পতিত জমিতে সবজির বাগান, বাড়তি আয় মতিনের

· Prothom Alo

উপজেলা সদরের ছোট একটি সড়ক। দুই পাশে বসতবাড়ি। মাঝখানে সবুজে ঘেরা একটি বাগান। কোথাও গাছে ঝুলছে টমেটো, কোথাও মাচায় উঠেছে লাউগাছ। সারি সারি শসাগাছের ফাঁকে দেখা যাচ্ছে হলুদ তরমুজের গাছ। কয়েক বছর আগেও এই জমি পড়ে ছিল পতিত।

Visit freshyourfeel.org for more information.

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা সদরের দক্ষিণ জাঙ্গিরাই এলাকার এই জমিতে এখন সারা বছরই চাষ হচ্ছে নানা ধরনের সবজি। বাগানটি গড়ে তুলেছেন দক্ষিণ জাঙ্গিরাই এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল মতিন (৩৫)। কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহ থেকে পতিত জমিতে সবজি চাষ শুরু করেছিলেন তিনি। এখন ব্যবসার পাশাপাশি সবজি চাষ থেকেও বাড়তি আয় করছেন মতিন। গ্রীষ্মে চাষ করছেন টমেটো, লাউ ও শসার মতো শীতকালীন সবজি।

যেভাবে শুরু

২০২২ সালে বাড়ির পাশে মতিনদের পরিবারের প্রায় ২০ শতক জমি খালি পড়ে ছিল। একইভাবে ওই জমির পাশে অন্য এক মালিকের আরও প্রায় দুই বিঘা (৬০ শতক) জমিও পতিত ছিল। এসব জমি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করেন মতিন। সিদ্ধান্ত নেন সেখানে শাকসবজি চাষ করবেন। পরিকল্পনার কথা ওই জমির মালিককে জানিয়ে তাঁর কাছ থেকে ৬০ শতক জমি বছরে ২৫ হাজার টাকায় ইজারা নেন। এরপর উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। কর্মকর্তারাও তাঁকে পরামর্শ ও উৎসাহ দেন।

খেতের পাকা টমেটো দেখাচ্ছেন মতিন। গত বুধবার সকালে জুড়ী সদরের দক্ষিণ জাঙ্গিরাই এলাকায়

তবে একসঙ্গে ব্যবসা ও কৃষিকাজ সামলানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন মতিন। তখন স্থানীয় কৃষক তাজুল ইসলাম (৪০) সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। মতিন পুঁজি দেন, আর তাজুল শ্রম দেন।

প্রথমবার পুরো জমিতে টমেটো, ধনেপাতা, কাঁচা মরিচ ও বেগুন চাষ করেন তাঁরা। জমি প্রস্তুত, বীজ, চারা, সার, সেচ, বাঁশের খুঁটি ও বেড়া তৈরিতে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। পরে সবজি বিক্রি করে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা লাভ করেন। লাভের টাকা দুজন ভাগ করে নেন। এতে মতিনের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।

ব্যবসা ও কৃষিকাজ একা সামলান

২০২৩ সাল থেকে একা সবজি চাষ শুরু করেন মতিন। প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়ে জমিতে চলে যান। সকাল নয়টা থেকে সাড়ে নয়টার দিকে বাড়ি ফিরে গোসল ও নাশতা সেরে চলে যান দোকানে। রাতে বাড়ি ফেরেন। তাঁর বাগানে একজনের কর্মসংস্থানও হয়েছে। দিনের বাকি সময় জমি পরিচর্যার জন্য মাসিক ১৫ হাজার টাকা বেতনে একজন শ্রমিক রেখেছেন তিনি। এভাবেই ব্যবসার পাশাপাশি কৃষিকাজও চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রথমবার সরাসরি মাটিতে সবজি চাষ করেছিলেন মতিন। কিন্তু বৃষ্টিতে জমির মাটি সরে গিয়ে নানা সমস্যা হতো। তাই দ্বিতীয়বার চাষপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনেন। ব্যবহার শুরু করেন মালচিং পেপার (গাছের গোড়ার মাটির পুষ্টি উপাদান ধরে রাখতে পলিথিনের ঢাকনা) ও পলিশেড (আবহাওয়া ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পলিথিনের ছাউনি)।

মতিনের ভাষ্য, আধুনিক পদ্ধতিতে খরচ বেড়েছে। এখন প্রতি মৌসুমে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়। গ্রীষ্মকালে গ্রাফটিং (কলম) পদ্ধতিতে টমেটো চাষ করেন তিনি। পাশাপাশি তরমুজ, শসা, লাউ ও করলার চাষ করেন। শীতকালে চাষ করেন লাউ, টমেটো ও আলু।

খেতে ঝুলছে হলুদ তরমুজ। গত বুধবার সকালে জুড়ী সদরের দক্ষিণ জাঙ্গিরাই এলাকায়

এক সকালে মতিনের বাগানে

জুড়ীর কামিনীগঞ্জ বাজারের বড় মসজিদ সড়ক থেকে পশ্চিম দিকে ইট বিছানো একটি ছোট সড়ক দক্ষিণ জাঙ্গিরাই গ্রামের দিকে চলে গেছে। সড়কের বাঁ পাশে মতিনের সবজির বাগান। গত বুধবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বাগানে নিয়োজিত শ্রমিককে সঙ্গে নিয়ে গাছ থেকে সবজি সংগ্রহ করছেন মতিন। কোথাও সবজির গাছের পরিচর্যা চলছে, কোথাও ফলন দেখেই চোখ জুড়িয়ে যায়।

প্রায় ৩০ শতক জমিতে টমেটো, ২০ শতকে লাউ, ১৫ শতকে শসা ও ১৫ শতকে হলুদ তরমুজের চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ শতক জমিতে স্থানীয় কৃষি বিভাগ গ্রাফটিং টমেটোর প্রদর্শনী দিয়েছে।

আলাপচারিতায় আবদুল মতিন বলেন, ‘জায়গাটা বেকামা (পতিত) পড়ি আছিল, কামে লাগাইলাম আরকি। সারা বছরই খেতে সবজি থাকে। ঘরে খাওয়ার সবজি কেনা লাগে না বলতে পারেন। আমরা তিন ভাই। বাকি দুই ভাইয়ের পরিবারেও সবজি দিই।’ তিনি জানান, স্থানীয় কিছু পাইকার তাঁর কাছ থেকে সবজি কিনে নেন। আবার তাঁর দোকানের সামনেও কিছু সবজি নিয়ে রাখেন। সেখান থেকে অনেকে এক-দুই কেজি করে কিনে নেন। ব্যবসার পাশাপাশি এটি তাঁর বাড়তি আয়ের পথ হয়েছে।

গ্রীষ্মে শীতের সবজি

মতিন বলেন, জমিতে জৈব সারই বেশি ব্যবহার করেন। কীটনাশক তেমন ব্যবহার করতে হয় না। টমেটো, লাউ ও শসা সাধারণত শীতকালীন সবজি হলেও গ্রীষ্মকালে বাজারে এসব সবজির চাহিদা ও দাম দুটোই বেশি থাকে বলে জানান তিনি। এ কারণেই গ্রীষ্মকালীন চাষে এসব সবজি রাখছেন।

বর্তমানে মতিনের বাগানের টমেটো প্রতি কেজি ১১০ টাকা, শসা ৩৫ টাকা ও লাউ আকারভেদে ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হলুদ তরমুজ এখনো পরিপক্ব হয়নি। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে গত ৩০ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় এক লাখ টাকার সবজি বিক্রি হয়েছে। শীত আসার আগপর্যন্ত আরও আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার সবজি বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

মতিনের বাগানে দিনব্যাপী কৃষক প্রশিক্ষণের আয়োজন করে জুড়ী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। গত ২৪ আগস্ট সকালে জুড়ী উপজেলা সদরের দক্ষিণ জাঙ্গিরাই এলাকায়

শুধু সবজি নয়, ফলের বাগানও করেছেন মতিন। বাড়ির কাছে নিজেদের দুই বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু ও পেয়ারা লাগিয়েছেন। পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে কৃষিকাজের পরিধি বাড়িয়েছেন তিনি।

কৃষি বিভাগ যা বলছে

জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল আলম খান বলেন, শ্রম, সময় ও সঠিক পরিচর্যা থাকলে জমিতে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব—মতিন তা প্রমাণ করেছেন। তাঁর সবজির বাগান অন্যদেরও উৎসাহিত করছে।

মাহমুদুল আলম বলেন, স্থানীয় কৃষকদের শাকসবজি চাষে উৎসাহিত করতে গত ২৪ আগস্ট মতিনের বাগানে দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের আয়োজন করে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। প্রশিক্ষণে মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিনও উপস্থিত ছিলেন। তিনিও বাগান ঘুরে মতিনের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন।

একসময় যে জমি পড়ে ছিল, সেখানে এখন সারা বছরই চাষ হচ্ছে কয়েক ধরনের সবজি। ব্যবসার পাশাপাশি এই বাগানই এখন মতিনের বাড়তি আয়ের উৎস।

Read full story at source