দৈনন্দিন লেনদেনে ইসলামের ৬ নির্দেশনা মেনে চলুন
· Prothom Alo

ইসলাম মানুষের জীবনের কোনো ক্ষেত্রকেই দিকনির্দেশনার বাইরে রাখেনি। নামাজ, রোজা, তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদতের মতো মানুষের দৈনন্দিন লেনদেন, বেচাকেনা ও ভোগের ক্ষেত্রেও ইসলাম দিয়েছে সুস্পষ্ট নীতিমালা।
একজন মুমিন কী কিনবেন, কীভাবে ব্যয় করবেন এবং অন্যের সঙ্গে কীভাবে লেনদেন করবেন—এসব বিষয়েও রয়েছে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা।
Visit michezonews.co.za for more information.
চলুন, লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলামের ৬ টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জেনে নিই।
১. নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা
প্রতিটি আমলের প্রাণ হলো নিয়ত। একই কাজ, কিন্তু নিয়তের ভিন্নতায় তার মর্যাদাও বদলে যেতে পারে।
পরিবারের জন্য বাজার করা, সন্তানের জন্য পোশাক কেনা কিংবা অসুস্থ মায়ের জন্য ওষুধ নিয়ে ফেরা—দেখতে এগুলো নিছক পারিবারিক কাজ। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরিবারের দায়িত্ব পালনের নিয়ত থাকলে এই সাধারণ কাজও ইবাদতের মর্যাদা লাভ করতে পারে।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)
২. হালাল পণ্য ও বৈধ লেনদেন নিশ্চিত করা
বেচাকেনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পণ্য, সেবা ও লেনদেনের পদ্ধতি হালাল ও বৈধ হওয়া। এমন কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি করা উচিত নয়, যা ইসলামে নিষিদ্ধ বা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। একইভাবে অন্যায়, প্রতারণা কিংবা অবৈধ উপায়ে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করাও বৈধ নয়।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা করা বৈধ।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)
বেচাকেনার ক্ষেত্রে মাপ ও ওজনের ব্যাপারে সততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য পরিমাণ কম দেওয়াকেও হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন কেন আলেমদের দৃষ্টিতে বৈধ নয়
৩. অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা থেকে বিরত থাকা
মানুষের প্রয়োজন সীমিত, কিন্তু চাহিদার যেন শেষ নেই। একটি প্রয়োজন পূরণ হওয়ার পরই আরেকটি চাহিদা তৈরি হয়। ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রভাবে প্রয়োজন ও বিলাসিতার মধ্যকার সীমারেখাও অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে যায়।
ইসলাম মুমিনকে অপচয় থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৭)
তাই কোনো কিছু কেনার আগে মুমিনের ভাবা উচিত—এটি সত্যিই প্রয়োজনীয় কি-না এবং এর পেছনে ব্যয় করা অর্থটি যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি-না।
প্রয়োজন পূরণ করা দোষের নয়; বরং ইসলাম বৈধ উপায়ে প্রয়োজন পূরণের অনুমতি দিয়েছে। তবে অযথা ব্যয়, অপচয় ও লোকদেখানো ভোগ থেকে বিরত থাকা মুমিনের সংযম ও সচেতনতার পরিচয়।
৪. মাপে ও ওজনে কম না দেওয়া
বেচাকেনার ক্ষেত্রে মাপ ও ওজনের ব্যাপারে সততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য পরিমাণ কম দেওয়াকেও হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা মাপে কম দেয়, তাদের জন্য দুর্ভোগ। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ১-৩)
এক ইহুদির সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর লেনদেনমাপে কম দেওয়া স্রেফ ক্রেতার অধিকার নষ্ট করা নয়; বরং এটি আল্লাহর দেওয়া আমানতের খেয়ানত।
একজন মুমিন পণ্য দেওয়ার সময় নিজের প্রাপ্যের কথা যেমন মনে রাখবেন, তেমনি অন্যের প্রাপ্যও যথাযথভাবে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। ব্যবসায় সামান্য কম দেওয়া যদি অন্যের অধিকার নষ্ট করে, তবে সেই সামান্যতাও আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয় হতে পারে।
বেচাকেনার সময় দাম নিয়ে মতপার্থক্য হতে পারে। কিন্তু এ কারণে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা কোনোভাবেই মুমিনের জন্য শোভন নয়।
৫. প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকা
বেচাকেনায় সততা একজন মুমিনের অন্যতম বড় পরিচয়। কোনো পণ্যে ত্রুটি থাকলে তা ক্রেতার কাছ থেকে গোপন করা উচিত নয়। একইভাবে পণ্যের গুণমান, পরিমাণ কিংবা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়াও অনুচিত।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি তারা সত্য বলে এবং (পণ্যের) দোষ-ত্রুটি স্পষ্ট করে, তবে তাদের বেচাকেনায় বরকত দেওয়া হয়। আর যদি তারা মিথ্যা বলে এবং গোপন করে, তবে তাদের বেচাকেনার বরকত মুছে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৮২)
৬. সদাচরণ বজায় রাখা
বেচাকেনার সময় দাম নিয়ে মতপার্থক্য হতে পারে। ক্রেতা কম দাম চাইতে পারেন, বিক্রেতা তাঁর নির্ধারিত দাম বলতে পারেন। কিন্তু এ কারণে রূঢ় ভাষা, অপমান কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণ করা কোনোভাবেই মুমিনের জন্য শোভন নয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি রহম করুন, যে ক্রয়-বিক্রয় ও নিজের পাওনা দাবি করার সময় নম্রতা অবলম্বন করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৭৬)
অতএব, ক্রেতা কম দামে পণ্য চাইলে তাকে হেয় করা নয়; আবার বিক্রেতা দাম একটু বেশি বললে তাকে প্রতারক বলে গালি দেওয়াও নয়। বরং উভয়ের উচিত ভদ্রতা ও সৌজন্য বজায় রাখা।
রায়হান আল ইমরান: আলেম, লেখক ও গবেষক