জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বায়ুদূষণ কমাতে হবে
· Prothom Alo

যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও প্রথম আলো।
বায়ুদূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় শিশুরা। দেশে প্রতিদিন ২৪২ জনের মৃত্যু হয় বায়ুদূষণের কারণে। বায়ুদূষণকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে নীতি ও কর্মকৌশল নির্ধারণ করা জরুরি। জনস্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হলে বায়ুদূষণ কমাতে হবে।
Visit sport-tr.bet for more information.
‘বায়ুদূষণ ও জনস্বাস্থ্য সংকট সমাধানে কী ধরনের কৌশল ও নীতিমালা প্রয়োজন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, গবেষক, পরিবেশকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তারা এ কথা বলেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে গতকাল মঙ্গলবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও প্রথম আলো যৌথভাবে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।
গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা বায়ুদূষণের কারণ, বায়ুদূষণের উৎস, দূষণ প্রতিরোধে কার কী ভূমিকা, দূষণের ক্ষতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পাশাপাশি রাষ্ট্র, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও ব্যক্তিমানুষের করণীয় বিষয়ে সুপারিশ করেন তাঁরা। একাধিক আলোচক নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। তাঁদের মতে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বায়ুদূষণ প্রতিরোধ সম্ভব নয়।
শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে
গোলটেবিল বৈঠকে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাহমিদ আহমেদ বলেন, বায়ুদূষণের ঝুঁকি বয়স্কদের চেয়ে শিশুদের বেশি। কারণ, শিশুরা প্রতি মিনিটে ২০ থেকে ৩০ বার শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়, বয়স্করা নেন ১২ থেকে ১৬ বার। অর্থাৎ শিশুরা বেশিবার দূষিত বায়ু নেয়। শিশুদের উচ্চতা কম হওয়ায় তারা নিচের বায়ু বেশি গ্রহণ করে, নিচের বায়ু বেশি দূষিত। অন্যদিকে দূষিত বায়ু শিশুদের অপরিপক্ব শরীরে বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বেশি ক্ষতি করে।
আইসিডিডিআরবির গবেষণা উদ্ধৃত করে তাহমিদ আহমেদ বলেন, কাঠের চুলায় রান্না করা নারীদের রক্তে কার্বন মনোক্সাইড বেশি পাওয়া গেছে। রক্তে কার্বন মনোক্সাইড বেশি থাকা মায়েরা বেশি অকালিক শিশু ও কম ওজনের শিশু জন্ম দেন। তিনি আরও বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, অটিজম, শিশুদের অতি ওজন, শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া এবং রক্ত ও চোখের বিশেষ ক্যানসারের সঙ্গে বায়ুদূষণের সম্পর্ক আছে। তিনি প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন।
সমন্বিত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে
গোলটেবিল বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন পাঁচটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বায়ুদূষণের উৎস ধরে ধরে মোকাবিলা বা সমাধানের পথ দেখতে হবে; বায়ুদূষণকে আন্তসীমান্ত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমাধানের দিকে যেতে হবে; জনস্বাস্থ্যের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে; বায়ুদূষণের অর্থনৈতিক ক্ষতির মূল্যায়ন জরুরি এবং এ দূষণকে সমন্বিত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বায়ুদূষণকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, দেশের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় বাধা বায়ুদূষণ। গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, দূষণের জন্য নির্মাণকাজ ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ৩০ শতাংশ, ইটভাটা ও শিল্পকারখানা ২৯ শতাংশ, যানবাহন ১৫ শতাংশ, আন্তদেশীয় দূষণ সাড়ে ৯ শতাংশ, গৃহস্থালি চুলার ধোঁয়া সাড়ে ৮ শতাংশ এবং বর্জ্য পোড়ানো ৮ শতাংশ দায়ী। এসব ক্ষেত্রে কার কী দায়িত্ব এবং কে কতটুকু তা পালন করছে, তারও বর্ণনা দেন আলমগীর কবির।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, বায়ুদূষণকে স্বাস্থ্যনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বায়ুদূষণ সমস্যাকে নিয়মিত গণমাধ্যমে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বায়ুদূষণ প্রতিরোধে ব্যক্তিরও দায়িত্ব আছে। সরকার একা বায়ুদূষণ প্রতিরোধ করতে পারবে না।
হৃদ্রোগ, স্ট্রোকের ঝুঁকি
এরপর একজন হৃদ্রোগবিশেষজ্ঞ ও একজন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ বক্তব্য দেন। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চিফ কনসালট্যান্ট (কার্ডিওলজি) অধ্যাপক ফজিলা-তুন-নেসা মালিক বলেন, ‘অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম ২.৫ শ্বাসের সঙ্গে শরীরের রক্তনালিতে যেতে পারে। ফলে রক্তনালি শক্ত হয়ে যায়। একপর্যায়ে তা হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোকের কারণ হয়।’
বায়ুদূষণের কারণে ফুসফুসের ক্যানসার বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন ল্যাবএইড হাসপাতালের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি গাছ লাগানো এবং মাস্ক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসচিব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কাঁঠালগাছ কেটে অ্যাকাশিয়াগাছ লাগানো হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৫ বছর পর বুঝতে পেরেছিল, অ্যাকাশিয়াগাছ ওই এলাকার শিশুদের বড় ক্ষতি করে ফেলেছে। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে বহু মেহগনিগাছ লাগানো হয়েছে। ঝরা পাতার গাছ। ঢাকা শহরে সবচেয়ে বেশি মেহগনিপাতা পোড়ানো হয়। তাঁর মতে, দায়িত্বশীল স্থানীয় সরকার ছাড়া দূষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজে সমন্বয় জরুরি
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার বলেন, যেকোনো উন্নয়নকাজ হাতে নেওয়ার আগে বায়ুদূষণের বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (রাজশাহী) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, সমস্যা সমাধানে গবেষণা জরুরি। জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, ইটের ভাটা বা বায়ুদূষণ বেশি এমন এলাকায় কাজ করা মানুষের পেশাগত স্বাস্থ্যসমস্যা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসাশিক্ষা) অধ্যাপক সাকি মো. জাকিউল আলম বলেন, বায়ুদূষণ প্রতিরোধে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের সমন্বয় করা জরুরি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ২০০৭ সালে আমিনবাজারে ৫০ একর জমির ওপর তৈরি ল্যান্ডফিলে কিছু সমস্যা আছে। নিচে পানির লাইন ও ভেতরে গ্যাসের লাইন নেই। ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষ বর্জ্য থেকে নানা জিনিস কুড়ায়। তাদের বিড়ি-সিগারেটের আগুন থেকে সেখানে আগুন লাগে। সেই আগুন ফায়ার সার্ভিস নেভাতে পারে না। দিনের পর দিন জ্বলতে থাকে। আগুন নেভাতে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করতে হয়।
বায়ুদূষণের অর্থনৈতিক ক্ষতির কিছুটা বিবরণ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, বায়ুদূষণের কারণে দেশে বছরে ২ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়, যা জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ। বায়ুদূষণের কারণে বছরে প্রায় ৮৮ হাজার বা দিনে ২৪২ জনের মৃত্যু হয়। বায়ুদূষণের কারণে দেশের মানুষের গড় আয়ু কমছে।
গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।