যদি ঐক্যবদ্ধ হতাম যে বেতার–টেলিভিশন বন্ধ করো.. তাহলে সবই হতো
· Prothom Alo
ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোয় এবারের অতিথি সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলম। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাসাহিত্যক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে গানের সঙ্গে নিজের জীবনকে জড়িয়ে নেওয়ার গল্প, জন্ম, বেড়ে ওঠাসহ নানা অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন তিনি।
Visit esporist.org for more information.
ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোতে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজ আমাদের অতিথি বাংলাদেশের কিংবদন্তি আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানের শিল্পী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। তাঁকে পেয়েছি। আমরা অনেক গান শুনব, অনেক কথা বলব। আপনারা আমাদের সঙ্গে থাকুন। খুরশীদ ভাই, ১ আগস্টে কি আপনার ৮০ বছর পূর্ণ হয়ে ৮১-তে পদার্পণ ঘটল?
খুরশীদ আলম: হ্যাঁ, আল্লাহর রহমতে ৮১-তে পড়লাম।
১৯৪৬ সালের কত তারিখে জন্ম?
খুরশীদ আলম: ১ আগস্ট।
১ আগস্ট। আপনার জন্ম হয়েছিল জয়পুরহাটে।
খুরশীদ আলম: জয়পুরহাট জেলা, আগে ছিল বগুড়া ডিস্ট্রিক্টে—এটা জয়পুরহাটের সাবডিভিশন ছিল।
রাইট।
খুরশীদ আলম: এরশাদ সাহেবের আমলে এটা জেলা হয়।
জেলা হলো। আগে ১৯টা জেলা ছিল, পরে...
খুরশীদ আলম: হ্যাঁ। আমার জন্ম জয়পুরহাট জেলায়। গ্রামের নাম হারুঞ্জা।
আপনার আব্বার নাম কী?
খুরশীদ আলম: আমার আব্বার নাম এ এফ তসলিম উদ্দিন আহমেদ।
তিনি কী করতেন?
খুরশীদ আলম: তিনি ঢাকায় যে নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, সেখানে বাংলার শিক্ষক ছিলেন।
আপনার দাদাও তো এখানকার ঢাকার...
খুরশীদ আলম: দাদা ছিলেন ইন্সপেক্টর অব স্কুলস। ওনার নাম ছিল জসীমউদ্দীন আহমেদ।
ইন্সপেক্টর অব স্কুলস।
খুরশীদ আলম: ইন্সপেক্টর অব স্কুলস এবং প্রতিষ্ঠাতা হেডমাস্টার ঢাকার আজিমপুরের ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুল। আমার বাবারা চার ভাই। আমার বাবা বড়।
হুম, আপনারা তো একদম আলোকিত শিক্ষিত পরিবার।
খুরশীদ আলম: আল্লাহর কাছে কোটি কোটি শুকরিয়া যে আমার বাবা, চাচা সবাই শিক্ষিত।
তারপর জয়পুরহাট থেকে পরই একদম অতি শৈশবে ওই অবস্থাতেই মোটামুটি ঢাকায় চলে এলেন?
খুরশীদ আলম: ঢাকায় এলাম আমরা নাজিরা বাজার। হাজী সাহেবের বিরিয়ানির দোকানের পেছনে বাসা। কাজী আলাউদ্দিন রোড।
এখানে এলাম। আমরা একান্নবর্তী পরিবার ছিলাম। আমার মেজ চাচা ছিলেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ইংলিশের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট। পরে বগুড়া মহিলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হয়ে রিটায়ার্ডমেন্টে গেছেন। তার পরের চাচা ডাক্তার আবু হায়দার সাজিদুর রহমান। তিনি মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস করে লাহোর থেকে বিডিএস করে এলেন। সেখান থেকে এসে তিনি ডেন্টাল কলেজের প্রিন্সিপাল হলেন। পরে পিজিতে ডেন্টালের হেড হন এবং তিনি একাধারে বই লিখতেন—ডিটেকটিভ বই লিখতেন।
কুয়াশা সিরিজ?
খুরশীদ আলম: কুয়াশা নামে লিখতেন। আর কুয়াশা সিরিজ হলো কাজী আনোয়ার হোসেনের।
আচ্ছা।
খুরশীদ আলম: তাঁর নাম হলো ডক্টর আবু হায়দার সাজিদুর রহমান, কিন্তু তিনি কুয়াশা নামে বই লিখতেন।
আচ্ছা, তাঁর লেখকনাম ছিল কুয়াশা।
খুরশীদ আলম: আর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর নাম ছিল ডাক্তার মাস্তানা।
তিনি তো গান গাইতেন। আপনি তাঁর কাছ থেকে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া শিখলেন।
খুরশীদ আলম: হ্যাঁ।
যখন তিনি নিজে গান গাইতেন, তখন তাঁর নাম কী থাকত, মাস্তানা?
খুরশীদ আলম: না, ডাক্তার আবু হায়দার—আবু হায়দার সাজিদুর রহমান। তারপর ছোটজনের নাম এ এস ফজলুর রহমান। তিনি এমবিবিএস করে চাইল্ড স্পেশালিস্ট হন। তিনি লন্ডনে মারা গেছেন।
আপনি ঢাকায় এসে কোন স্কুলে পড়লেন? প্রথমে প্রাইমারি স্কুল কোনটা ছিল?
খুরশীদ আলম: একদম স্ট্রেট নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে।
আপনার আব্বার স্কুলেই?
খুরশীদ আলম: জি।
সেই স্কুলে...
খুরশীদ আলম: এর আগে বলি যে আমি এক বছরের জন্য আমার দাদার স্কুলে পড়েছিলাম, ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলে। এক বছরের জন্য। তো ওখানে যেটা হয়, দাদা খুব স্ট্রিক্ট। এটা আমার পছন্দ ছিল না, একটুতেই হাতে মারেন।
আহারে!
