পতিত পাথর

· Prothom Alo

দরজাটা কিছুতেই খুলছে না। অপেক্ষার মুহূর্তগুলো দীর্ঘায়িত হতে হতে যেন অসীমের পানে যাত্রা করে। এদিকে পেছন থেকে অনুভূত হয় প্রচণ্ড চাপ। অনেকগুলো চোখ, যেন দরজা বা বাইরে চলমান সিঁড়ি বাদ দিয়ে আমার পিঠেই নিবদ্ধ। যেন দরজা বা তার ওপারে কিছু দেখতে হলে কেবল আমার পিঠ এফোঁড়-ওফোঁড় করেই ওরা দেখবে। এতগুলো দৃষ্টি বুক ফুঁড়ে বের হলে আদৌ বাঁচব কি না, তারই–বা ঠিক কী? কিন্তু দরজাটা আজ কিছুতেই খুলবে না বলে যেন পণ করেছে। অন্য দিন মেট্রোরেলের দরজা আর প্ল্যাটফর্মের মধ্যে যতটুকু দূরত্ব থাকে, আজ তাতে কোথায় একটা সূক্ষ্ম তারতম্য। কোথাও কিছু একটা ঠিক নেই। যেন প্ল্যাটফর্মের দিকে বিক্ষিপ্ত হিসাব কষে ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে পড়লে সেই পা ওখানে না পড়ে যাবে একটা অনন্ত ব্ল্যাকহোলের দিকে; যেমন করে আমরা পা বাড়াই, মানুষের দিকে, সম্পর্কের দিকে, সমাজের দিকে; কিন্তু পাই শুধু ব্ল্যাকহোল। অনন্ত শূন্যতা। অপরিমেয় নিঃসঙ্গতা।

শেষ পর্যন্ত দরজাটা খুলল। খরস্রোতা ধারা হঠাৎ বাধা পেলে যেমন সাবলীলভাবে দুভাগ হয়ে কেটে বের হয়ে যায়, তেমনি করে এতক্ষণ পিঠ ফুঁড়ে দিতে চাওয়া দৃষ্টিসমেত চোখগুলো তাদের শরীরসহ আমার চারপাশ কেটে বের হয়ে যায়। কিছুক্ষণ স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে থাকি। পাহাড়ি ঝরনার ধারে গিয়েছিলাম একবার, দেখেছিলাম পুরোনো পাথরগুলো স্রোতের ধাক্কায় ধীরে ধীরে মসৃণ হয়ে গেছে, ধরলে কেমন একটা আরামের অনুভূতি হয়। লোভ হলো, এই জনস্রোতের সামনে যদি দাঁড়িয়ে থাকি এভাবে অনাদিকাল, তাহলে কি আমার এবড়োখেবড়ো জীবনটাও সে রকম একটা সুগোল মসৃণ রূপ নেবে? এসব ভাবনায় বিভোর হয়ে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরে আমার সংবিৎ ফেরে। মনে পড়ে, আমাকে পৌঁছাতে হবে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

পৌঁছানোই আমাদের প্রতিটি দিনের প্রধান কাজ। বের হওয়ার পর থেকে আমরা কেবল পৌঁছাতেই চাই। ঘর থেকে, ট্রেন থেকে, মাতৃগহ্বর থেকে একটা পৌঁছানোর তাগিদই আমাদের চালিয়ে নিয়ে যায়। এই তাগিদ না থাকলে মানুষও হয়তো পাথর হয়ে যেত। পাথরের দিকে তাকিয়েই পার করে দিত অনন্তকাল। নতুন আর কোনো পাথর নয়, কর্ম নয়, কাম নয়, স্মৃতি-বিস্মৃতি নয়, কিছুই নয়, কেবল এক অনন্ত ধ্যান। কিন্তু মানুষ তার মনুষ্যত্বের পুরোটা নিয়ে কোথাও একটা পৌঁছানোর তাড়ায় বেঁচে থাকে। গল্প তৈরি করে। ইতিহাস বানায়।

কিন্তু আমি, আমি কখনোই কোথাও পৌঁছাতে পারি না। কেবলই দেরি হয়ে যায়। পৌঁছাতে চাই না এমন নয়, কিন্তু ভীষণ একটা অক্ষমতা আমাকে এভাবেই স্থাণুর মতো দাঁড় করিয়ে রাখে। দরজা খুলতে দেরি হয়, মানুষ চিনতে দেরি হয়, ভোর হতে দেরি হয়, আর সব দেরির সমাপ্তিতে আমি দাঁড়িয়ে পড়ি স্থাণুর মতো। আর প্রতিবার এভাবেই মানুষ স্রোতের মতো অনায়াস অবহেলায় আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় কলকল শব্দে।

