প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যা এক বা ছয় মাসে সমাধান সম্ভব নয়: ববি হাজ্জাজ
· Prothom Alo
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। তাই এক দিন, এক মাস বা ছয় মাসে এসব সমাধান করা সম্ভব নয়। সরকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কাজ করছে। আগামী ২, ৩, ৫ বা ১০ বছরে নির্ধারিত উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়মিত নজরদারি করতে হবে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
‘সরকার কতখানি এগোল? প্রাথমিক শিক্ষার ওপর আলোকপাত’ শীর্ষক এক সংলাপে অংশ নিয়ে এ কথা বলেন ববি হাজ্জাজ।
এ সংলাপের আয়োজক ছিল বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। আজ শনিবার ঢাকায় সংস্থাটির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানের উপস্থাপনায় সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও শিক্ষা বাজেট বিশ্লেষণ করা হয়।
সিপিডিরর পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট ২৪টি প্রতিশ্রুতির কোনোটিই এখনো পুরোপুরি কার্যকর পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কিছু উদ্যোগের প্রস্তাব করা হয়েছে, কিছু শুরু হয়েছে, আবার কিছু নীতি ও আইনগত পর্যায়ে রয়েছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পিইডিপি-৫ অনুমোদন হয়নি। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সিপিডি দ্রুত কর্মসূচি অনুমোদন, বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের
সংলাপে ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার জন্য পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘদিনের প্রকল্পকাঠামো এখন অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছে। তিনি বলেন, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ও শিক্ষার মানোন্নয়নের বিষয়গুলো এক প্রকল্পে রাখায় স্বচ্ছতা ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এ কাঠামোয় পরিবর্তন আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষক সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদগুলোর সঙ্গে কাজ চলছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী বছর থেকে দুর্গম এলাকার সব বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। পুষ্টিকর খাবারের মান নির্ধারণের পরও সরবরাহকারী না পাওয়ায় কিছু এলাকায় দরপত্রপ্রক্রিয়া পিছিয়েছে। দুই দফায় পর্যাপ্ত সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি। এখন তৃতীয়বার দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ চলছে। পাশাপাশি আগামী বছর সীমিত পরিসরে রান্না করা খাবার দেওয়ার পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষার উন্নয়নে ঐকমত্য আছে
স্বাগত বক্তব্যে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষার উন্নয়নে সবার মধ্যে ঐকমত্য দেখা গেছে। আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষাকে প্রধান শক্তি ও ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শিক্ষার সব স্তরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা শক্তিশালী না হলে পরবর্তী স্তরগুলোও শক্তিশালী হবে না। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করতে পারছে না, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। মেধাবী শিক্ষকেরাও শিক্ষকতায় আগ্রহ হারাচ্ছেন। এসব সমস্যা সমাধানে প্রাথমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, মানসম্মত শিক্ষার বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। দেশের উন্নয়ন, শ্রমজীবী মানুষের অগ্রগতি এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের সন্তানদের উপযুক্ত শিক্ষা নিশ্চিত করার ভিত্তি হতে হবে মানসম্মত শিক্ষা।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের দেশে যেতে এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করতে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষা ছাড়া দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অভিভাবকদের বাড়তি কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর খরচ না হয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসন—এই চার পক্ষকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরিতে জন্মনিবন্ধনের জটিলতা দূর করা জরুরি। শিক্ষা সংস্কার কমিশনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
রাজনৈতিক প্রভাব রুখতে হবে
প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে রাজনৈতিক প্রভাব ও হস্তক্ষেপের সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার কথা বলেন ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ইলিয়াস মোল্লা। তিনি বলেন, বিদ্যালয় নির্মাণ ও বিভিন্ন প্রকল্পে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে প্রশাসনের স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান বলেন, বড় প্রকল্পের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলায় গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের বই বা ট্যাব দিলেই হবে না, সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করছে, তা দেখতে হবে। প্রাথমিকের কারিকুলামে শিশুমনোবিজ্ঞান ও শিক্ষামনোবিজ্ঞান যুক্ত করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, শিক্ষকদের ক্যারিয়ার, প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে। প্রশিক্ষণে প্রাথমিক চিকিৎসা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষকদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হচ্ছে। কোনো শিশুকে শিক্ষার বাইরে না রাখতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি নেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং খেলার মাঠ উন্নয়নেও কাজ চলছে। এ জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনের সমন্বয় প্রয়োজন।
চিকিৎসক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাসনিম জারা বলেন, বড় পরিকল্পনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ছোট ছোট বাস্তব সমস্যার সমাধান জরুরি। একটি বিদ্যালয়ে অসুস্থ শিশুকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার মতো প্রস্তুতি শিক্ষকদের ছিল না। চিকিৎসার সরঞ্জামও ছিল অপ্রতুল। এ অভিজ্ঞতা পরিকল্পনা ও বাস্তবতার ব্যবধান তুলে ধরে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পুরোটা কেন ব্যয় হচ্ছে না, তা খুঁজে বের করে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে।
সংলাপে অংশ নেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রাথমিক শিক্ষক–অভিভাবক প্রতিনিধি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি প্রমুখ। তাঁরা প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেন।