ইউটিউব দেখে কমলা-মাল্টার বাগান, প্রথম বছরেই ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি
· Prothom Alo
সৌদি আরব ও কাতারে প্রায় ১৩ বছর কাটিয়েছেন জমির উদ্দিন (৪৫)। দেশে ফিরে কিছুদিন প্রসাধনীর দোকান করেছেন। সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিনে ভাড়া দিয়েও করেছেন আয়। এসবের কোনোটিতেই থিতু হতে পারেননি তিনি। পরে ইউটিউব দেখে করেন ফলের বাগান। এখন এ বাগানই তাঁর আয়ের প্রধান উৎস।
Visit extonnews.click for more information.
জমির উদ্দিন কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের সোনাইছড়ি এলাকার বাসিন্দা। ওই এলাকার রমিজপাড়ায় তাঁর বাগান। আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া (এবিসি) আঞ্চলিক মহাসড়ক থেকে পূর্ব দিকে পাহাড়ি ছড়া ধরে প্রায় এক কিলোমিটার গেলে বাগানটির দেখা মেলে। এর চারপাশে পাহাড়।
জমিরের বাগানটি মিশ্র ফলের। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কৃষির কোনো প্রশিক্ষণ নেই তাঁর। নতুন কিছু শিখতে তাঁর ভরসা ইউটিউব। গাছের রোগবালাই বা পরিচর্যার কোনো সমস্যা হলে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেন। পাশাপাশি গুগলেও খোঁজ করেন। এ ছাড়া তিনি ইউটিউবে কৃষিবিষয়ক ভিডিও দেখেন। গত বছর তাঁর বাগানে প্রথম ফলন হয়। প্রথমবারই তিনি ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেন।
জমির উদ্দিন, চাষি, পেকুয়া, কক্সবাজারচীন, জাপান বা অন্য দেশে কীভাবে বাগান হচ্ছে, সব ইউটিউবে দেখা যায়। সেখান থেকেই শিখেছি। কেউ যদি একবার সাহস করে শুরু করেন, করতে করতে তাঁর অভিজ্ঞতা হয়ে যাবে।গত সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, জমিরের বাগানে সারি সারি মাল্টা, কমলা, জাম্বুরা ও পেয়ারাগাছ। সবগুলো গাছেই ফলন ধরেছে। পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে রক্ষায় কোনো কোনো ফল পলিথিনে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। বাগানে কর্মরত দুই শ্রমিক আগাছা পরিষ্কার ও পরিচর্যায় ব্যস্ত।
২০২৩ সালে চার একর জমি লাগিয়ত (টাকার বিনিময়ে জমি বর্গা নেওয়া) নিয়ে মিশ্র ফলের বাগান শুরু করেন জমির উদ্দিন। বর্তমানে তাঁর বাগানে ১ হাজার ৪০০টি পেয়ারা, ৭৮০টি বারি-১ মাল্টা, ২০টি বারোমাসি মাল্টা, ২৫০টি জাম্বুরা ও ২৫০টি দার্জিলিং কমলার গাছ রয়েছ। নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনি এসব চারা সংগ্রহ করেছেন।
জমি লাগিয়ত নেওয়া, জমি উন্নয়ন, চারা, শ্রমিক, সেচ, সার, কীটনাশক, বেড়া ও ফল প্যাকেটজাত করার উপকরণ কেনাসহ দুই বছরে জমিরের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩২ লাখ টাকা। গত বছর শুরু থেকেই বাগানটির গাছে ফল আসতে শুরু করে। এবারও ভালো ফলন ও বিক্রির আশা করেছিলেন। তবে জুলাইয়ের শুরুতে পেকুয়ার বন্যায় তাঁর বাগানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জমির উদ্দিন বলেন, ‘গত বছর স্থানীয় বাজারে মাল্টা ও পেয়ারা বিক্রি করেছি। এ বছরও কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের পাইকারেরা বাগানে এসে ফল কিনে নিচ্ছেন। স্থানীয় বাজারে মাল্টা প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা এবং পেয়ারা ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।’
