নিজের গল্প বলার সাহস জোগায় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংগঠন

· Prothom Alo

রাত তখন গভীর। মাত্রই একটা সিনেমা দেখে শেষ করেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারহা তাহসিন। সিনেমা শেষ হলেও তাঁর ভাবনার চাকা ঘোরাটা থামছিল না। মনে হচ্ছিল, একটা সিনেমা তো স্রেফ ঘরে বসে একা একা দেখার ‘জিনিস’ না। সিনেমা নিয়ে কথা বলা, পেছনের ভাবনাগুলো জানা, অন্যের সঙ্গে নিজের ভাবনা ভাগাভাগি করে নেওয়া—এসবও তো সিনেমা উপভোগের অংশ।

ফারহার কাছে সিনেমা একধরনের যোগাযোগ। নিজের চিন্তা ও অনুভূতি অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম। মধ্যরাতের সেই ভাবনা থেকেই জন্ম হয়েছিল শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটির (এসএইউএফএস)। ফারহা তাহসিন এই সংগঠনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

Visit afnews.co.za for more information.

শুনতে সহজ মনে হলেও কাজটা সহজ ছিল না। প্রথমেই প্রশ্ন উঠেছিল, কৃষিভিত্তিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম সোসাইটি কেন? ফারহারা কথায় বোঝাতে না পেরে কাজে বোঝানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নবীনবরণ উপলক্ষে কোর মেম্বাররা (মূল সদস্য) মিলে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট হয়, এটি শুধু সিনেমা নিয়ে আড্ডা দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম নয়। এরপর মেলে অনুমতি।

এআই–যুগে টিকে থাকতে কী করবেন, পড়ুন কম্পিউটারবিজ্ঞানীর পরামর্শ

শুরুর স্বপ্নটা আদতে খুব বড়ও ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেন একসঙ্গে বড় পর্দায় ভালো সিনেমা দেখতে পারেন, সিনেমা নিয়ে কথা বলতে পারেন, এমন একটি জায়গা তৈরি করাই ছিল লক্ষ্য।

প্রথম প্রদর্শনী, প্রথম পরীক্ষা

প্রথম বড় পরীক্ষাটা দিতে হয় প্রথম প্রদর্শনীর দিন। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মিলনায়তনে বড় পর্দা, পপকর্ন, পানি, আসন বিন্যাসের ব্যবস্থা...ঝক্কি তো কম নয়। সেখানেই প্রদর্শিত হয় রায়হান রাফীর তাণ্ডব ও তানিম নূরের উৎসব। উপস্থিত ছিলেন সাড়ে সাত শ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক।

সেই প্রদর্শনীর পর সংগঠনের কাজ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে—প্রতি বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক মিটিং; চিত্রনাট্য, চিত্রধারণ ও সম্পাদনা নিয়ে কর্মশালা, পাশাপাশি সংগঠনটির ফ্ল্যাগশিপ আয়োজন ‘চলচ্চিত্র উৎসব’। এরই মধ্যে দুটি উৎসবের আয়োজন করেছেন তাঁরা।

‘চলচ্চিত্র উৎসব ২.০’-তে অতিথি হয়ে এসেছিলেন রেদওয়ান রনি, রায়হান রাফী ও খন্দকার সুমনের মতো নির্মাতারা। সেখানে সাঁতাও সিনেমা নিয়ে খন্দকার সুমনের একটি কথা আলাদাভাবে মনে রেখেছেন তাঁরা। সুমন বলেছিলেন, ‘সিনেমাটি তৈরির এত বছর পর সেটা যেন তার আসল জায়গায় পৌঁছেছে; মাটি ও কৃষির সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে।’

শুধু দর্শক নন

এসএইউএফএসের কাজ শুধু সিনেমা প্রদর্শনের মধ্যেই থেমে নেই। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা নওশিন মাইশার মতে, অনেক সদস্য এখন নিজেরাই চিত্রনাট্য লিখছেন, শুটিং ও এডিটিং শিখছেন। পরিবর্তনটা তাঁর চোখে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে তখন, যখন কেউ প্রথমে শুধু সিনেমা দেখতে আসে, পরে আবার ফিরে এসে সিনেমাটোগ্রাফি, চরিত্র নির্মাণ কিংবা গল্প বলার ধরন নিয়ে কথা বলা শুরু করে।

সংগঠনের সভাপতি ও সহপ্রতিষ্ঠাতা মো. আল আমিনও তেমনই একজন। তাণ্ডব সিনেমার পেছনে যুক্ত ছিলেন তিনি। দলের একাংশ দম চলচ্চিত্রেও কাজ করেছে। সংগঠনটি কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও ইউনেসকো আয়োজিত ‘লেটস টক ওয়েলবিয়িং’ ভিডিও প্রতিযোগিতায় ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে প্রথম হয়েছে এসএইউএফএস। জাতীয় চলচ্চিত্র সংসদ সম্মেলন ২০২৬-এ অংশ নেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় চলচ্চিত্র আর্কাইভের কর্মশালাতেও যুক্ত হয়েছে সংগঠনটি।

অক্সফোর্ডের ইএমবিএতে প্রথম রিশাদ, গ্র্যাজুয়েশন স্পিকারও তিনি

বড় পর্দার পেছনের ছোট ছোট লড়াই

বড় আয়োজন মানেই বড় খরচ। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক সময়ই ভাবনার সীমানা ছোট করে আনতে হয়েছে। কখনো মাসিক চাঁদা, শিক্ষকদের অনুদান, নিজেদের পকেটের টাকা দিয়েও অনুষ্ঠান আয়োজন করেছেন তাঁরা।

আগামী দু-তিন বছরে এসএইউএফএসকে দেশের অন্যতম সক্রিয় ফিল্ম সোসাইটি হিসেবে দেখতে চান আল আমিন। জাতীয় পর্যায়ের একটি চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের স্বপ্নও দেখেন তাঁরা। নওশিন আবার বেশ স্পষ্ট করেই বললেন, ‘এটা কোনো ফেসবুক পোস্ট, কোনো ট্রফি বা কোনো ভিউ গণনার বিষয় নয়। এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে একজন মানুষ তার নিজের গল্পটা বলার সাহস পাবে।’

Read full story at source