প্রকাশ্যে যুবদল কর্মী হত্যার পর থেকে সেই বাজারে আতঙ্ক, নেই বেচাকেনা
· Prothom Alo
প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে এক যুবদল কর্মীকে হত্যার পর থেকে আতঙ্ক বিরাজ করছে চট্টগ্রামের রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নের কেরানীহাট বাজারে। ঘটনার পর থেকে বন্ধ রয়েছে বাজারটির অধিকাংশ দোকানপাট। যেসব দোকান খোলা রয়েছে তাতেও বেচাকেনা তেমন হচ্ছে না বলে দাবি দোকানিদের।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
গত বৃহস্পতিবার রাতে বাজারটিতে খুন করা হয় যুবদল কর্মী মোহাম্মদ করিমকে (৩৬)। তিনি উরকিরচর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয় যুবদলের রাজনীতিতে তাঁকে সক্রিয় দেখা গেলেও দলে তাঁর কোনো পদ–পদবি ছিল না।
কেরানীহাট বাজারটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। বাজারটিতে দোকান রয়েছে অর্ধশতাধিক। প্রতি সপ্তাহে দুই দিন করে হাট বসে বাজারটিতে। উরকিরচর ছাড়াও আশপাশের ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ সাপ্তাহিক হাটে বেচাকেনার উদ্দেশে আসেন।
—তাপস বড়ুয়া, সভাপতি, কেরানীহাট বাজার উন্নয়ন কমিটি।এই বাজারে আগে কখনো গোলাগুলি বা মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটেনি। আমি অনেক বছর ধরে বাজারে ব্যবসা করি। এবারই প্রথম এমন ঘটনা দেখলাম। ভয়ে-আতঙ্কে এখনো অর্ধেকের বেশি দোকান বন্ধ রয়েছে।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার রাতে ৪-৫টি মোটরসাইকেলে করে ১০-১২ জন অস্ত্রধারী বাজারে আসেন। এরপর তাঁরা যুবদল কর্মী করিমকে ঘিরে ধরেন। অস্ত্রধারীদের একজন করিমের ঘাড় ও মাথায় ধারালো অস্ত্রের কোপ দেন। করিম মাটিতে লুটিয়ে পড়লে কয়েকজন অস্ত্রধারী করিমকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছুড়তে থাকেন। করিমের শরীরের তিনটি স্থানে গুলি লাগে। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এ সময় বাজারের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে দোকানিরা দোকানপাট বন্ধ করে চলে যান। প্রায় এক ঘণ্টা সড়কে পড়ে থাকার পর করিমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
আতঙ্কে দোকানিরা, ক্রেতারাও আসছেন না
খুনের ঘটনার দুই দিন পরও বাজারে বেচাকেনা স্বাভাবিক হয়নি। অনেক দোকানি আতঙ্কে দোকানপাট খুলছেন না। খুনের ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতেও রাজি নন অধিকাংশ দোকানি।
আজ শনিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বাজারে অবস্থান করে দেখা যায়, বাজারে ২০ থেকে ২৫টি দোকান খোলা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতিতে বাজার মুখর থাকলেও শনিবার ক্রেতা তেমন নেই। প্রায় আড়াই ঘণ্টা বাজারে অবস্থান করে ৭-৮ জন ক্রেতা দেখা গেছে।
দোকানিদের অধিকাংশই বয়সে প্রবীণ। তাঁদের দাবি, আগে কখনো পুরোনো এই বাজারটিতে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। হঠাৎ সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড দেখে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাই অনেক দোকানি দোকান খুলতে সাহস করছেন না।
বাজারে একটি সবজির দোকান রয়েছে তাপস বড়ুয়ার। তিনি বাজারের উন্নয়ন কমিটির সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন। তিনি বলেন, খুনের ঘটনার পর তিনিও দোকান বন্ধ রেখেছিলেন। শনিবার সকালে দোকান খোলেন। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কোনো বিক্রিই হয়নি তাঁর দোকানে।
তাপস বড়ুয়া বলেন, ‘এই বাজারে আগে কখনো গোলাগুলি বা মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটেনি। আমি অনেক বছর ধরে বাজারে ব্যবসা করি। এবারই প্রথম এমন ঘটনা দেখলাম। ভয়ে-আতঙ্কে এখনো অর্ধেকের বেশি দোকান বন্ধ রয়েছে।’
বাজারে দুটি সিসি ক্যামেরা থাকলেও দুই বছরের বেশি সময় ধরে তা অচল রয়েছে বলে জানান দোকানিরা। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে ক্যামেরা দুটি লাগানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বিক্ষুব্ধ জনতা ক্যামেরা দুটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
বাজারের একটি সারিতে পাশাপাশি পাঁচটি দোকান বন্ধ। এরপরই ললিত দাশের কুলিং কর্নার। ৮০ বছর বয়সী ললিত দাশ শনিবার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে দিনে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা বিক্রি করতাম। আজ দুপুর পর্যন্ত ৩০ টাকার বিক্রি হয়েছে। এভাবে বেচাকেনা করে ঘর চালানো সম্ভব না।’
বাজারের একটি দোকানে মুদি মালামাল কিনতে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা রাখাল দে। তিনি বলেন, ‘রাউজানের অন্য এলাকার তুলনায় এই বাজার ছিল তুলনামূলক শান্ত। এমন একটি বাজারে হঠাৎ মানুষ খুন হলো। ভয়ে কেউ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাজারে আসতে সাহস পাচ্ছে না।’
দুটি সিসি ক্যামেরাই অচল
বাজারে দুটি সিসি ক্যামেরা থাকলেও দুই বছরের বেশি সময় ধরে তা অচল রয়েছে বলে জানান দোকানিরা। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে ক্যামেরা দুটি লাগানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বিক্ষুব্ধ জনতা ক্যামেরা দুটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর আর ক্যামেরা দুটি চালু করা হয়নি।
বাজারের দুটি সিসি ক্যামেরার একটি এনটু দে নামে এক দোকানির দোকানের সামনে। তিনি বলেন, ক্যামেরাগুলো সচল থাকলে অপরাধীরা ভয় পেতেন, তাঁদের শনাক্ত করাও সহজ হতো। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে দুটি ক্যামেরা অচল হয়ে পড়ে রয়েছে।
যুবদল কর্মী করিমকে যে স্থানে খুন করা হয় এর পাশেই ‘হৃদয় স্টোর’ নামের একটি কুলিং কর্নার। দোকানি হৃদয় বলেন, তাঁর দোকানের সামনেই নৃশংস ঘটনাটি ঘটেছে। আতঙ্কে তিনি দোকান বন্ধ রেখেছিলেন। শনিবার সকালে খুলেছেন। সিসি ক্যামেরা থাকলে এমন ঘটনায় অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা যেত বলে দাবি করেন তিনি। হৃদয় বলেন, ‘আজ ২০০ টাকাও বিক্রি হয়নি। আগে দিনে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা বিক্রি করা যেত। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা করা সম্ভব হবে না।’
সিসি ক্যামেরার বিষয়ে জানতে চাইলে উরকিরচর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরমান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে দুটি সিসি ক্যামেরা ইউপি কার্যালয় থেকে মনিটরিং করা হতো। কিন্তু ৫ আগস্টের পর তা আর নেই। এসব ক্যামেরা আবার সচল করাও সহজ নয়। তবে সিসি ক্যামেরা সচল করার চেষ্টা করা হবে।’
মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার নেই
যুবদল কর্মী মোহাম্মদ করিমকে (৩৬) হত্যার ঘটনায় গতকাল শুক্রবার রাতে একটি মামলা হয়েছে। নিহত করিমের স্ত্রী বিলকিস আক্তার বাদী হয়ে রাউজান থানায় মামলাটি করেন। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে এ মামলা করা হয়। এদিকে হত্যাকাণ্ডের দুই দিনেও পুলিশ এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
মামলার বিষয়টি রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন। আজ শনিবার সকালে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, বাদী কোনো আসামির নাম উল্লেখ করেননি। কতজন হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন, সেটিও দেননি। আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো কোনো আসামিকে শনাক্ত করা যায়নি। তাই গ্রেপ্তার করাও সম্ভব হয়নি।
রাউজানে আবার প্রকাশ্যে খুন, পুলিশকেই ‘চ্যালেঞ্জ’ সন্ত্রাসীরকাতার থেকে ছুটে এলেন বড় ভাই
শনিবার জোহরের নামাজের পর স্থানীয় মাঠে জানাজা শেষে সামাজিক কবরস্থানে দাফন হয় মোহাম্মদ করিমের লাশ। এর আগে শুক্রবার রাতে ময়নাতদন্ত শেষে লাশটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। কাতার থেকে নিহত করিমের বড় ভাই মোহাম্মদ সেলিম দেশে আসার পর লাশটি দাফন করা হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে কাতার থেকে শনিবার দুপুরে রাউজানে পৌঁছান মোহাম্মদ সেলিম। এর আগে তাঁর ভাই মোহাম্মদ করিমের লাশ একটি ফ্রিজারে রাখা হয়।
নিহত করিমের স্ত্রী বিলকিস আকতার সন্তানদের নিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর আমানবাজার এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে আসছেন। রাতে স্বামীর লাশ নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে যান তিনি। প্রথম আলোকে বিলকিস আকতার বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুরে করিম হাটহাজারীতে ছিলেন। তাঁকে ফোন করে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি স্বামীর হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টি হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হয়েছে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হওয়াসহ সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।