ট্যুরেট সিনড্রোম ছাপিয়ে সব জয় করা বিলি আইলিশ

· Prothom Alo

বিলি আইলিশকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই!

Visit esporist.com for more information.

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে গ্র্যামি (যাকে বলা হয় বিশ্বসংগীতের অস্কার) অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন প্রকাশের পর একটা ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে ইন্টারনেটে। সেখানে দেখা যায়, বিলি কোনো একটা অনুষ্ঠান থেকে বের হচ্ছেন। আর পাশ থেকে একজন গালি দিয়ে বললেন, ‘বিলি, ইউ ডোন্ট ডিজার্ভ আ গ্র্যামি।’ ১৭ বছর বয়সী বিলির ভ্যাবাচেকা খাওয়া অবাক, কৌতূহলী চোখ লোকটাকে খুঁজতে গেলে তাঁর বডিগার্ডরা তাঁকে ঘিরে ধরে দ্রুত সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গাড়িতে তোলেন।

কাট টু, ২৬ জানুয়ারি, ২০২০। সেটা ছিল গ্র্যামির ৬২তম আসর। গ্র্যামির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৪টি বিভাগ হলো ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’, ‘রেকর্ড অব দ্য ইয়ার’, ‘সং অব দ্য ইয়ার’ ও ‘বেস্ট নিউ আর্টিস্ট’। এই চারটিকে বলা হয় ‘বিগ ফোর’। বিগ ফোরের সব কটিতে জয়ী হলেন বিলি। এগুলো ছাড়াও ভাই ফিনেস ও’কনেলের সঙ্গে যৌথভাবে আরও একটি গ্র্যামি জিতলেন। মোট পাঁচটি। সারা বিশ্বের গণমাধ্যমে ফলাও করে লেখা হলো, গ্র্যামির ৬২ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কেউ ‘বিগ ফোর’ পেলেন। ভবিষ্যতে আর কেউ আবার এই ইতিহাস গড়বেন, সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। সেই রাতে বাড়িতে ফিরে পাঁচ-পাঁচটি গ্র্যামি হাতে ছবি ইনস্টাগ্রামে আপলোড করে বিলি ক্যাপশনে লিখলেন, ‘আই ডিজার্ভ দেম অল’!

তাই বিলি কত বড় তারকা বা কত সফলতা পেয়েছেন অথবা কী কী রেকর্ড গড়ে ইতিহাসে নাম করে নিয়েছেন, সেসব বলা বৃথাই। দিস্তা দিস্তা কাগজ শেষ হয়ে যাবে, তবু ফুরোবে না। বরং ১২ কোটি ৪০ লাখ ইনস্টাগ্রাম অনুসারীসহ এই সবকিছুর আড়ালে বিলি আইলিশ মানুষটা কেমন, সেই খোঁজে উঁকি দেওয়া যাক তাঁর ব্যক্তিজীবনের পাতায়।

ট্যুরেট সিনড্রোমে আক্রান্ত এক সুপারস্টার

সম্প্রতি বিলি আইলিশ উপস্থিত হলেন মার্কিন অভিনেত্রী, কমেডিয়ান অ্যামি পোলারের পডকাস্ট গুড হ্যাং-এ। সেদিন তিনি মন খুলে কথা বললেন তাঁর ট্যুরেট সিনড্রোম নিয়ে। হ্যাঁ, তুমি ঠিকই পড়ছো, বিশ্বসংগীতের এই সুপারস্টার বিরল স্নায়বিক রোগ ট্যুরেট সিনড্রোমে আক্রান্ত! ২৪ বছর বয়সী এই মার্কিন তারকা সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বা ক্যামেরার সামনে থাকলে নিজের ট্যুরেট টিক ঢাকতে সম্ভাব্য সবকিছু করেন। এমনকি প্রথম প্রথম নিজের এই রোগ নিয়ে হীনম্মন্যতার কারণে জনসম্মুখে বা ক্যামেরার সামনে আসতেও চাইতেন না। এক দশকের ক্যারিয়ারে অনেক রেকর্ডেড সাক্ষাৎকার থেকে নানা অংশ বিলির অনুরোধে ফেলে দেওয়া হয়েছে তাঁর অস্বাভাবিক শারীরিক নড়াচড়া ও আওয়াজের জন্য। বিলি জানান যে তিনি নিজেকে ‘এক্সট্রিমলি প্রাইভেট পারসন’ হিসেবে আইডেন্টিফাই করেন। আর এর পেছনে তাঁর ট্যুরেট সিনড্রোমের খানিকটা ‘হাত’ রয়েছে। আর নিজেকে আড়াল করে রাখাটা তাঁকে অনেক কিছু থেকে রক্ষাও করেছে। বিলি এই পডকাস্টে বলেন, ‘যেটি আপনার দুর্বলতা, অক্ষমতা বা হীনম্মন্যতা, সেটি-ই আসলে আপনার সুপারপাওয়ার। সেটি-ই আপনাকে নিজের প্রচেষ্টায় প্রতিনিয়ত সব বাধা অতিক্রম করে আপনাকে নিজের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে, আপনার ভেতর থেকে সেরা মানুষটাকে বের করে আনতে সাহায্য করে। অবশ্য শুরুর দিকে বিষয়গুলো আসলেই কঠিন।’

কী এই ট্যুরেট সিনড্রোম

২০১৮ সালে বলিউডে মুক্তি পায় রানী মুখার্জি অভিনীত ড্রামা হিচকি। মার্কিন শিক্ষক, লেখক, মোটিভেশনাল স্পিকার ব্র্যাড কোহেনের আত্মজীবনীমূলক বই ফ্রন্ট অব দ্য ক্লাস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বানানো সিনেমাটিতে রানী ট্যুরেট সিনড্রোমে আক্রান্ত এক শিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান। আসলে ট্যুরেট সিনড্রোম হলো একটি জটিল স্নায়বিক ব্যাধি, যা শৈশব বা কৈশোরে শুরু হয়। এটি অনিচ্ছাকৃত, পুনরাবৃত্তিমূলক শারীরিক নড়াচড়া (মোটর টিক) এবং অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ বা কণ্ঠস্বর (ভোকাল টিক)। মোটর টিকের প্রভাবে কেউ পা নাচান, কেউবা বারবার চোখের পলক ফেলেন, মাঝেমধ্যেই মুখ বাঁকান, মাথা বা ঘাড় আকস্মিকভাবে নড়াচড়া করেন। আবার ভোকাল টিকের প্রভাবে গলা পরিষ্কার করেন, অকারণ ফোঁস ফোঁস করেন, নাক দিয়ে শব্দ করেন বা হঠাৎ করে কোনো শব্দ বা কথা বারবার বলতেই থাকেন। লক্ষণগুলো সাধারণত মানসিক চাপ বা উত্তেজনায় বৃদ্ধি পায়।

জেনারেশনের পর জেনারেশন আমাদের গান শুনছে—ওয়ারফেজ

তখন বিলির সবে এগারো…

মাত্র ১১ বছর বয়সে বিলি আইলিশের ট্যুরেট সিনড্রোম ধরা পড়ে। (আর মাত্র ১৩ বছর বয়সে সাউন্ডক্লাউডে ‘ওশান আইজ’ গানটি মুক্তি দেওয়ার পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় অর্থাৎ রাতারাতি তারকা বনে যান বিলি।) এই পডকাস্টে তিনি বলেন, ‘প্রায়ই আমার হাঁটু, কনুই বা হাত অস্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করতে থাকে। অনেক সময় আমি যেটা চিন্তা করি, নিজের অজান্তেই তা বলে ফেলি। ফলে বুঝতেই পারছেন, জনসম্মুখে থাকা বা সাক্ষাৎকার দেওয়া আমার জন্য কতটা ভীতিকর ছিল।’ এই ‘লাভলি’ তারকা আরও বলেন, ‘আমার মোটর ও ভোকাল টিক ঠিক করার জন্য আমি দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছি। প্রচণ্ড চাপেও আমি মানসিকভাবে স্থিতিশীল থাকার রীতিমতো অনুশীলন করেছি। এখন আমি আমার টিক অনেকটাই দমন করতে পারি। দেখুন, এই ট্যুরেটের কারণেই কিন্তু এখন আর আমি কিছুতেই উত্তেজিত হই না, রেগে যাই না বা হতাশ হই না। জীবনে যা-ই ঘটুক, সেটাকে শান্তভাবে গ্রহণ করতে পারি। ট্যুরেট নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ব্যাপারটা আত্মস্থ করতে হয়েছে। অথচ আমার জীবনের জন্য, যে কারও জীবনের জন্য এটি সবচেয়ে বেশি জরুরি। আমি আমার দুর্বলতাকে এভাবেই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি বানিয়ে নিয়েছি।’

একটা প্রশ্ন

এআই কি শিল্পীদের রিপ্লেস করতে পারবে? ওই পডকাস্টে এমন প্রশ্নের উত্তরে বিলি বলেন, ‘হ্যাঁ, এআই গান লিখছে, কম্পোজ করছে, গাইছে, সিনেমা বানাচ্ছে, সবই ঠিক আছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, মানুষের তৈরি শিল্পের কদর সব সময় থাকবে। কেননা সেই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওই মানুষটির জীবনের ব্যক্তিগত ইতিহাস, অভিজ্ঞতা আর অনুভব। যেটার সঙ্গে আরেকজন মানুষ সহজেই কানেক্ট করতে পারেন। এই হিউম্যান কানেকশনই সত্যিকারের শিল্পের (মানুষের তৈরি শিল্পের) সবচেয়ে বড় শক্তি। সত্যিকারের শিল্প মানুষকে যে মানবিক অনুভূতি দেয়, দিনশেষে সেটি-ই জয়ী হবে। আর সেটিই টিকে থাকবে।’

প্রিয় বন্ধু জাস্টিন বিবার

জাস্টিন বিবারের সঙ্গে বিলি আইলিশের একটি ভিন্নমাত্রার সম্পর্কের কথা বিলি আইলিশের ভক্তমাত্রই জানেন। ২০১৯ সালে জাস্টিন বিবার বিলির ‘ব্যাড গাই’ গানের রিমিক্সে অংশ নেন। সেই ভিডিওতে দেখা যায় ছোট্ট বিলির ঘরজুড়ে বিবারের পোস্টার। ২০২৪ সালে বিলি আইলিশ ‘হিট মি হার্ড অ্যান্ড সফট’ ট্যুরে লস অ্যাঞ্জেলেস প্রিমিয়ারে বলেন, ‘আমি কৃতজ্ঞ যে ও আমার জীবনে আছে। আমি ওকে খুব ভালোবাসি। ও আমার অনুপ্রেরণা। আমি জানি না, কখনো একসঙ্গে আমাদের কাজ করা হবে কি না। তবে আমি জানি যে আমি সব সময় ওকে (বিবারকে) একই রকমভাবে ভালোবাসব।’

সম্প্রতি ২০২৬–এর এপ্রিলে কোচেলা মিউজিক অ্যান্ড আর্ট ফেস্টিভালের ২৫তম আসরে যখন মঞ্চে বিবার গাইছিলেন, দর্শকসারিতে বিবারের স্ত্রী হেইলি ও বিলি নাচছিলেন। হেইলিই বিলিকে জোর করে স্টেজে পাঠিয়ে দেন। তখন বিবার ‘ওয়ান লেস লোননি গার্ল’ গাচ্ছিলেন। স্টেজে উঠে বিলি গলা মেলাবেন কী, আবেগে কেঁদে ফেলেন। আর সেটি লুকাতে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢাকেন। এদিকে গান গাইতে গাইতেই বিবার এসে বিলিকে জড়িয়ে ধরেন। সারা বিশ্বের ভক্তরা সেই ভিডিওর নিচে ‘চোখে জল’ ইমোজি আর ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে ফেলেছেন। অনেকেই এটিকে একটা ‘ফুল সার্কেল হিস্টোরিক্যাল মোমেন্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বিলি বহুবার বলেছেন যে তিনি ছোটবেলা থেকেই বড় বিবারভক্ত । বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জাস্টিন বিবারও খুব অল্প বয়সে খ্যাতি পান। আর সেই খ্যাতি সংগীতের দুনিয়ার অত্যন্ত মেধাবী বিবারের স্বাভাবিক শৈশব, কৈশোর কেড়ে নিয়েছিল। তাঁর জীবনকে অনিয়ন্ত্রিত আর বিভীষিকাময় করে তুলেছিল। সময়ের সঙ্গে সেসব পেরিয়ে বিবার নিজের ছন্দে ফিরেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ কারণেই হয়তো বিবারের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ও কৃতজ্ঞ বিলি। কেননা, বিবারের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে বিলি নিজেকে সামলেছেন। ম্যানেজারসহ নিজের একটা শক্তিশালী সাপোর্ট সিস্টেম রেখেছেন। একেবারে শুরু থেকেই বড় একটা দল বিলির অর্থ-সম্পদ, পাবলিক ইমেজ ইত্যাদির দেখাশোনা করেন। বিবারের কেস থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন বিলি। ১৮ বছরের আগপর্যন্ত তিনি খুব একটা জনসমক্ষে আসেননি। এ কারণেই এই দুই তরুণ আন্তর্জাতিক তারকা দুজন দুজনকে ভালো বুঝতে পারেন। দুজনই দুজনকে নিয়ে খুবই ‘প্রটেকটিভ’ অনুভব করেন।

গান যেভাবে বাঁচিয়েছিল কিশোরীর প্রাণ

জেন্ডার–ফ্লুইড ফ্যাশন

বিলি আইলিশের জেন্ডার–ফ্লুইড ফ্যাশন আধুনিক পপ সংস্কৃতিতে খুবই প্রভাবশালী। তিনি শুরু থেকেই প্রচলিত ‘নারী পপস্টার’ ইমেজের বাইরে গিয়ে এমন সব পোশাক পরেছেন, যা নারী বা পুরুষ—কোনো একটি নির্দিষ্ট জেন্ডারের ফ্যাশনধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

জেন্ডার-ফ্লুইড ফ্যাশন কী

জেন্ডার-ফ্লুইড বলতে এমন পোশাক ও স্টাইলকে বোঝায়, যা ঐতিহ্যগতভাবে ‘পুরুষালি’ বা ‘নারীসুলভ’ হিসেবে ভাগ করা ধারণাকে ভেঙে দেয়। এখানে মানুষ নিজের স্বাচ্ছন্দ্য, ব্যক্তিত্ব ও প্রকাশকে গুরুত্ব দেয়, সমাজের নির্ধারিত জেন্ডার নিয়মকে নয়।

ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বিলি ওভারসাইজড হুডি, ব্যাগি প্যান্টস, বড় জার্সি ও লেয়ার্ড পোশাক পরতেন। এগুলো তাঁর সিগনেচার লুক হয়ে ওঠে।

বিলি গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি চাই না মানুষ আমাকে আমার লিঙ্গ বা শরীর দিয়ে বিচার করুক। আমি মানুষ আর আমি একজন শিল্পী। ব্যস, এটুকুই।’

বিলি স্ট্রিটওয়্যার, স্কেট কালচার ও হাই ফ্যাশন—এই তিনটিকে একসঙ্গে মিশিয়েছেন। তিনি প্রায়ই গুচি, ব্যালেন্সিয়াগা, শ্যানেল বা লুই ভুতোঁর ওভারসাইজড ও অ্যান্ড্রোজাইনাস (যেসব পোশাক বা অনুষঙ্গ নারী ও পুরুষ উভয়ের ফ্যাশনের উপাদান বহন করে, সেগুলোকে বলা হয় অ্যান্ড্রোজাইনাস অ্যাসথেটিক) আউটফিট পরেছেন।