খুরশীদ আলম: … ওই লজ্জাই হোক আর যা–ই হোক ক্ষোভ, দুঃখ, ব্যথায় আমার দাদিকে বললাম যে আমি এখানে পড়ব না। তখন আমার দাদি আবার আমার বাবাকে বললেন যে ঠিক আছে, ওই স্কুলে নিয়ে যাও।
… ওই স্কুল থেকে, একটু আগে আমরা কথা বলছিলাম যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, কেরামত মওলা...
খুরশীদ আলম: আমি বলি যে যতগুলো, মানে ভালো ভালো সবাই এখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করেছেন। ডক্টর আনিসুজ্জামান স্যার এখানে যখন প্রিয়নাথ হাইস্কুল ছিলেন বোধ হয়—পার্টিশনের আগে প্রিয়নাথ হাইস্কুল ছিল...।
প্রিয়নাথ হাইস্কুল।
খুরশীদ আলম: প্রিয়নাথ হাইস্কুল ছিল—স্যার ওইখান থেকে পাস করেছেন। আবার পরে এখানে সরকার কবির… খবর পড়তেন।
হুম, সরকার কবিরুদ্দীন।
খুরশীদ আলম: তারপর কেরামত মওলা সাহেব—টেলিভিশনে সেট ডিজাইনার ছিলেন।
আমাদের সম্পাদক মতিউর রহমান সাহেবেরও স্কুল।
খুরশীদ আলম: মতিউর রহমানও এই স্কুল (নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়) থেকেই ম্যাট্রিক।
তিনি কি আপনার সহপাঠী ছিলেন?
খুরশীদ আলম: সমসাময়িক ছিলেন।
তিনি কেমন ছাত্র ছিলেন?
খুরশীদ আলম: ভালো।
আর আপনি?
খুরশীদ আলম: খুবই খারাপ। পড়ালেখায় খুব বেশি ইয়ে ছিলাম না।
আপনার চাচারা সব ডাক্তার, এমবিবিএস—আরও বড়। আপনার আব্বা শিক্ষক, আপনার দাদা শিক্ষক আর আপনি পরীক্ষায় ফাঁকি দিতেন, ক্লাসে? খালি গান করতেন, না?
খুরশীদ আলম: খালি গান। তো আমার ইয়ে ছিল, রবীন্দ্রসংগীত শিখতাম। আমার চাচার একটা গ্রুপ ছিল মেডিক্যাল কলেজ বেজড আরকি! এখানে ছিলেন ডাক্তার ব্রিগেডিয়ার শাহজাহান হাফিজ। তিনি রবীন্দ্রসংগীতের একজন সাংঘাতিক...
ব্রিগেডিয়ার শাহজাহান...
খুরশীদ আলম: শাহজাহান হাফিজ।…আমি বলব যে তিনি একজন রবীন্দ্রসংগীতের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং অত্যন্ত ম্যাচিউরড শিল্পী ছিলেন। তারপরে ডাক্তার বদরুল আলমও ছিলেন, চাইল্ড স্পেশালিস্ট। তিনি পল্লিগীতি গাইতেন। আবুল হাশেম বলে একজন ছিলেন, তিনি সৌদি আরবে যে রাজা আছেন, তাঁর হাউস ফিজিশিয়ান ছিলেন। তাঁরা মেডিক্যাল কলেজে তখন ১৯৫৪-এর দিকে আরকি! ঢাকা শিল্পী সংঘ নামে একটা গোষ্ঠী করেছিলেন। কালচারাল একটা সংগঠন ছিল। যেটা এখন আনন্দময়ী গার্লস হাইস্কুল, এটা ছিল রায় হাউস। এইখানে তাঁরা সপ্তাহে দুই দিন রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, পল্লিগীতি ও নাচের চর্চা করতেন এবং আমার চাচা নৃত্যনাট্য পরিচালনা করতেন। তো ওইখানে আমি চাচার কাছে শিখতাম। তখন প্রতিটি স্কুলে ড্রইংয়ের শিক্ষক ছিলেন, গানের জন্য শিক্ষক ছিলেন। ধর্মগ্রন্থের জন্য শিক্ষক ছিলেন। ড্রিল করার জন্য, পিটি করানোর জন্য শিক্ষক ছিলেন। আমাদের যিনি গানের শিক্ষক ছিলেন, তাঁর নাম শেখ আবুল ফজল সাহেব। তিনি রবীন্দ্রসংগীত শেখাতেন। পরে ওইখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর আমি কলেজ অব মিউজিক… ওস্তাদ বারীণ মজুমদার সাহেব, ওই কলেজে আমরা প্রথম ব্যাচে নাইটে পড়ি আরকি! ১০-১৫ জন ছেলে–মেয়ে নিয়ে কলেজ করেছিলেন বারীণদা এবং আমার মনে হয় না যে এত কষ্ট করে কেউ কলেজ করতে পারে। মানে, নিজের স্থাবর-সম্পত্তি যা ছিল, সব বিক্রি করে তিনি কলেজের পেছনে ব্যয় করেছেন। সেগুনবাগিচায় মোনারা কিন্ডারগার্টেন নামে একটা স্কুল ছিল, সেখানে তিনি করছিলেন। পরে সেগুনবাগিচায় তিনি কামরুন্নেসা গার্লস স্কুল—যেটা শিল্পকলার পেছনে বিল্ডিংগুলো হয়েছে, এটা কামরুন্নেসা গার্লস স্কুলের হোস্টেল ছিল—এটা তিনি গভর্নমেন্টের কাছ থেকে এটা কলেজ অব মিউজিকের জন্য নিয়েছিলেন। পরে এটা আবার এখন আগারগাঁওয়ে গেছে। এটা বারীণ মজুমদারের করা কলেজ। এখান থেকে আমরা পাস করি। তারপর আমি জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হই। সেখান থেকে ডিগ্রি করি। আবার এমএ পড়তে গেলাম নাইটে… ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। তো ওইখানে খালি গান শুনতে চাইত, তাই আর পড়ালেখা হয়নি।
মঞ্চে গাইছেন রুনা লায়লা ও খুরশীদ আলমতারপর আপনি...
