রোনালদো ও পর্তুগাল: কী আছে শেষে
· Prothom Alo

সেই ছবিটা হয়তো অনেকের মনে আছে।
Visit saltysenoritaaz.org for more information.
আল নাসরের এক উদ্যাপনের ছবি। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর গালে স্নেহের চুমু দিচ্ছেন জর্জ জেসুস। দুজনের মুখে হাসি। একজন পর্তুগালের সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকা, অন্যজন পর্তুগালের কোচ হওয়ার স্বপ্ন দেখা অভিজ্ঞ কোচ, যিনি তখন আল নাসরের দায়িত্বে। তখন তাঁদের দেখে মনে হয়েছিল, এই জুটি বুঝি আরও অনেক দূর যাবেন।
কী আশ্চর্য, রোনালদো-জেসুসের এখনকার সম্পর্কের কথা ভাবলে ওই ছবিটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেবে!
পর্তুগালের সমালোচনায় রোনালদোর ‘লাইক’আল নাসরেও রোনালদোর কোচ ছিলেন জর্জ জেসুস।২০২৫ সালে আল নাসরে জেসুসের সঙ্গে রোনালদোর যে সম্পর্ক শুরু হয়েছিল, সেটি ছিল সাফল্যের গল্প। দীর্ঘ সাত বছরের অপেক্ষা পেরিয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে সৌদি প্রো লিগের শিরোপা জিতেছিল আল নাসর। জেসুস প্রকাশ্যে রোনালদোর প্রশংসা করেছেন বারবার। বলেছিলেন, বিশ্বমানের এই খেলোয়াড়ের সঙ্গে কাজ করা তাঁর জন্য আনন্দের। রোনালদোও জানিয়েছিলেন, জেসুসের অধীনে খেলতে পেরে তিনি কী আনন্দিত!
তাহলে কোথায় বদলে গেল গল্পটা? পর্তুগালের ডাগআউটে জেসুস দাঁড়ানোর পরই যেন পুরোনো বন্ধুত্বের ওপর নতুন একটি শব্দ এসে বসেছে, ‘নিয়ম’।
সম্প্রতি ডেনমার্কে পর্তুগাল দলের ক্যাম্প ছেড়ে যান রোনালদোগত সপ্তাহে উয়েফা নেশনস লিগে ওয়েলসের বিপক্ষে ১-০ গোলে জয়ের ম্যাচে শুরু থেকেই খেলেছিলেন রোনালদো। এরপর নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচ। জেসুসের দাবি, রোনালদোকে প্রথম একাদশে না রাখার ব্যাপারে আগেই সমঝোতা হয়েছিল। তবে জেসুস নাকি রোনালদোকে জানিয়েছিলেন, দ্বিতীয়ার্ধে ৩০ মিনিট খেলাবেন তাঁকে।
তারপর ম্যাচে রোনালদো আর মাঠে নামলেন না। জেসুস পরে বলেন, ‘ম্যাচের গতিবিধি অনেক কিছু নির্ধারণ করে দেয়। তাকে নামানোর জন্য তখন সময়টা উপযুক্ত মনে হয়নি।’
রোনালদোকে নিয়ে প্রশ্নে জেসুস আবার বললেন, ‘নিয়ম সবার জন্য সমান’কথাটা হয়তো একজন কোচের কাছে নিছক ম্যাচ পরিস্থিতির ব্যাখ্যা। কিন্তু রোনালদোর কাছে সেটি ছিল অন্য কিছু। সতীর্থরা যখন জয় উদ্যাপন করছিলেন, তিনি তখন বেঞ্চ থেকে সোজা চলে গেলেন ড্রেসিংরুমে। একটা দরজা বন্ধ হলো। চিরতরেই কি?
পরিস্থিতি সামাল দিতে বৈঠক হলো। রোনালদো, জেসুস এবং পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পাওলো প্রোয়েনসা সেখানে ছিলেন। সবাই হয়তো চেয়েছিলেন, ঘটনাটা সেখানেই শেষ হোক। কিন্তু জেসুস জেসুসই।
নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে তাঁর কণ্ঠে ফিরে এল সেই পুরোনো দৃঢ়তা, ‘নিয়ম সবার জন্য একই। কোনো খেলোয়াড় কখনোই আমার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারবে না।’
আসলেই কি রোনালদো জাতীয় দলে শেষ ম্যাচটা খেলে ফেলেছেন? নাকি এ শুধু সাময়িক ঝড়?এই একটি বাক্যেই যেন শুরু হলো দুই পৃথিবীর সংঘর্ষ। এক পাশে পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করা সর্বকালের অন্যতম সেরা এক খেলোয়াড়। অন্য পাশে ৭২ বছর বয়সেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল এক কোচ। ডেনমার্ক ম্যাচের আগে রোনালদো পর্তুগালের অনুশীলন ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেলেন।
পর্তুগাল তাঁকে ছাড়াই ডেনমার্ককে হারাল ৪-২ গোলে। জেসুসের অধীনে টানা তৃতীয় জয়। অথচ ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে প্রথম দুটি প্রশ্নই রোনালদোকে নিয়ে। জেসুস আবারও বললেন, ‘নিয়ম সবার জন্য সমান। আমি সব সময় এভাবেই ভেবেছি এবং ভবিষ্যতেও এভাবেই ভাবব।’
রোনালদো–রহস্য: বিদায়ের সুর, না আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায়একটু বিস্ময়কর লাগে বৈকি! যে কোচের পর্তুগাল দলের দায়িত্ব নেওয়ার পেছনে রোনালদোর ইতিবাচক ভূমিকা ছিল, সেই কোচের সঙ্গেই এখন রোনালদোর এমন দূরত্ব। জেসুস যখন পর্তুগালের দায়িত্ব নেন, তখন রোনালদোকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান অংশ করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই আশ্বাসেই নাকি জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্তও আপাতত স্থগিত করেছিলেন রোনালদো। এমনকি জেসুসকে পর্তুগালের কোচ করার ব্যাপারে ফেডারেশনের কাছে ইতিবাচক মতও দিয়েছিলেন। কেউ কি তখন ভেবেছিলেন, কয়েক মাসের মধ্যেই সেই জেসুসের সঙ্গে তাঁর এমন সংঘাত হবে?
পর্তুগালের হয়ে শেষটা ভালো হচ্ছে না রোনালদোরজেসুসের চরিত্রের একটা দিক অবশ্য কখনোই গোপন ছিল না। জুলাইয়ে পর্তুগালের দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই বলেছিলেন, ‘আমি কাউকে ভয় পাই না।’ তখন কথাটা হয়তো আত্মবিশ্বাসের মতো শোনাচ্ছিল। এখন মনে হচ্ছে, সেটিই ছিল ভবিষ্যতের জন্য একটা বার্তা। জেসুসের কোচিং–দর্শন খুব পরিষ্কার। তাঁর কাছে দলের নিয়ম সবার জন্য এক। খেলোয়াড় যত বড়ই হোন, তাতে কিছু আসে–যায় না। বেনফিকার এক সাবেক সহকর্মীর ভাষায়, জেসুস এমন একজন মানুষ, যিনি ভাবেন, পৃথিবী তাঁর চারপাশেই ঘোরে। এই ব্যক্তিত্বের সঙ্গে রোনালদোর ব্যক্তিত্বের সংঘর্ষ হয়তো তাই সময়ের অপেক্ষা ছিল।
কারণ, রোনালদোও তো সাধারণ কোনো ফুটবলার নন। পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসকে রোনালদোর আগে ও পরে ভাগ করা যায়। তাঁর আগে পর্তুগাল তিনটি বিশ্বকাপ ও তিনটি ইউরোতে খেলেছিল, কিন্তু বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতেনি। রোনালদোর যুগে ছয়টি বিশ্বকাপ, ছয়টি ইউরো এবং তিনটি বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। এই সময়ে রোনালদোর ২৩৪ ম্যাচ, ১৪৬ গোল। দুটিই বিশ্ব রেকর্ড। ইউরোতে ১৪ গোল, বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ৪১, বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে ১১। এমন একজন মানুষকে শুধু একজন খেলোয়াড় হিসেবে দেখা যায়?
আবার কোচের দিক থেকেও প্রশ্ন আছে। একটি দলের নিয়ম যদি একজনের জন্য আলাদা হয়, তাহলে সেই নিয়ম আর নিয়ম থাকে না, হয়ে যায় ব্যতিক্রম। আর জেসুস ব্যতিক্রম পছন্দ করেন না। সমস্যাটা সম্ভবত এখানেই। রোনালদো মনে করেছেন, তাঁকে যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হয়নি। জেসুস মনে করছেন, তিনি শুধু নিজের কোচিং–নীতিতে অটল থেকেছেন।
পর্তুগাল কোচ জর্জ জেসুসমাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে পর্তুগাল। যে দলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এর ঢেউ লেগেছে। রোনালদো ক্যাম্প ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর এক দিনের মধ্যে জাতীয় দলের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে পাঁচ লাখের বেশি অনুসারী কমে গেছে। একজন সমর্থকের মন্তব্য যেন পুরো পরিস্থিতির একটা নির্মম সারাংশ, ‘আমরা পর্তুগালকে অনুসরণ করিনি, আমরা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে অনুসরণ করেছি।’ একজন ফুটবলার কীভাবে একটি জাতীয় দলের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারেন, সেটির হয়তো এটাই সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ।
এই রোনালদোকে কি আসলেই পর্তুগালের প্রয়োজনরোনালদোর বোনও ক্ষোভ জানিয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় দলের জন্য এত বছর দেওয়া মানুষটিকে কীভাবে এমন করে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হয়। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো বড় নামের সামনেই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা তুলে ধরে।
এরপরও সমঝোতা সম্ভব, কিন্তু তাতে কাউকে নড়তে হবে। এই গল্পের সবচেয়ে বিষণ্ন জায়গাটা হলো, দুজনের কেউই হয়তো নিজেদের জায়গা থেকে খুব বেশি সরে যেতে চান না। জেসুস নড়বেন না, ৭২ বছর বয়সেও তিনি একগুঁয়ে। নিজের দর্শনে অটল। রোনালদো? তিনি কি নড়বেন? যে মানুষটা পুরো ক্যারিয়ারে মাথা নত করেননি, তিনি কি এবার করবেন?
এরই মধ্যে পর্তুগাল আবার মাঠে নামছে আজ। পোর্তোর এস্তাদিও দো দ্রাগাওয়ে প্রতিপক্ষ নরওয়ে। আরও একবার রোনালদোকে ছাড়া। কিন্তু পর্তুগাল জিতুক, হারুক বা ড্র করুক, এই ম্যাচের পরও সবচেয়ে বেশি তাঁর কথাই হবে।
কারণ, কিছু মানুষ মাঠে থাকলেও অনুপস্থিত থাকেন। আবার কেউ মাঠে না থেকেও পুরো ম্যাচকে গ্রাস করে রাখেন। রোনালদো এখন সেই দ্বিতীয় দলের মানুষ।
শেষ বিকেলের সূর্যের মতো। ডুবছেন, তবু চোখ সরানো যায় না।