আজও সেই একই কারণে নেমে পড়েছি ট্রেন থেকে। যে ট্রেনটা হয়তো আগে কখনো আসেনি এই স্টেশনে, ভবিষ্যতেও আর কখনো আসবে না। কিন্তু আমাকে নামতেই হবে, এমনকি শেষ যাত্রী হিসেবে হলেও। কিছুতেই পরের স্টেশনে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। কারণ, তাহলে হয়তো এমন কোথাও পৌঁছে যাব, যেখানে না পৌঁছানোর জন্যই প্রতিদিন বাসা থেকে বের হই।

শেষ পর্যন্ত নড়তে সক্ষম হলাম। বের হয়ে এসে ডানে–বাঁয়ে তাকালাম। আমাকে প্রহেলিকায় ফেলার জন্যই হয়তো ট্রেন এক দিন ডানে, এক দিন বাঁয়ে এসে থামে। আর আমি দিক ভুলে যাই। একেক দিন ভুলভাল দিকে বের হয়ে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি, যেখানে পৌঁছানোর কথা সেই জায়গাটার হদিস, কিন্তু খুঁজে পাই না। মাঝেমধ্যে মনে হয়, প্রতিদিন কি আসলে একই জায়গায় যাই? নাকি জায়গাগুলো প্রতিদিন একই থাকে? যদি ওদেরও কোথাও পৌঁছানোর তাড়া থাকে, তাহলে তো কোনোভাবেই এক জায়গায় থেমে থাকার কথা নয়। থিতিয়ে পড়ার কথা নয় হতোদ্যম মানুষের মতো। তাই ঠিক নিশ্চিত হতে পারি না, মনে হয় প্রতিদিন আমি দিক ভুল করি এমন না–ও হতে পারে, হয়তো প্রতিবার আলাদা ট্রেনে উঠি। আগেরবার ওঠা ট্রেনগুলো আর কখনোই ফিরে আসেনি আমাকে নিতে, হয়তো ওরা জায়গামতো পৌঁছে গেছে, কেননা ওদের গতি অনেক, পৌঁছাতে দেরি হওয়ার কথা নয় মোটেই। আর জায়গাগুলো, ওরাও আমার মতোই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না, দিক ভুল করছে বারবার। ভুল করছে আর হন্যে হয়ে খুঁজছে পৌঁছানোর জায়গাটা। এদিকে ওদের আনাড়িপনার মাশুল দিতে হচ্ছে আমাকে, কিছুতেই কখনো সঠিক জায়গাটায় পৌঁছাতে না পারার মধ্য দিয়ে।

তারপরও হতোদ্যম হই না। না, বিশাল কোনো প্রাপ্তির প্রেরণা থেকে নয়। আমি আসলে পাথর বড় ভয় পাই। যখন সব ব্যর্থতা, না হয়ে উঠতে পারাগুলো, অপ্রাপ্তিগুলো, পাথরের মতো বুকে চেপে বসে, সেই দম আটকানো, শাসরুদ্ধকর মুহূর্তগুলো আমাকে পাথর ভয় পেতে শিখিয়েছে। ঝরনার পানির ঘষায় পিচ্ছিল, সুগোল, ঝঞ্ঝাটহীন পাথর হয়ে ওঠার লোভ একবার জাগলেও অনন্তকাল একই দৃশ্য, একই বোধ, একই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার ভয়ে আমি পাথর হতে চাই না। মূলত এই নারকীয় একঘেয়েমি থেকে বাঁচার আশাতেই বারবার পৌঁছানোর চেষ্টা করি। কোথাও না কোথাও। ফলে কোথাও পৌঁছাতে না পারার মধ্য দিয়েও কেবল বের হতে পারার, পরবর্তী গন্তব্যে যাত্রা শুরু করতে পারার সফলতাতেই, পাথর না হয়ে বেঁচে থাকি। আজও সেই একই কারণে নেমে পড়েছি ট্রেন থেকে। যে ট্রেনটা হয়তো আগে কখনো আসেনি এই স্টেশনে, ভবিষ্যতেও আর কখনো আসবে না। কিন্তু আমাকে নামতেই হবে, এমনকি শেষ যাত্রী হিসেবে হলেও। কিছুতেই পরের স্টেশনে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। কারণ, তাহলে হয়তো এমন কোথাও পৌঁছে যাব, যেখানে না পৌঁছানোর জন্যই প্রতিদিন বাসা থেকে বের হই।

তাই পৃথিবীতে যদি ৭০০ কোটি মানুষ থাকে, তাহলে একই নামে এবং অবস্থানে আছে ৭০০ কোটি স্টেশন, ৭০০ কোটি গন্তব্য, ৭০০ কোটি গন্তব্যহীনতা। তাই পৃথিবীতে সর্বদা বিরাজ করে ৭০০ কোটি নিঃসঙ্গতা। কিন্তু এই নিঃসঙ্গতাই মানুষকে তাড়িত করে, এই নিঃসঙ্গতাকে জয় করার বাসনাই পরের দিন তাকে নতুন কোনো গন্তব্যের জন্য আশ্রয় থেকে বের করে আনে।