খুরশীদ আলম: ওই রায় হাউসে গান শিখতাম আর তখন বেতার, বাংলাদেশ বেতার ছিল—এখন যেটা বোরহানুদ্দীন কলেজ—এখানে হতো যে স্কুল ব্রডকাস্টিংয়ের একটা অনুষ্ঠান। সেখানে যাঁরা মফস্সলের ছাত্র–ছাত্রী আসতেন—ঢাকায় যেসব আরও মেয়েদের স্কুল, ছেলেদের স্কুল থেকে ভালো বক্তা, কবিতা আবৃত্তি, অভিনয়—এসব নিয়ে অনুষ্ঠান হতো। ৪৫ মিনিটসের একটা স্লট ছিল। মাসে চারটা প্রোগ্রাম দিত। এখানে আমি রবীন্দ্রসংগীত… ১৯৬২ এবং ৬৩-তে আমি পরপর দুবার তৎকালীন যে এডুকেশন উইক হতো, সেখানে আমি ফার্স্ট হয়েছিলাম।
রবীন্দ্রসংগীতে?
খুরশীদ আলম: রবীন্দ্রসংগীত ও আধুনিক—দুটিতেই।
এখন আর রবীন্দ্রসংগীত গান না?
খুরশীদ আলম: … লোকে আমাকে আধুনিক গানে যেটুকু গ্রহণ করেছে, রবীন্দ্রসংগীত গ্রহণ যদি না করে, তাহলে আমার যে আধুনিকের যেটা ছিল, সেটাও যাবে, এটাও যাবে। এ জন্য আর চেষ্টা করিনি।
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আপনার স্কুলে বা শহরে আপনার গানের জন্য আপনার নাম হয়েছিল? প্রতিযোগিতায় তো ফার্স্ট হলেনই।
খুরশীদ আলম: হ্যাঁ। আমার তখন, সত্যি কথা বলতে লজ্জার ব্যাপার, আমি বাংলাদেশের কোনো শিল্পীর গান জানতাম না। সব ভারতীয় শিল্পীদের গান জানতাম এবং প্রচুর গান শুনতাম। রেডিও সিলন বলে একটা রেডিও স্টেশন ছিল, বিনা কা গীতমালা হতো। এইটা রেগুলার শুনতাম। আর আকাশবাণী কলকাতা থেকে অনুরোধের আসর যেটা ছিল, এটা আমার মনে হয় বাংলাদেশের যাঁরা সংগীতশিল্পী, প্রত্যেকেই শুনেছেন, প্রত্যেকেই শোনেন, এখনো শোনেন, ভবিষ্যতেও শুনবেন।
আপনার প্রথম গান রেকর্ড হলো কি রেডিওতে? নাকি সরাসরি প্রচারিত হলো?
খুরশীদ আলম: ১৯৬৬-তে অডিশন দিলাম। বেতারে, তখন সেই অডিশন বোর্ডে ছিলেন আবদুল আহাদ ভাই। রবীন্দ্রসংগীতের একজন অত্যন্ত বিজ্ঞ ব্যক্তি। আর বাংলাদেশের প্রথম সারির একজন সংগীতশিল্পী নজরুলসংগীত, আধুনিক, উচ্চাঙ্গ সংগীত, পল্লিগীতি সবই জানেন, ফেরদৌসী রহমান। আর ছিলেন সমর দাস। তো সমর দাস গান শুনে বললেন যে ‘গলা ভালো, কিন্তু একজনকে কপি করে।’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ, করি।’ আমাকে বললেন, ‘আমাকে চিনছ নাকি?’ আমি বলি, ‘না, চিনিনি।’ তো তিনি আবার বললেন যে ‘আমি ছয় তার নিয়ে ব্যবসা করি।’ তখন আমি বলি, ‘চিনছি।’ তো বলেন, ‘একটু আগে বললি চিনিস না, এখন আবার...’ আমি বলি, ‘না, আমার একটা বন্ধু আপনার কাছে গিটার শেখে। তো গিটারে ছয়টা তার থাকে।’ তো তিনি বললেন, ‘আমি লক্ষ্মীবাজারে থাকি।’ সমর দাস তখন লক্ষ্মীবাজারে থাকতেন। আমাকে বললেন, ‘তুই কোথায়?’ আমি বলি, ‘নাজিরা বাজার, কাজী আলাউদ্দিন রোডে থাকি।’ তো, ‘তুই সাতটায় যদি আসিস, এক ঘণ্টা আমি...’। তিনি পিয়ানো ধরে, মানে সা–রে–গা–মা–পা–ধা–নি, মানে নোট ধরে থাকতেন, ওটা কর্ড করতেন। তিনি ছয় মাস এটা করার পর তারপর বললেন যে ‘এইবার তোকে ছেড়ে দিলাম, ১০ জনের সঙ্গে গাবি, তোর গলা আলাদা হবে।’ এই করে এলাম। তারপর...
রেডিওতে অডিশনে তো আপনাকে নিল, নাকি?
খুরশীদ আলম: নিল। পাস করলাম।
তৃতীয় শ্রেণির... তৃতীয়...
খুরশীদ আলম: ‘খ’ ‘গ’-তে।
‘গ’-তে।
খুরশীদ আলম: ‘গ’ শাখায়। তো আজাদ রহমান সাহেব তখন ছায়ানটে ৬৪-এ। উনি ওপার বাংলা থেকে আসছেন। তো ছায়ানটের উচ্চাঙ্গসংগীতের একজন ওস্তাদ ছিলেন। ছায়ানট তখন ছিল আজিমপুরে। যে অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয় ছিল, সেখানে ছিল। তো আজিমপুর আমার চাচা থাকতেন। উনি যেহেতু মেডিকেল কলেজে, ডেন্টাল কলেজে চাকরি করতেন। আজাদ রহমান সাহেবের যেহেতু তখনকার দিনে গান গাওয়া, অভিনয় করাটা খুব টাফ ছিল। তো আজাদ রহমান সাহেব ব্যাচেলর লোক ছিলেন। একে ব্যাচেলর লোক, দুইয়ে গানের লোক। তো বাসা ভাড়া যখন নিতে যেতেন, তখন ওই একটু অসুবিধা করত। তো আমার চাচা আবার একটু পরিচিত ছিল। ওই সুবাদে ওনার সঙ্গে যোগাযোগ হয় এবং আজাদ রহমান সাহেবকে তিনি বলছিলেন, ‘আমার ভাতিজা গান শেখে, একটু দেখবেন আপনি।’ তো ওনার বাসায় আমার যাওয়া-আসা ছিল। উনি সব সময় গানে সুর করতেন, শুনতাম। ওনার বাসায় ভালো ভালো সুরকার আসতেন, গীতিকার আসতেন, শিল্পী আসতেন। তো একদিন হঠাৎ উনি আমাকে বলছেন, ‘তুমি এই দুইটা গান শেখো।’ হঠাৎ একদিন বলল, ‘বেতারে আসো রেকর্ডিং করব।’ তখন সিস্টেম ছিল যে আমি যেহেতু...
খুরশীদ আলমের জন্ম জয়পুরহাটে। তবে বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা পুরান ঢাকায়‘গ’ শ্রেণির।
খুরশীদ আলম: ‘গ’ শ্রেণির। আমার ও ‘ক’-তে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের…। তো উনি আমাকে এক দিনে দুটি গান গাওয়ালেন। একটা হলো ‘নদীর ওপারে’। কবি সিরাজুল ইসলাম বলে একজন লোক। তিনি অত্যন্ত ভালো বহু শিল্পীর জন্য গান লিখেছেন। তো আমার জন্য লিখলেন, ‘তোমার দুহাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম, থাকব তোমারই আমি কথা দিলাম।’ এই গানের পরে আরেকটা গান ছিলেন। এটার গীতিকার বাংলাদেশের অত্যন্ত গুণী এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন শিল্পী আমাদের—আনজুমান আরা আপার বড় বোন। ওনার নাম হলো জেবুন্নেসা জামাল। ওনার লেখা, আজাদ রহমান সাহেবের সুর করা এবং জেবুন্নেসা জামাল আপার একটা কথা বলি। ওনার বড় মেয়ে একজন নামকরা গায়িকা জিনাত রেহানা। তো প্রথমটা হলো কবি সিরাজুল ইসলামের লেখা। ওটা হলো:
‘তোমার দুহাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম
থাকব তোমারই আমি কথা দিলাম
তোমার দুহাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম।’
আর সেকেন্ড গানটা হলো জেবুন্নেসা জামাল আপার লেখা, আজাদ রহমান সাহেবের সুর করা:
‘চঞ্চল দুনয়নে বলো না কী খুঁজছ
চম্পা না করবী না পলাশের গুচ্ছ’
এই দুটি গান বের হওয়ার পরে এখানে তখন এইচএমভির কোনো প্ল্যান ছিল না। ডিস্ক প্ল্যান ছিল না, এটা পাকিস্তানে ছিল। এখানে দুজন লিয়াজোঁ অফিসার ছিলেন। একজন হলেন রবীন্দ্রসংগীতের অত্যন্ত গুণী এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন সুরকার—কলিম শরাফী ভাই। উনি ছিলেন এইচএমভির রিপ্রেজেন্টেটিভ। আর রোজিলিওতি বলে একজন ভদ্রমহিলা। তো এনারা এখানে তখন হাদী ভাই, মোহাম্মদ আবদুল জব্বার ভাই, মাহমুদুন্নবী ভাই, বশীর ভাই, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, খন্দকার ফারুক আহমেদ, শওকত হায়াত খান, রফিকুল আলম, আনোয়ার উদ্দীন খান, নাজমুল হুদা বাচ্চু ভাই, পরে উনি (বাচ্চু) অবশ্য নাটকে চলে গিয়েছিলেন। এম এ হামিদ, এরা গান করতেন। তো যে গানগুলো হিট করত, আব্দুর রউফ বলে একজন পল্লিগীতি গাইতেন, সোহরাব ভাই, সুধীন দাস—এঁদের যে কেউ হয়তো রবীন্দ্রসংগীত, কেউ হয়তো নজরুলসংগীত, কেউ আধুনিক। এই যেগুলো হিট করত, সেই গানগুলো ওনারা পাকিস্তানে পাঠাতেন। পাঠানোর পর ওখানে ডিস্ক হয়ে এটা এখানে আবার এইচএমভি সেল করতে আসত। তো ‘তোমার দুহাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম’ অল ওভার পাকিস্তান সেভেন্থ স্ট্যান্ড করেছিল।
গাড়ি কিনে মাকে দেখাতে গিয়ে দেখি তিনি সাদা চাদরে ঢাকাওই গান তো ভয়ংকর জনপ্রিয় গান।
খুরশীদ আলম: হ্যাঁ, অনেক সাংঘাতিক জনপ্রিয় গান।
আমার জন্ম ১৯৬৫-তে, ধরেন ১৯৭৫ সালে আমার বয়স ১০ বছর। এই গান তো আমি শুনে শুনে বড় হয়েছি। এটা কি সিনেমার গান না?
খুরশীদ আলম: না, সিনেমার না।
এই রেডিওতেই পপুলার হয়েছে?
খুরশীদ আলম: হ্যাঁ, রেডিওতে।
দুটি গানই তো সাংঘাতিক জনপ্রিয় হয়েছে। আর প্রথম ফিল্মে গাইলেন কবে?
খুরশীদ আলম: ফিল্মে গাইলাম ১৯৬৯-এ। ’৬৯-এ ছবির নাম ‘আগন্তুক’। আর সুরকার যথারীতি আজাদ রহমান সাহেব। আর পরিচালক ছিলেন বাবুল চৌধুরী। আর নায়করাজ রাজ্জাকের লিপে আমার জীবনের প্রথম গান। আর প্রযোজক ছিলেন ইফতেখারুল আলম সাহেব। তো ওই গানের আগেই এই ছবিতে আমরা একটা গান করেছি। মেইন সিঙ্গার ছিলেন যে এটা খুব অবাক লাগে, সোহরাব ভাই মেইন ভয়েস। সোহরাব ভাই যে আধুনিক গান গাইতে পারেন, এটা তখন কেউ জানত না। কিন্তু আজাদ রহমান সাহেব ওনার জ্ঞানগরিমা দিয়ে ওনাকে নিলেন। …মিয়া মোহাম্মদ বদরুদ্দোজাহ বলে একজন চিটাগাংয়ের ভদ্রলোক টিসিবিতে চাকরি করতেন আর আব্দুর রউফ এই গাজীপুর বাড়ি। উনি পল্লিগীতি গাইতেন সাংঘাতিক। আব্দুল আলীম ভাইয়ের পরেই ওনার নাম ছিল। তো আধুনিক একটা গান গেয়েছিল, ‘কখন ছুটি হবে বাজবে ছুটির ঘণ্টা।’ সাংঘাতিক পপুলার ছিল। তো এই তিনজনে আমরা সোহরাব ভাইয়ের সঙ্গে কোরাস গান গাইলাম। এটা আজিজুর রহমান সাহেবের লেখা, কবি আজিজুর রহমান সাহেবের লেখা। ‘আগন্তুক’ ছবির গান। সোহরাব ভাইয়ের মেইন সিঙ্গারে উনি গাচ্ছেন, ‘ওরে দেখ ভেবে তুই মন, আপন চেয়ে পর ভালো তোর পরের চেয়ে ধন, ওরে দেখ ভেবে...’ এই যে ওরে দেখ ভেবেটা এটা আমরা তিনজনে করতাম। তো ওখান থেকে আজাদ রহমান সাহেব একদিন বলল, ‘এই গানটা একটু শিখে নাও।’ শিখে আমাকে বলল, ‘আগামী অমুক তারিখে আসো।’ তো রেকর্ডিং হয়েছিল আপনার ওটা তখন ছিল ইস্ট পাকিস্তান গ্রামোফোন কোম্পানি। এটার চারজন ডাইরেক্টর ছিলেন খান আতাউর রহমান সাহেব... রূপবানের সালাহউদ্দিন সাহেব, ফেরদৌসী রহমান ও শাহনাজ রহমতুল্লাহ।
এরা এই ইস্ট পাকিস্তান গ্রামোফোনের ডাইরেক্টর ছিলেন। এখন আমার ওয়াইফ যখন জিজ্ঞেস করে তোমার জীবনের প্রথম গানটা কোথায় এখানে? আমাদের তো সব ভাঙাগড়ার ব্যাপার। ফার্মগেটে। এখন ফার্মগেট থেকে সোজা গেলে থানার আগেই একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে, ওটার দোতলায়। ইস্ট পাকিস্তান গ্রামোফোন কোম্পানি ছিল। ওখানে গেলাম। তো নায়করাজ রাজ্জাক সাহেবও আসছিলেন।
তো তখন পরিচালক আসছেন, সবাই আসছেন। এই গানটার গীতিকার আমার চাচা ডাক্তার আবু হায়দার সাজিদুর রহমান। তো আমাকে দেখার পরে তখন ওই প্রযোজক (ইফতেখার) আজাদ রহমান সাহেবকে বললেন, ‘আজাদ সাহেব, আপনি শিল্পী চেনেন তো?’ তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট...
প্রযোজক বলছেন?
খুরশীদ আলম: হ্যাঁ, আমি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ অব মিউজিকে। তো আজাদ রহমান সাহেব বললেন, ‘আমি তো ওকে দিয়ে এই গানটা গাওয়াবার জন্য নিয়ে আসছি।’ তো বলে, ‘না, হবে না।’ কিন্তু প্রযোজক ইফতেখার সাহেবের ওয়াইফ আবার বলছিলেন, ‘তোমার দুহাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম’ যে শিল্পী গেয়েছেন, এটা কিন্তু আজাদ রহমান সাহেবকে ওনার বলা হয়েছিল।’ ইফতেখার সাহেবের ওয়াইফ...
তাকেই গাইতে হবে?
খুরশীদ আলম: ওনার ওয়াইফ বলছে, ‘ওই ভদ্রলোকই গাবে।’ তখন আমি ভদ্রলোকের পর্যায়ে বোধ হয় পড়িনি। [হাসি] তো উনি বলেন, ‘না, আজকে রেকর্ডিং প্যাকআপ।’ তখন উনি একটা কথা বললেন, ‘একে দিয়ে যদি না গাওয়ান, আপনার ছবির সংগীত পরিচালক আমি থাকব না।’ আমার খুব অবাক লাগল। তো তখন আমি খুব ভাগ্যবান যে তখন বেতারে যাঁরা মিউজিক ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতেন, আরডি ছাড়া, এআরডি অ্যাসিস্ট্যান্ট রিজিওনাল ডিরেক্টর, পিপি প্রোগ্রাম প্রডিউসার—তাঁরা বলছেন, ‘আমাদের খুরশীদ আলম আজকে ছবিতে গান দেবে।’ তখন এনারা খুব ইয়ে করল, ‘বাবা, চিন্তা করিস না।’ আমি বলি, ‘আমি তো বেতারে গাই, তো অসুবিধা কি?’ তো রাজ্জাক সাহেব আমাকে ওনার বাসায় নিয়ে গেলেন। বাসায় নিয়ে গিয়ে ওনার দারোয়ানের সঙ্গে, কুকের সঙ্গে, ওয়াইফের সঙ্গে, ছেলের সঙ্গে, মেয়ের সঙ্গে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পরপর তিন দিন। পরে উনি বললেন, ‘আপনার ভয়েসে আমি লিপসিং করব।’ তিন-চার দিন পরে আবার এই গানটা রেকর্ডিং হলো। একটা শর্ত ছিল, যদি গান হিট করে, তাইলে সম্মানী পাব। আর যদি ফ্লপ করে, তাইলে সম্মানী পাব না।
এটা কি ‘বন্দী পাখির মতো’ এই গানটা ছিল?
খুরশীদ আলম: হ্যাঁ, হ্যাঁ।
এরপরে রাজ্জাক সাহেব বললেন যে আপনার আপনার গানে তিনি লিপ মেলাবেন?
খুরশীদ আলম: হ্যাঁ, বললেন, ‘আপনার ভয়েসে আমি লিপসিং করব।’ তো পরে তিন-চার দিন পরে আবার এই গানটা রেকর্ডিং হয়েছিল এবং শর্ত ছিল, যদি গান হিট করে তাহলে সম্মানী পাওয়া যাবে, যদি হিট না করে সম্মানী পাওয়া যাবে না। তো তখন আজাদ রহমান সাহেবও… গান গাওয়ার পরে আমি বলব যে খুব খারাপ হয়েছে এটা না। মোটামুটি…জনপ্রিয়। তো আমার এই গানটি ভালো। সে গানটার যে অর্কেস্ট্রেশন এটা এখন পর্যন্ত বহু লোকে বলে যে তখন ’৬৯-এ এই অর্কেস্ট্রেশন নট আ ম্যাটার অব জোক। কারণ আমাদের যন্ত্র যাঁরা বাজাতেন, তাঁরা সীমিতসংখ্যক ছিলেন। এখানে অর্কেস্ট্রার দুটি গ্রুপ ছিল। একটা হলো আলাউদ্দিন লিটল অর্কেস্ট্রা, এটার মালিক ছিলেন খাদেম হোসেন খান। ওনার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ওনারা খাদেম হোসেন, আবেদ হোসেন। তার ভাই মোবারক হোসেন খান, রাজা হোসেন খান, সেখ সাদী খান। সেখ সাদী খান অবশ্য সংগীত পরিচালক। মোবারক ভাই ডাইরেক্টর ছিলেন, শিল্পকলার ডাইরেক্টর ছিলেন। রেডিওর ডাইরেক্টর ছিলেন, কমার্শিয়ালের ডাইরেক্টর, রিজিওনাল ডাইরেক্টর ছিলেন। আবেদ ভাই সেতার বাজাতেন। তারপরে আরও খাদেম ভাই সেতার বাজাতেন, তারপরে মীর কাসেম ভাইও সেতার বাজাতেন এবং সুরকার ছিলেন বেতারে। আর ধীর আলী ভাই বলে একজন সুরকার ছিলেন। ওনার ছিল ঢাকা অর্কেস্ট্রা। তো ঢাকা অর্কেস্ট্রাতে লেটেস্ট ইকুইপমেন্ট ছিল। কি–বোর্ড, নতুন কি–বোর্ড এল ইউনিভক্স এল, তারপরে গিটার। জাহাঙ্গীর হায়াত খান বলে একটা ছেলে গিটার বাজাতেন, জব্বার খান সাহেবের ছেলে ‘মুখ ও মুখোশ’-এর যে প্রথম পরিচালক, তাঁর ছেলে। এরপর অ্যাকর্ডিয়ন বাজাতেন করিম শাহাবুদ্দীন, নর্থ বেঙ্গলের লোক। তো দেখেন, ভালো কাজের জন্য যে ওই করিম শাহাবুদ্দীনের একটা ইয়ে ছিল যে ওনার অফিস বেতারে আসতে ১০টা বাজত। তো তখন আঞ্চলিক পরিচালক ছিলেন জিল্লুর রহমান সাহেব। মোস্তফা কামাল সৈয়দ সাহেবের বাবা। তো করিম সাহেবকে বলল, ‘করিম সাহেব, তুমি যদি ৯টায় না আসো তাহলে...’ বলে, ‘স্যার, আমার ৯টায় আসা যাবে না।’ তো তিন-চার দিন দেখার পরে দেখল যে না, কমার্শিয়াল সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তখন বলল, ‘ঠিক আছে, তুমি ৯:৩০টায় আসো।’ তা–ও আসার চেষ্টা করো। তো উনি অনেক অ্যাকর্ডিয়ন বাজাতেন। তারপরে তবলায় যারা সংগত করেন, এইটা বাঁশি। রহমান ভাই বাঁশি বাজাতেন, কবির ভাই বাঁশি বাজাতেন। তো তাঁদের যে মানে বেতারে সকালে আসত ২টা-২:৩০টা পর্যন্ত রেকর্ডিং মানে বেতারের কাজ কমার্শিয়াল ট্রান্সমিশন সার্ভিস, এক্সটার্নাল সার্ভিস, হোম সার্ভিস করে দুইটার মধ্যে শেষ। তাঁরা তখন কেউ আপনার ইপসা বলে একটা স্টুডিও ছিল কাকরাইলে, যেটা এখন কর ভবন। এখানে গিয়ে সিনেমার গান রেকর্ডিং করত, রিহার্সাল করত আর রেকর্ডিং করত। আর না হলে শ্রুতিতে গিয়ে খান আতা সাহেবের মগবাজারে যেটা ছিল। তো এভাবে আমাদের কাজ হতো আরকি!
বলছিলেন যে এসি ছিল না, সবাই এমনকি কাপড় মানে শার্ট খুলে...
খুরশীদ আলম: মানে আমি একটা কথা বলি, ‘আগন্তুক’ ছবিতে তখন যাঁরা যন্ত্রশিল্পী ছিলেন, তাঁরা এখানে এখন যে বাংলামোটরে নতুন বিল্ডিংটা হয়েছে, ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বিল্ডিং আরকি! এটা আগে ডাক্তারদের ইয়ে ছিল, সব ডাক্তার এখানে বসত, একটা মল ছিল। সেখানে খাদেম ভাইয়ের একটা রুম ছিল। সেখানে ওই যন্ত্রশিল্পীদের রিহার্সাল হতো। এখানে করার পর তারপরে দেখা যেত যে যখন রেকর্ডিং হচ্ছে তখন তো ফ্যানও চলবে না, এসিও চলবে না। কারণ, তখন প্রযুক্তি এত ডেভলপ করেনি ঢাকা, বাংলাদেশে। তখন আমার জন্য ওনারা, মানে আমিও খুব সত্যি কথা বলতে গান আমার শিখতেও দেরি হতো, গাইতেও অনেক দেরি হতো। আর তখন একটা অসুবিধা ছিল, মিউজিশিয়ানরা যদি বাঁশি ভুল করে, আবার নতুন করে গাইতে হবে। আমি ভুল করি, আবার নতুন করে গাইতে হবে। কিংবা হয়তো সাউন্ডে কিছু একটা হলেই আবার নতুন করে। আমার মনে আছে, আমি একবার ৮০ বার একটা গান গেয়েছিলাম।
শিল্পী খুরশীদ আলম৮০ বার!
খুরশীদ আলম: ৮০ বার। এবং আমরা ডুয়েট গান যদি হতো, একই মাইক্রোফোনে হতো। একই মাইক্রোফোনে ডুয়েট হতো। তখন সাবিনা, সাবিনাও স্বীকার করেছে, আমিও স্বীকার করি যে আমরা হয়তো রিহার্সাল-টিহার্সাল করে রাত ৯টার ভেতরে আমরা ভয়েস দিতে যাচ্ছি। সেটা দেখা গেল যে ভোর তিনটা, চারটা, পাঁচটা হয়ে গেল। একটা গান আপনি যতবার ভালো হওয়ার কথা তো। যন্ত্রশিল্পীরাও বারবার বাজাচ্ছে, আমরাও বারবার গাচ্ছি। যতবার হয় ততবারই কিছুটা ইমপ্রুভ করে আরকি। এভাবে গানগুলো হয়েছিল।
বাংলাদেশের যত সুরকার আছে শুধু আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল সাহেবের সুর ছাড়া প্রত্যেকের সুরে গান গাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। ওনার গান গাওয়ার, ওনার সুরে গান গাওয়ার সুযোগ হয়নি। আর সিনেমার গানে এরপরে আপনার তখন ভালো কাজের জন্য না সবার আগ্রহ বেশি ছিল। আমি তখন কাজী আলাউদ্দিন রোডে ছিলাম, টেলিফোন ছিল না। রবিন ঘোষ সাহেব এহতেশামুজ্জামান চৌধুরী সাহেবকে নিয়ে গেছে। আমার বাসার নম্বর ছিল ৭৭ নম্বর কাজী আলাউদ্দিন রোড। একই হোল্ডিংয়ে তিনটা বাড়ি। ৭৭ নম্বর কাজী আলাউদ্দিন রোডে আমরা থাকতাম জেম হাউসে। একটা রুবি, আরেকটা হলো হ্যামলেট। ওইখানে গিয়ে দুই দিন পায়নি, ফার্স্ট ডে গেছে পায়নি। সেকেন্ড ডেতে গিয়ে একটা চিঠি লিখে আসছে, ‘আমি রবিন ঘোষ সুরকার আসছিলাম। আগামী অমুক তারিখে রেকর্ডিং। আমার এত নম্বর ৭৬ ইস্কাটন গার্ডেনে এলে গানটা শিখে রেকর্ডিং করো।’ আমি পরের দিন গেছি। উনি ‘আপনি’ করে লিখেছেন। আমি বললাম, ‘ভাই, এটা তো...’ আমি কই, ‘আপনার সবচেয়ে ছোট ভাই যে ভাই তার সঙ্গে আমার জানাশোনা।’ যাহোক, সেখানে গেলাম। এহতেশামুজ্জামান চৌধুরী সাহেবের নিয়ে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হলো। ওইখানে ‘পিচ ঢালা পথ’-এর একটা গান আরকি! ‘পিচ ঢালা পথ’ উনি প্রযোজনা করছেন ছবি। ওইখানে একটা গান ছিল, খুব কমেডিয়ান গান আরকি!
বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কখনো ভুল করে নাকোনটা এটা?
খুরশীদ আলম: ‘হেই আমি পাগল পাগল পাগল দুনিয়ায় মানুষ চেনা দায়।’ এ রকম আরকি! তো এইটা একজন শেখাল। তখন উনি লিখতেছেন আর সুর করেন, লেখেন আর সুর করেন। তো ১২টা-১টা এ রকম হয়, তখন দুপুরে ভাতটা তো রবিন ঘোষ সাহেবের বাসায় খাওয়া হলো, ওনার বড় ভাইয়ের বাসা, বাদল ঘোষ। খাওয়াদাওয়ার পরে তো, ‘ভাই, একটু রেস্ট নিই।’ এই আবার রেস্ট-টেস্ট নিয়ে চা-টা খেয়ে, ‘হ্যাঁ ভাই, আবার লেখো, আবার সুর দাও।’ করে শেখাল। পরে রেকর্ডিং করলাম। তারপরে থার্ড রেকর্ডিং হয় আমার সত্যদার সুরে। এটা গাজী মাজহারুল আনোয়ার সাহেবের লেখা ‘সাধারণ মেয়ে’তে। যেখানে নায়ক জাফর ইকবাল ছিলেন আরকি। ই আর খান মামা পরিচালিত। ওইটাতে গানটা ছিল, ‘ডিম ডিম ডিম মারো, ডিম মারো যত পারো জোরে মারো, আমি ভেজে ভেজে খাব, খেয়ে তাগড়া হব, তাগড়া হয়ে আগ্রা যাব, তারাড়ং তারাড়ং তারাড়ং তারাড়ং, বাবাগো মামাগো চাচাগো।’ এই টাইপের একটা গান ছিল জাফর ইকবালের ওপর। তারপরে আর আমাকে পেছনে তাকাতে হয়নি।
হয়নি।
খুরশীদ আলম: কিন্তু একটা হলো যে প্রথম যে গানটা করেছিলাম এটা ওই ‘বন্দী পাখির মতো’। তাই না?
হুম, ওটা একটু গেয়ে শোনান।
খুরশীদ আলম: হ্যাঁ, ‘বন্দী পাখির মতো’।
‘বন্দী পাখির মতো
মনটা কেঁদে মরে
মুক্ত আকাশখানি
কে আমার নিল কেড়ে
ও পাহাড়, ও নদী
বলে দাও কী নিয়ে থাকি
এ ব্যথা কী দিয়ে ঢেকে রাখি
বন্দী পাখির মতো
মনটা কেঁদে মরে’
৮১তম বছরে এসে আপনার কণ্ঠস্বর এত সুন্দর...