জমির জানান, জুলাইয়ের বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে টানা ছয় দিন ডুবে ছিল বাগানটি। এতে প্রায় ৩৫ হাজার পেয়ারা ও ১০ হাজার মাল্টা ঝরে পড়ে। এ ছাড়া মারা গেছে অন্তত ৭০০টি ফল গাছ। সব মিলিয়ে এতে তাঁর ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। এরপরও চলতি মৌসুমে প্রায় ১৭ লাখ টাকার ফল বিক্রির আশা করছেন তিনি।
জমির উদ্দিন বলেন, ‘কঠোর পরিশ্রম আর পুঁজি খাটালে দেশে বসেই বিদেশের চেয়ে বেশি আয় করা সম্ভব। বন্যায় এ বছর ক্ষতি হয়েছে। তবে আমার বাগান তো আর এক দিনের জন্য না। হয়তো এ বছর আয় কম হবে। তবে সেটি আগামী বছর পুষিয়ে নিতে পারব।’
প্রবাস থেকে যেভাবে কৃষিতে
ভাগ্য বদলানোর আশায় ২০০০ সালে সৌদি আরবে যান জমির উদ্দিন। এর নয় বছর পর তিনি দেশে ফিরে একটি প্রসাধনীর দোকান দেন। ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় ২০১২ সালে আবার কাতারে যান। পরে ২০১৬ সালে দেশে ফিরে শুরু করেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার ব্যবসা। ভাড়া দেওয়ার জন্য পাঁচটি অটোরিকশা কিনলেও নানা ঝামেলায় তা বিক্রি করে দিতে হয়।
এরপর কৃষিতে মন দেন। ২০১৮ সালে পাঁচ একর জমিতে পেঁপের বাগান করেন। এক বছর পর পেঁপে চাষে সুবিধা করতে না পেরে ২ হাজার ২৫০টি কলাগাছ লাগান। সেখান থেকে প্রায় আট লাখ টাকা লাভ করেন তিনি। কিন্তু পরের মৌসুমে আবার ফলন কমে যায়। একপর্যায়ে কলাগাছ কেটে ফেলেন।
তবে এরপরও কৃষি ছাড়েননি জমির। ২০২৩ সালে বাড়ির পাশে চার একর জমি লাগিয়ত নিয়ে শুরু করেন মিশ্র ফলের বাগান। সেখানে একসঙ্গে কয়েক ধরনের ফলের চাষ করেন। কৃষির নতুন নতুন পদ্ধতি শেখার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিই জমিরের ভরসা। কোনো সমস্যা হলে প্রথমে কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পাশাপাশি গুগল ও ইউটিউবে কৃষিবিষয়ক ভিডিও দেখেন।
জমির উদ্দিনের বাগানে রয়েছে কমলা, মাল্টা, পেয়ারা, জাম্বুরাসহ নানা ফল। গত সোমবার তোলাজমির উদ্দিন বলেন, ‘চীন, জাপান বা অন্য দেশে কীভাবে বাগান হচ্ছে, সব ইউটিউবে দেখা যায়। সেখান থেকেই শিখেছি। কেউ যদি একবার সাহস করে শুরু করেন, করতে করতে তাঁর অভিজ্ঞতা হয়ে যাবে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা নিয়মিত বাগান দেখতে আসেন। কোনো পরামর্শ দরকার হলে তাঁদের ফোন করি। আর কোথাও আটকে গেলে গুগলে সার্চ করি বা ইউটিউব দেখি।’
পেকুয়ার পাহাড়ি এলাকায় মিশ্র ফলের বাগানের সম্ভাবনা দেখছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারাও। তাঁরা জানান, পেকুয়ার পাহাড়ি অঞ্চলের মাটি মাল্টা, কমলা, কাজুবাদাম, কফি ও লেবু চাষের জন্য উপযোগী। জমির উদ্দিনের বাগানের বিশেষত্ব হলো, তিনি একসঙ্গে অনেক ধরনের ফলের চাষ করেছেন। কোনো কারণে একটি ফলের দাম কমে গেলে অন্য ফলের দাম দিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে।’
জানতে চাইলে পেকুয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারুক হোসেন চৌধুরী বলেন, পেকুয়ায় বাণিজ্যিকভাবে মাল্টা চাষের বাগান হিসেবে জমির উদ্দিনের বাগানটি ব্যতিক্রম। পাহাড়ি এলাকায় এ ধরনের মিশ্র ফলের বাগানের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগ জমির উদ্দিনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তাঁকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে।