হাফপ্যান্টকে ‘অশালীন’ বলে অ্যাথলেট প্রশিক্ষককে মেট্রোস্টেশনে হেনস্তা
· Prothom Alo

সকালে শরীরচর্চা শেষ করে টি–শার্ট ও হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে উঠতে যাওয়ায় এক অ্যাথলেট প্রশিক্ষককে মেট্রোস্টেশনে দাঁড় করিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে। ওই প্রশিক্ষকের পোশাককে ‘অশালীন’ বলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য তাঁকে টিকিট পাঞ্চ মেশিনের সামনে ৪০ মিনিট দাঁড় করিয়ে রাখেন। আজ রোববার সকালে রাজধানীর ফার্মগেট মেট্রোস্টেশনে এ ঘটনা ঘটেছে।
Visit rouesnews.click for more information.
ওই প্রশিক্ষকের নাম সাজ্জাদ হোসেন। প্রায় ১০ বছর ধরে ম্যারাথন ও আল্ট্রাম্যারাথনের প্রশিক্ষণ করান তিনি। নিজেও নিয়মিত দৌড়ান। ঢাকার বেশ কয়েকটি পার্কে ভোরবেলা এই প্রশিক্ষণ দেন।
ঘটনার পর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন সাজ্জাদ হোসেন।
৫৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওর শুরুতে হাসিমুখে একজন পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়। তাঁর নেমপ্লেটে লেখা ছিল জাকির। এ সময় তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘দাঁড়ান একটু চুলটা ঠিক করি।’
পরে সাজ্জাদ হোসেন তাঁর কাছে হাফপ্যান্ট পরে স্টেশনে ঢুকতে না পারার কারণ জানতে চাইলে ওই পুলিশ সদস্য বলেন, ‘আপনাকে বলা হয়েছে আপনি একটু শালীনতার সঙ্গে যান। এইটা একেবারে পুরোপুরি শালীনতার মধ্যে পড়ে না।’
সে সময় সাজ্জাদ হোসেন প্রশ্ন করেন, ‘কোনটা শালীনতা, কোনটা শালীনতা না, সেটি আপনার নিয়মে লেখা আছে?’ জবাবে জাকির নামে পুলিশ সদস্য বলেন, ‘এটা দেখা আমার দায়িত্ব।’
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে মেট্রোরেলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মেট্রোরেলে চলাচলের জন্য কোনো ড্রেস কোড (পোশাক বিধি) নেই। এই অপ্রয়োজনীয় হেনস্তা পুলিশ কেন করল, তা তিনি জানেন না। তবে এমআরটি পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তাকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠালেও জবাব দেননি তিনি।
‘অশ্লীল ড্রেস পরে মেট্রোতে ঢোকা যাবে না’
পরে ভুক্তভোগী সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি বলেন, সকালে রমনায় প্রশিক্ষণ করানোর পর ফার্মগেটে একটি কাজ ছিল। কাজ শেষে বিজয় সরণি যাওয়ার জন্য ফার্মগেট মেট্রোস্টেশনে যান। টিকিট কেটে স্টেশনে ঢোকার সময় সেখানে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য তাঁকে ডেকে নেন। ধমক দিয়ে ওই পুলিশ সদস্য বলেন, ‘এই আপনি, এই সব কি ড্রেস পরেন, এই সব অশ্লীল ড্রেস পরে মেট্রোতে ঢোকা যাবে না!’ তিনি পুলিশ সদস্যকে জানান, তিনি একজন রানিং কোচ এবং প্রশিক্ষণ শেষে মেট্রোরেলে করে পরবর্তী জায়গায় যাচ্ছেন। মেট্রোরেলে শর্টস পরে যাওয়া যাবে না—এমন কোনো নিয়ম থাকলে তা দেখাতেও বলেন তিনি।
সাজ্জাদ হোসেনের ভাষ্য, সেখানে থাকা আরও দুই পুলিশ সদস্য তাঁকে বলেন, এটি পাবলিক প্লেস, এখানে এভাবে যাওয়া যাবে না। তাঁদের মধ্যে একজন তাঁকে ট্রাউজার পরে আসতে বলেন। এমনকি শর্টস খুলে রেখে পরে ট্রাউজার পরে আসার কথাও তাঁকে বলা হয়। এভাবে তাঁকে প্রায় ৪০ মিনিট সেখানে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।
সাজ্জাদ হোসেন অভিযোগ করেন, মেট্রোরেলের কন্ট্রোল বোর্ডের একজন নারী কর্মকর্তাও তাঁর পোশাক নিয়ে প্রশ্ন করেন। ওই কর্মকর্তা তাঁর ছবি তুলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে যান বলেও জানান তিনি।
পরে মেট্রোরেলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে মেট্রোতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
ঘটনার পর ফার্মগেট মেট্রোস্টেশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান সাজ্জাদ হোসেন। তবে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও তাঁকে কোনো কাগজের কপি দেওয়া হয়নি। অভিযোগের ছবি তুলতে চাইলে সেটিও করতে দেওয়া হয়নি।
আক্ষেপ করে সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পোশাক নিয়ে মন্তব্য পাওয়া আর প্রশাসনের একটি জায়গায় পোশাকের কারণে গণপরিবহনে উঠতে বাধা দেওয়া এক বিষয় নয়। সকালে ব্যায়াম করতে যাওয়া একজন মানুষ রানিংয়ের (দৌড়ানোর) পোশাক পরবেন, এটাই স্বাভাবিক। মেট্রোরেলে শর্টস পরা নিষিদ্ধ হলে তার লিখিত নিয়ম দেখানো উচিত ছিল।
জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, এমআরটি পুলিশের এমন আচরণ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রকাশ। কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে মব তৈরি হলে বা কেউ অন্যায়ভাবে আক্রান্ত হলে পুলিশের দায়িত্ব তাঁকে উদ্ধার করা। কিন্তু সেই পুলিশই যদি নিপীড়কের ভূমিকায় চলে যায়, তাহলে বিষয়টি আরও ভয়ংকর।
অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত উগ্রতার সঙ্গে যখন পুলিশের পোশাক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহার যুক্ত হয়, তখন সেটি সামাজিক অবক্ষয়ের আরও ভয়ংকর রূপ নেয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।