বাকলিয়ায় সংঘর্ষের পেছনে মাদক দিয়ে দ্বন্দ্ব, যুবদলের নেতার পরিচয়ে আধিপত্য বিস্তার
· Prothom Alo

চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া এলাকার সৈয়দ শাহ সড়কে গত রোববার রাতে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলি বর্ষণের ঘটনার পেছনে রয়েছে ওই এলাকার দুই ব্যক্তির দ্বন্দ্ব। এ ঘটনায় জড়িত একাধিক ব্যক্তি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে।
Visit betsport.cv for more information.
পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেদিনের সংঘর্ষের ঘটনায় যে ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে মো. জসিম ওই এলাকায় একটি পক্ষের নেতৃত্ব দেন। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং তৈরি, জায়গা দখলসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আর মাদক ব্যবসা ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মো. মুরাদ ও তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরেই রোববার এলাকায় সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
সম্প্রতি মুরাদের কাছ থেকে ইয়াবা নেওয়া বন্ধ করে অন্য উৎস থেকে মাদক সংগ্রহ শুরু করেন জসিম। এলাকায় নিজের বলয়ও তৈরি করেন তিনি। গড়ে তোলেন কিশোর গ্যাং। এরপর মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, জায়গা দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে শুরু হয় দুজনের বিরোধ। সেই বিরোধের জেরে গত রোববার রাতে নগরের বাকলিয়ার সৈয়দ শাহ রোডে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ হয়। শোনা যায় কয়েকটি বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ। আতঙ্কে দোকানপাট বন্ধ করে ঘরে ঢুকে পড়েন স্থানীয় লোকজন।
পুলিশ জানায়, মো. মুরাদের হাত ধরেই মাদক ব্যবসা শুরু করেছিলেন জসিম। শুরুতে তাঁর কাছ থেকে ইয়াবা নিয়ে বিক্রি করতেন মো. জসিম। কিন্তু বছরখানেক আগে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। মুরাদের কাছ থেকে ইয়াবা নেওয়া বন্ধ করে অন্য উৎস থেকে মাদক সংগ্রহ শুরু করেন জসিম। এলাকায় নিজের বলয়ও তৈরি করেন তিনি। গড়ে তোলেন কিশোর গ্যাং। এরপর মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, জায়গা দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে শুরু হয় দুজনের বিরোধ। সেই বিরোধের জেরে গত রোববার রাতে নগরের বাকলিয়ার সৈয়দ শাহ রোডে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ হয়। শোনা যায় কয়েকটি বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ। আতঙ্কে দোকানপাট বন্ধ করে ঘরে ঢুকে পড়েন স্থানীয় লোকজন।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বাকলিয়ার এই এলাকায় দুই পক্ষের বিরোধ নতুন নয়। মাঝেমধ্যেই পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে রোববার রাতের ঘটনা ছিল বড় আকারের। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সংঘর্ষে দুই পক্ষের ১৫০ থেকে ২০০ লোক অংশ নেয়। তাঁদের বেশির ভাগই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য।
মুরাদ ফেসবুকে নিজেকে চান্দগাঁও থানা যুবদলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। যুবদলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ছবি ও ভিডিওও রয়েছে তাঁর প্রোফাইলে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাদক, অস্ত্র ও মালামাল লুটের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আটটি মামলা রয়েছে। দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গত বছরের জানুয়ারিতে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপরও তাঁর কর্মকাণ্ড থামেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুরাদ বাকলিয়া এলাকার পরিচিত মাদক ব্যবসায়ী। তাঁর বাড়ি কক্সবাজারের মহেশখালীতে। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম নগরে বসবাস করছেন। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে তিনি নিজের একটি বাহিনী গড়ে তোলেন। এলাকায় এটি ‘মুরাদ বাহিনী’ নামে পরিচিত। তাঁর সঙ্গে চলাফেরা করতেন জসিম। মুরাদের কাছ থেকে ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক নিয়ে বিক্রি করতেন তিনি। একপর্যায়ে মাদকের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। জসিম মুরাদের কাছ থেকে ইয়াবা নেওয়া বন্ধ করে অন্য একজনের কাছ থেকে মাদক সংগ্রহ করে বিক্রি শুরু করেন। পাশাপাশি নিজের লোকজন নিয়ে আলাদা বলয় গড়ে তোলেন। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, এতে এলাকায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য নিয়ে মুরাদ-জসিমের বিরোধ আরও তীব্র হয়। জসিমকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে ক্ষুব্ধ হন মুরাদ। এরপর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
