স্মরণ করা, মুখে উচ্চারণ করা এবং কাজে বাস্তবায়ন করা। মনে স্মরণ করা অর্থ হলো আল্লাহ–তাআলার জাত ও সিফাতের ধ্যান করা। মুখে উচ্চারণ করার অর্থ হলো আল্লাহ–তাআলার সিফাত বা গুণগান বর্ণনা করা। আমল বা কাজে বাস্তবায়ন অর্থ হলো, সব কর্মে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের হুকুম-আহকাম তথা সব বিধিবিধান মেনে চলা। এই তিনটির সমন্বয়েই জিকির পূর্ণাঙ্গ হয়। মৌখিক জিকিরের মধ্যে প্রথম হলো সুন্নত দোয়াগুলো যথাসময়ে ও যথাস্থানে পাঠ করা। দ্বিতীয় হলো কোরআন মাজিদ তিলাওয়াত করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম জিকির হলো কোরআন মাজিদ তিলাওয়াত করা।’ (বুখারি)
এরপর রয়েছে অন্যান্য নফল দোয়া, দরুদ, তাসবিহ, তাহলিল, তাকবির, তাকদিস ইত্যাদি, যা কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা অনুমোদিত।
মৌখিক জিকির নিঃশব্দে ও সশব্দে করা যায়। নিঃশব্দ জিকিরকে বলা হয় জিকরে খফি। খফি অর্থ অপ্রকাশ্য। জিকরে খফি বা খফি জিকির বলতে মৌখিক জিকিরের নীরব প্রয়োগ বোঝায়; অর্থাৎ অনুচ্চ স্বরে বা নিম্ন আওয়াজে দোয়া, দরুদ, তাসবিহ, তাহলিল ও তিলাওয়াত ইত্যাদি করা। জিকরে খফি বা খফি জিকির, অর্থাৎ নীরবে, নিঃশব্দে বা নিম্নস্বরে জিকির করাই উত্তম।
কোরআনুল কারিমে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের রবকে বিনয়ের সঙ্গে গোপনে ও নিঃশব্দে ডাকো।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৫)। আল্লাহ–তায়ালা আরও বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের জিকির করো বিনয়ের সঙ্গে, সশঙ্ক চিত্তে এবং নীরবে-নিভৃতে, অনুচ্চ স্বরে, প্রত্যুষে ও সন্ধ্যায়। আর তুমি গাফিল বা উদাসীন হয়ো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ২০৫)
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘বলো, কে তোমাদের স্থলভাগ ও সমুদ্রের অন্ধকার থেকে রক্ষা করে, যখন তোমরা কাতরভাবে এবং গোপনে তাঁর কাছে অনুনয়-বিনয় করে প্রার্থনা করো? তোমাদের এ অবস্থা থেকে রক্ষা করলে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ৬৩)
আরও বলা হয়েছে, ‘যদি তুমি উচ্চ স্বরে কথা বলো, তবে তিনি তো গুপ্ত ও অব্যক্ত সবকিছুই জানেন।’ (সুরা ত্বহা আয়াত: ৭)
সশব্দ জিকিরকে জিকরে জলি বলা হয়। জলি অর্থ প্রকাশ্য। জিকরে জলি বা জলি জিকির বলতে মৌখিক জিকিরের সরব প্রয়োগ বোঝায়; অর্থাৎ উচ্চ স্বরে দোয়া, দরুদ, তাসবিহ, তাহলিল, তিলাওয়াত ইত্যাদি করা।
জিকরে জলি বা উচ্চ স্বরে জিকির করা জায়েজ হলেও এর জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে। এক. কোনো ইবাদতকারীর ইবাদতে বিঘ্ন ঘটানো যাবে না। দুই. কোনো ঘুমন্ত ব্যক্তির ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানো যাবে না। তিন. কোনো অসুস্থ ব্যক্তির অস্বস্তির কারণ হওয়া যাবে না। নামাজের মধ্যেও নীরব বা সিররি এবং সরব বা জেহরি—উভয় প্রকার জিকির বিদ্যমান। (লিসানুল আরব, আল-মুজামুল ওয়াসিত, ফিরোজুল লুগাত, লুগাতে কিশওয়ারি, গিয়াসুল লুগাত, ফারহাঙ্গে রব্বানি, বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান)
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম