ওস্তাদেরা আধুনিক গান গাইতে অনুমতি দিতেন না রফিকুল আলমকে

· Prothom Alo

কখনো আমার মাকে কোনো গান গাইতে শুনিনি—আশির দশকে রেডিওর এই গান আমাদের রৌদ্রদগ্ধ দুপুরে ঘুঘুর ডাকের মতো শান্তি আনত। বৈশাখী মেঘের কাছে জল চেয়ে তুমি কাঁদবে আমি চাই না—এই গানে কে না মুগ্ধ হতো সেই সময়। আবার ‘এ কী খেলা চলছে হরদম’ গানে শোনা গেল অ্যাটম বোমার বিরুদ্ধে শান্তিবাদের স্বর।

Visit bettingx.bond for more information.

রফিকুল আলম এমনি সব অবিস্মরণীয় গানের কণ্ঠশিল্পী। ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ শীর্ষক নিয়মিত সাক্ষাৎকারের অংশ হিসেবে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম তাঁর।

রফিকুল আলমের জন্ম ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর, রাজশাহীর লক্ষ্মণপুরে, নানির বাড়িতে। জায়গাটি ছিল ভারতের সীমান্তের কাছে। তাঁর পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল মালদহ অঞ্চলে। তাঁর বাবা মাহমুদ গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ছিলেন ভূস্বামী, মা মমতাজ মহল।

রেডিওতে তাঁর প্রথম গানও রাজশাহীতে। তখন অডিশন ছিল কঠিন। কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর একবার ‘স্টুডেন্টস ফোরাম’-এ তাঁকে গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। গানটি ভালো হওয়ায় রেডিও কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিশেষ অডিশনের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করে।

শৈশব কেটেছে রাজশাহী শহরে। প্রথম স্কুল ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমি। মুসলমান ছাত্র সেখানে নেওয়া হতো না। কিন্তু তাঁর বড় ভাই ডক্টর সারওয়ার জাহান ছিলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী। পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিচিতিও ছিল। সেই সূত্রেই ব্যতিক্রম ঘটেছিল। রফিকুল আলমও ওই স্কুলে পড়ার সুযোগ পান।

গানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অবশ্য তারও আগে থেকে। বাড়িতে গান ছিল। বাবা ও চাচারা গান করতেন। বড় ভাই শাস্ত্রীয় সংগীত শিখতেন হরিপদ দাসের কাছে। রফিকুল আলমও তাঁর কাছে তালিম নেন।

হরিপদ দাস ছিলেন লক্ষ্ণৌয়ের মরিস কলেজে শাস্ত্রীয় সংগীত শেখা মানুষ। রফিকুল আলমের ভাষায়, ‘উনি খুব বড়লোকের সন্তান ছিলেন, জমিদারসন্তান ছিলেন; গান শিখিয়ে কোনো টাকাপয়সা নিতেন না।’ তাঁর কাছ থেকেই শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি লাইট মিউজিকের প্রতিও আগ্রহ তৈরি হয়।

রেডিওতে তাঁর প্রথম গানও রাজশাহীতে। তখন অডিশন ছিল কঠিন। কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর একবার ‘স্টুডেন্টস ফোরাম’-এ তাঁকে গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। গানটি ভালো হওয়ায় রেডিও কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিশেষ অডিশনের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করে।

১৯৬৩ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথমে অর্থনীতিতে ভর্তি হলেও পরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে চলে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর সংগীতজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি বলছিলেন, ‘রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে সংস্কৃতিচর্চার চমৎকার ব্যবস্থা ছিল।’ তবে সেটা মূলত ছাত্রদের উদ্যোগে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গান গাওয়ার সুযোগ তৈরি করত।

রেডিওতে তাঁর প্রথম গানও রাজশাহীতে। তখন অডিশন ছিল কঠিন। কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর একবার ‘স্টুডেন্টস ফোরাম’-এ তাঁকে গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। গানটি ভালো হওয়ায় রেডিও কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিশেষ অডিশনের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করে।

প্রথম দিকে তিনি শুধু রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। তাঁর ওস্তাদেরা আধুনিক গান গাইতে অনুমতি দিতেন না। প্রথম রেডিওর গান হিসেবে তিনি গেয়েছিলেন, ‘যায় নিয়ে যায় আমায় আপন গানের টানে/ ঘর-ছাড়া কোন পথের পানে।’

এরপর আসে ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধ তাঁর গানের জগতেও পরিবর্তন আনে। তিনি যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। সেখানে গিয়ে তাঁর গানের ধরন বদলাতে শুরু করে। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিজেকে নিয়ে ভাবনা এল যে আমি তো আরও অনেক কিছু দেখাতে পারি আমার গান দিয়ে।’

রবীন্দ্রসংগীতের বাঁধা কাঠামোর বাইরে সেখানে তিনি অন্য ধরনের গান, অন্য ধরনের গায়কির সঙ্গে পরিচিত হন। ‘এভাবে আধুনিক গানে এলাম স্বাধীনতার পর’, বলেন তিনি।

ঢাকায় এসে নতুন জগৎ

স্বাধীনতার পর ঢাকায় আসেন। তখন তাঁর এমএ পরীক্ষা বাকি। একদিকে শিক্ষক তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে গবেষণা ও শিক্ষকতার পথে যেতে বলছেন; অন্যদিকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. মাজহারুল ইসলাম তাঁকে ঢাকায় আসতে বললেন। শেষ পর্যন্ত বাংলা একাডেমির একটি গবেষণা প্রকল্পে যোগ দেন তিনি।

ঢাকায় এসে সংগীতের নতুন জগৎও খুলে যায়। লাকী আখান্দ্, সুজেয় শ্যাম, কাদের হোসেন খানসহ অনেকের সঙ্গে তাঁর কাজের সুযোগ তৈরি হয়। আধুনিক গানেও নিয়মিত হয়ে ওঠেন তিনি।

পরে তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় আরেক সংগীতশিল্পী আবিদা সুলতানার নাম। গানের সূত্রেই তাঁদের পরিচয়। এক অনুষ্ঠানে লাকী আখান্দের মাধ্যমে পরিচয়, পরে একসঙ্গে গান করার সময় ঘনিষ্ঠতা। রফিকুল আলমের কথায়, ‘তার সঙ্গে পরিচয়টা হলো। তারপর আমাদের মধ্যে কখন যে দুজন দুজনকে পছন্দ করে ফেলেছি, সেটা বুঝতে পারিনি।’

ঢাকায় এসে সংগীতের নতুন জগৎও খুলে যায়। লাকী আখান্দ্, সুজেয় শ্যাম, কাদের হোসেন খানসহ অনেকের সঙ্গে তাঁর কাজের সুযোগ তৈরি হয়। আধুনিক গানেও নিয়মিত হয়ে ওঠেন তিনি।

দীর্ঘ সংগীতজীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে আজ তাঁর একটি উপলব্ধি স্পষ্ট। সময় বদলেছে। গান তৈরির ও প্রকাশের পদ্ধতিও বদলেছে। অ্যালবামের যুগ নেই। চলচ্চিত্রেও আগের মতো গান নেই। এখন গান প্রকাশিত হয় ইউটিউব, স্পটিফাই, সাউন্ডক্লাউডের মতো প্ল্যাটফর্মে।

তবু গান থেমে নেই। তাঁর ভাষায়, ‘গত এক মাসে আমি চারটা নতুন গান করেছি।’ অর্থাৎ মাধ্যম বদলেছে, গান করার প্রয়োজনটুকু শেষ হয়নি।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি নিয়েও তাঁর বিশ্বাস খুব সরল। গান, কবিতা, শিল্প-সাহিত্য এই দেশের মানুষের জীবন থেকে আলাদা করা যাবে না। যখন তাঁকে বলা হলো, গান গাইতে বিভিন্ন জায়গায় বাধা দেওয়া হচ্ছে, তখন তাঁর উত্তর, ‘এটা সাময়িক। বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কখনো ভুল করে না।’

তবু গান থেমে নেই। তাঁর ভাষায়, ‘গত এক মাসে আমি চারটা নতুন গান করেছি।’ অর্থাৎ মাধ্যম বদলেছে, গান করার প্রয়োজনটুকু শেষ হয়নি।

তারপর আরও স্পষ্ট করে বললেন, ‘এটা গানের দেশ। এটা প্রকৃতি থেকে আপনি উচ্ছেদ করতে পারবেন না।’

এই বিশ্বাসটুকু নিয়েই রফিকুল আলমের দীর্ঘ পথচলা। রাজশাহীর লক্ষ্মণপুর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ঢাকার মঞ্চ—জীবনের অনেকটা পথ তিনি গানের মধ্য দিয়েই হেঁটেছেন। সময় বদলেছে, গান শোনার মাধ্যম বদলেছে। কিন্তু তাঁর নিজের কথায়, ‘এটাই মাটিরই চাহিদা, এই মানুষের মননের চাহিদা।’

  • আনিসুল হক, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Read full story at source