প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় জনস্রোতে কদাচিৎ চোখ আটকে যায় কিছু মানুষের দিকে। অবয়ব ও বহিরাবরণে মানুষগুলোকে আলাদা করার কোনো উপায় নেই, এ শহরের আরও অসংখ্য মানুষের মতোই কোনো না কোনো গতানুগতিকার খোলসেই তারা আবদ্ধ বলে ভ্রম হয়। কিন্তু তাদেরকে আলাদা করে দেয় তাদের চোখ। এমন নয় যে সামনাসামনি কেবল চোখাচোখি হলেই সে দৃষ্টির মাহাত্ম্য আলাদা করে বোঝা সম্ভব হবে, বরং যেকোনোভাবে একবার নজর পড়লেই চোখগুলো আমাকে থমকে যেতে বাধ্য করে। কিছু মানুষের চোখই থাকে এমন, যা দেখার জন্য চোখের দিকে তাকাতে হয় না। তাদের চোখগুলো মাছির চোখের মতো সর্বাঙ্গে বিস্তৃত থাকে, এমনকি অঙ্গ ছাড়িয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে এদিকে–সেদিকে, এমনকি ঢুকে পড়ে তাকিয়ে থাকা মানুষগুলোর মনের মধ্যেও। চোখগুলো অদ্ভুত উজ্জ্বলতায় ভরপুর, যেন এই মানুষটা ঠিক ঠিক জানে, বের হয়ে ডান দিকে যেতে হবে, নাকি বাঁ দিকে। আজও এমন একজনের দিকে নজর পড়ল, খুব করে মন চাইল তার পিছু নিই। তাহলে আর কোনো দুশ্চিন্তা থাকবে না। সেই উদগ্র বাসনাকে গলা টিপে মারতেই হলো, কারণ দুটো মানুষের একসঙ্গে পৌঁছানোর জন্য একটা সুনির্দিষ্ট সঠিক জায়গা বলে কিছু নেই। আমি জানি এই মানুষগুলোর সঠিক গন্তব্য জানা আছে, নিরূপণ করা আছে ক্রমস্থানান্তরিত জায়গাগুলোর বর্তমান পুঙ্খানুপুঙ্খ অবস্থান। এদের দেখলেই লোভ হবে, মনে হবে এবার একটু শরীরটা এলিয়ে দিই, চোখ বুজে অনুসরণ করতে থাকি সবজান্তা চোখ দুটোকে। কিন্তু এত দিনের এই পৌঁছাতে না পারার যাত্রায় জেনে গেছি, পাশের জনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা গন্তব্য নিয়ে আমরা সবাই ছুটে চলেছি। হয়তো কোন একটা মুহূর্ত, ঘণ্টা বা যুগ আমরা পাশাপাশি পার করি। যেমন করে ট্রেনে পাশাপাশি সিটে বসি আলাদা স্টেশনে নামার জন্য। কারও কারও মনে হয় যে তারা হয়তো একই স্টেশনে নামছে, কিন্তু নামাটা একই হলেও স্টেশনগুলো আসলে প্রত্যেকের জন্যই আলাদা।

তাই পৃথিবীতে যদি ৭০০ কোটি মানুষ থাকে, তাহলে একই নামে এবং অবস্থানে আছে ৭০০ কোটি স্টেশন, ৭০০ কোটি গন্তব্য, ৭০০ কোটি গন্তব্যহীনতা। তাই পৃথিবীতে সর্বদা বিরাজ করে ৭০০ কোটি নিঃসঙ্গতা। কিন্তু এই নিঃসঙ্গতাই মানুষকে তাড়িত করে, এই নিঃসঙ্গতাকে জয় করার বাসনাই পরের দিন তাকে নতুন কোনো গন্তব্যের জন্য আশ্রয় থেকে বের করে আনে। এসব শতসহস্র কোটি পৌঁছাতে পারা না–পারা, জয় বা পরাজয়, মানুষ বা পাথর আসলে গোটা গ্রহেরই গন্তব্য ঠিক করে দেয়। মহাকাশের কোনো কোনো গ্রহে, যেখানে অনেক অনেক পাথর, কিন্তু একটি পাথর কেবল আর মাত্র একটি পাথরের দিকেই চেয়ে থাকে, লক্ষ্যহীন আবেশে দুপাশ কেটে বের হতে থাকা কলকল প্রবাহে কেবল সুমসৃণ হয়, হয়তো তারাও একদিন ৭০০ কোটি আকাঙ্ক্ষা ছিল। সম্মিলিত পৌঁছে যাওয়ার সফলতাতেই, সেই গ্রহটিতে এখন আর প্রাণ বলে কিছু অবশিষ্ট নেই।

Read full story at source