নিয়ন সবুজ, রুপালি, কালো-সবুজ, প্লাটিনাম ব্লন্ড—বিভিন্ন হেয়ার কালার হয়ে উঠেছে বিলির পরিচয়ের অংশ। তাঁর স্টাইল সব সময়ই ছিল ‘নিয়ম ভাঙা’ আর নিরীক্ষাধর্মী।

গ্র্যামি হাতে বিলি আইলিশ। ছবি: এএফপি

কেন তাঁর ফ্যাশন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে

বিলির স্টাইল তরুণদের কাছে, বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। কেননা তিনি ‘পারফেক্ট’, ‘জিরো ফিগার’ বা ‘আর্টিফিশিয়াল বিউটি’ অথবা ‘গ্ল্যামারাস’ হওয়ার চাপকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। বিলি দেখিয়েছেন যে একজন নারী শিল্পীকে সব সময় শারীরিক সৌন্দর্য বা প্রচলিত সৌন্দর্যের মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে, বিষয়টি এমন তো নয়ই; বরং প্রচলিত সৌন্দর্যের ধারণাকে মাড়িয়ে নিজের মতো হয়ে ওঠাকেই উদ্‌যাপন করেছেন বিলি।

বিলি যে ফেমিনিন বা ক্ল্যাসিক গ্ল্যামার লুকে কখনো দেখা দেননি, বিষয়টি তা নয়। ভোগ–এর ফটোশুট বা মেট গালাতে তাঁকেও নিজের নারীত্ব আর শরীরী সৌন্দর্যকে উদ্‌যাপন করতে দেখা গেছে। তবে তিনি ভোগকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেই স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘এটি আমার কোনো ফ্যাশন স্টেটমেন্ট বা স্টাইলের কোনো পরিবর্তন নয়। বরং আমি নিজেকে একটু ভিন্নভাবে দেখলাম। নারীত্ব, পুরুষত্ব বা জেন্ডার নিউট্রালিটি—এই সবই একটা মানুষের পরিচয়ের অংশ হতে পারে।’

বিশ্বকাপের নতুন গান

নিজের সম্পদ বাড়তে দেন না, ধনকুবেরদের প্রশ্নের ওপর রাখেন বিলি

বিলিয়নিয়ারদের নিয়ে এক রকম অ্যালার্জি আছে বিলির। তিনি প্রতিনিয়ত বিশ্বের সেরা ধনকুবেরদের ট্যাগ করে প্রশ্ন তোলেন যে কেন এত টাকা তাঁরা নিজেদের কাছে জমিয়ে রাখছেন? একটা মানুষের ভালোভাবে বেঁচে থাকতে ঠিক কত টাকা লাগে? ইলন মাস্কের উদ্দেশে বিলি বলেছেন, ‘এত টাকা দিয়ে আপনি কী করবেন? আপনি যতটুকু ভোগ করতে পারবেন, সেটুকু রেখে বাকি অর্থ বিপন্ন মানুষ ও প্রাণীদের জন্য, আরেকটু ভালো পৃথিবীর জন্য খরচ করুন।’