বাকলিয়ার সৈয়দ শাহ সড়ক। এ এলাকায় প্রায় কিশোর গ্যাংয়ের দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয় বলে এলাকাবাসীর অভিযোগসৈয়দ শাহ রোডের বাসিন্দা ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নাছির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, একসময় মুরাদ ও জসিম একসঙ্গে মাদক কারবার করতেন। মাদকের টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে তাঁদের বিরোধ হয়। পরে জসিম আলাদা বলয় তৈরি করেন। রোববার রাতে দুই পক্ষকে লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে সংঘর্ষে জড়াতে দেখা গেছে। গুলির শব্দও শোনা গেছে। ভয়ে লোকজন রাস্তা থেকে সরে যান। সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়।
মুরাদ ফেসবুকে নিজেকে চান্দগাঁও থানা যুবদলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। যুবদলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ছবি ও ভিডিওও রয়েছে তাঁর প্রোফাইলে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাদক, অস্ত্র ও মালামাল লুটের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আটটি মামলা রয়েছে। দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গত বছরের জানুয়ারিতে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপরও তাঁর কর্মকাণ্ড থামেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। নিজেকে নগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হকের অনুসারী হিসেবেও পরিচয় দেন মুরাদ। তবে এমদাদুল হক বলেন, মুরাদ তাঁর অনুসারী নন। কারও অপরাধের দায় দল নেবে না। অপরাধী হলে তাঁর শাস্তি হওয়া উচিত।
জানতে চাইলে মো. মুরাদ প্রথম আলোকে বলেন, জসিমের লোকজন বাকলিয়ার ১৫ থেকে ২০টি স্পটে ইয়াবাসহ মাদক বিক্রি করছেন। এগুলো বন্ধের জন্য ছেলেদের পাঠানো হলে তার ওপর হামলা চালানো হয় অস্ত্র নিয়ে। তিনি বলেন, ‘জসিমের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না। তার কাছে কেন ইয়াবা বিক্রি করব। আমার বিরুদ্ধে হওয়া মাদক মামলাগুলো ষড়যন্ত্র করে দেওয়া হয়েছে।’ যুবদলের কোনো পদে না থাকলেও মিছিল, সমাবেশে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন মুরাদ।
জসিমের বিরুদ্ধে মাদকসহ ১২টি মামলা রয়েছে। নিজেকে বাকলিয়া থানা যুবদলের আহ্বায়ক ইসমাইল হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন তিনি। তবে ইসমাইল হোসেন বলেন, জসিম তাঁর অনুসারী নন। তাঁর সঙ্গে জসিমের কোনো সম্পর্ক নেই।
জসিমের বিরুদ্ধে মাদকসহ ১২টি মামলা রয়েছে। নিজেকে বাকলিয়া থানা যুবদলের আহ্বায়ক ইসমাইল হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন তিনি। তবে ইসমাইল হোসেন বলেন, জসিম তাঁর অনুসারী নন। তাঁর সঙ্গে জসিমের কোনো সম্পর্ক নেই।
নগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহেদ প্রথম আলোকে বলেন, কোনো অপরাধীর জায়গা যুবদলে নেই। এ বিষয়ে দলের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। কোনো অপরাধীকে দলের কেউ আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।
বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর আলম প্রথম আলোকে বলেন, মুরাদ ও জসিম দুজনের বিরুদ্ধেই মাদক মামলা রয়েছে। তাঁরা একসময় একসঙ্গে চলাফেরা করতেন। পরে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এলাকায় আধিপত্য, জায়গা দখল ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাঁদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। দুজনেরই কিশোর গ্যাং রয়েছে। পুলিশ জসিমসহ দুজনের ১৫ অনুসারীকে গ্রেপ্তার করেছে। মুরাদকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এলাকার লোকজনের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।