অতি ধনী হওয়ার সংস্কৃতি ও প্রথাকে বিলি তীব্র ভাষায় নিন্দা জানিয়েছেন। এ চর্চার কারণে যে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ প্রতিনিয়ত ভয়াবহ অর্থনৈতিক বৈষম্যের মুখে পড়ছে, তা-ও জানাতে ভোলেননি এই তরুণী। ২টি অস্কার, ১০টি গ্র্যামি ঝুলিতে নিয়ে ঘোরা বিলি কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক হতে পারতেন চাইলেই। কেবল ‘হ্যাপিয়ার দ্যান এভার’ ট্যুর থেকেই আয় হয়েছে ১৩১ মিলিয়ন ডলার। পিপল ম্যাগাজিনের তথ্য অনুসারে ‘হিট মি হার্ড অ্যান্ড সফট’ ট্যুরের আয় ছাড়িয়ে গেছে ২৫০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু জানলে অবাক হবে, নিয়ম করে বিলি তাঁর সম্পদ বাড়তে দেন না। সেলিব্রিটি নেট ওর্থ ও দ্য ফক্সের রিপোর্ট অনুসারে (২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত) বিলির মোট সম্পদের পরিমাণ ৭০ মিলিয়ন ডলার বা সাড়ে ৮০০ কোটি টাকা (বিলি যে পর্যায়ের তারকা, সে হিসেবে এ অর্থ অনেক কম)। বিলি চাইলে নিজের ব্র্যান্ড ভ্যালু ব্যবহার করে ২ বছরে শুধু ইনস্টাগ্রাম পোস্ট আব বিজ্ঞাপন থেকেই ৮০০ কোটি টাকা আয় করতে পারেন। প্রতিবছরই বিভিন্ন সংস্থা, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিয়ে কাজ করা, অভিবাসী, যুদ্ধশিশু ও প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থাকে নিয়ম করে শত শত কোটি টাকা দেন বিলি। আর ধনীদেরও সম্পদ কুক্ষিগত না করে রেখে তা যাতে অন্য মানুষের জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে কাজে লাগে, সে জন্য উৎসাহিত করেন। এটাকে কোনোভাবেই ‘দান’ বলতে রাজি নন বিলি। তিনি মনে করেন, এটা অন্যদের অধিকার।

পোষা কুকুরের সঙ্গে ডুয়েট

বিলির ‘অক্সিটোসিন’ ও ‘আই ডিডন্ট চেঞ্জ মাই নাম্বার’ গানে তাঁর পোষা কুকুর শার্কের ‘ঘেউ ঘেউ’ ও ‘গরগর’ আওয়াজ ব্যবহার করেছেন। আর এটাকে তিনি বলেছেন শার্কের সঙ্গে ডুয়েট! ‘হ্যাপিয়ার দ্যান এভার’ অ্যালবামেও ব্যবহার করা হয়েছে শার্কের নানা শব্দ। একাধিক সাক্ষাৎকারে বিলি জানিয়েছেন, তাঁর মানসিক শান্তি ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল থাকার একটা বড় কারণ তাঁর পোষা কুকুর শার্ক।

বিলি আইলিশ তাঁর ফ্যাশন, চিন্তাধারা আর জীবনযাপন দিয়ে মূলধারার পপ সংস্কৃতির আলোচনাকে আরও বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছেন। বিলি জানিয়েছেন, আপনার অর্থ কেবল আপনার অর্থ নয়। তাতে অন্যেরও ভাগ আছে। এমনকি ভাগ আছে পৃথিবীর একটি গাছ, বন, জঙ্গল, একটি পাখি বা একটি প্রাণীরও। পৃথিবীকে সবার জন্য আরেকটু নিরাপদ, বাসযোগ্য করার জন্য ‘শি ইজ মেকিং আ ডিফারেন্স’। বিলি তরুণদের তাঁর মতো বা অন্য কারও মতো নয়, বরং তাঁদের নিজেদের মতো হতে উৎসাহিত করেছেন। বিলি জানান অর্থ বা জনপ্রিয়তা নয়, যে যেমন, তেমন হয়ে বেঁচে থাকা, সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বাঁচা, বেড়ে ওঠা, নিজের মতো করে আলো ছড়ানো আর তার মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত নিজের সেরা হয়ে ওঠাই সত্যিকারের সফলতা!

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, পিপল, ভোগ ও অনলাইনে প্রকাশিত বিলির বিভিন্ন সাক্ষাৎকার অবলম্বনেমস্তিষ্কের ব্যায়াম, গান আর মিউজিক ওয়ার্কশপের কিআড্ডা

Read full story at source