খুরশীদ আলম: এটা আমার মনে হয়, এটা অন্যভাবে না বলা, আমার এটা আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি। কারণ, এটা দমের ব্যাপার আছে। বয়সের প্রত্যেকেরই একটু হলেও হয়, আমার যে হয় না তা নয়। পরিবর্তন হয়নি, অবশ্যই হয়েছে।
ভুক্তভোগী আমি, সেই পাকিস্তান দলে আমিসহ দুজন ওপেনার, আমি বাদ!আমাদের, মানে বয়স হলে তো দাঁতে প্রবলেম হবে, দাঁত পড়ে যাবে, উচ্চারণে সমস্যা হবে।
খুরশীদ আলম: তা তো বটেই।
তাই না?
খুরশীদ আলম: এভাবে গান গাওয়া হলো। তারপরে তো এটা যত সিরিয়াস গান ছিল, তারপরে লোকে ওই যে ‘বাবাগো মামাগো’ যে এগুলো গান করার পরে লোক প্রত্যেক সুরকারের একটা ধারণা হয়ে গেল খুরশীদ আলমকে দিয়ে যত লাইট গান গাওয়ানো যায়।
চটুল গান, দ্রুত লয়ের গান।
খুরশীদ আলম: চটুল গান, ফাস্ট বিটের যত গান। যে রকম আলম খান বলে একজন সুরকার ছিলেন, উনি একটা ছবিতে গান, বাহাত্তরে এটা। জাস্ট লিবারেশনের পরে। ছবির নাম হলো, ছবির গীতিকার কবির আনোয়ার এবং এর কাহিনিকারও কবির আনোয়ার, ছবির নাম ‘স্লোগান’। এটা নায়করাজ রাজ্জাকের লিপে একটা বারে একটা গান ছিল। … ড্রাম-ট্রাম নিয়ে একটা গান করেছিল। ওটা শোনার পরে লোকের ধারণা হলো যে না খুরশীদ আলম ফাস্ট বিটের গান গাইলেই হিট করবে।
ওটা কোন গানটা ছিল?
খুরশীদ আলম: ওই গানটা হলো—
তবলার ধেরিকিটে তেরিকিটে তাক
আজকাল হয়ে গেছে সব বরবাদ
ড্রামটা বাজাও জোরে তালে তালে
নাচব সবাই জোড়া জোড়া মিলে
এই তো চাই আমরা সবাই
তবলার ধেরিকিটে তেরিকিটে তাক
আজকাল হয়ে গেছে সব বরবাদ
এই গানটা, তারপরে … খালি ফাস্ট সব, আলী হোসেন সাহেব একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় সুরকার ছিলেন, সুবল দাস উনি একজন অত্যন্ত গুণী এবং অত্যন্ত ভেটারেন একজন সুরকার ছিলেন। কিন্তু সুরকার হওয়ার আগে উনি ভালো গোলকিপার ছিলেন। সুবল দাস, ওনার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে, গোলকিপার ছিলেন আজাদ বয়েজ ক্লাবের। যার জন্য তখন রাতে তো রেকর্ডিং হতো, তো মানুষ মাত্র তো ভুল করে। হয়তো একটু নোট ঠিকমতো লাগেনি কিংবা তালে অসুবিধা হচ্ছে উনি ফুঁ ফুঁ করতেন, গোলকিপার যেটা করে। ‘ভাই, খুব ভালো হয়েছে, খুব ভালো হয়েছে। এই জায়গাটা একটু নোটটা এই একটু ঠিক করে দে তো।’ … প্রত্যেক সুরকারের কাজ নেওয়ার যে কায়দাটা।
আচ্ছা গানের মধ্যে আবার আসব, আপনি বিয়ে করলেন কত সালে?
খুরশীদ আলম: ৭৪-এ।
৭৪-এ। আমাদের ভাবির নাম কী?
খুরশীদ আলম: ওর নাম রীনা আলম।
দেখা হলো কোথায়?
খুরশীদ আলম: দেখা হয়েছে, ও গিটার বাজাত, হাওয়াইয়ান গিটার বাজাত।
আচ্ছা।
খুরশীদ আলম: আমার একটা বন্ধু আবুল কায়েস, একই সঙ্গে আমরা নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়তাম। তো ও পরে সমরদার কাছে গিটার শিখত। ও একটা গানের স্কুল করছে, ওখানে গান শিখত আরকি। ওইভাবে পরিচয়। পরে আমার বাবা, দাদা, চাচা দেখল, ওর বাবা ছিল জগন্নাথ কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল।
জহির রায়হান সিঁড়ির অর্ধেক পর্যন্ত নেমে আবার উঠে এলেন, এরপর সেই যে বেরিয়ে গেলেন, আর ফিরলেন নাহুম, তাহলে শিক্ষক...
খুরশীদ আলম: কমার্সের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট ছিল, আবদুর রউফ মজুমদার।
শিক্ষক পরিবার শিক্ষক পরিবার একটা হয়ে গেল।
খুরশীদ আলম: এইভাবে বিয়ে হয় ৭৪-এ।
আচ্ছা, তারপর দিলীপ বিশ্বাস কী বললেন?
খুরশীদ আলম: না, দিলীপ বিশ্বাস, এটা হয়েছে কী যে মানে যেটা অসুবিধা হয়, মেল সিঙ্গারের যেটা অসুবিধা হয়, ফিমেল সিঙ্গারেরও সেটা অসুবিধা হয়। পরের দিকে আমার ওয়াইফ খুব নিজের থেকে বলত, ‘না, তোমারটা তুমি করো, আমার দরকারটা নাই।’ মানে সত্যদার বাসায় একদিন ওনার, তখন তো প্রত্যেকেই নিজেকে আপন মনে করত। সত্যদা একটা হয়তো ছেলের জন্মদিন, ইমন সাহার জন্মদিন কিংবা … দাওয়াত দিছে, তো আমি আমার ওয়াইফ নিয়ে গেছি। ওইখানে দিলীপ বিশ্বাস পরিচালক একাধারে, কিন্তু অনেকেই জানেন না যে দিলীপ বিশ্বাস সাংঘাতিক, মানে স্টেজে পারফরম্যান্স করতেন গানের।
এবং হাসির গান গাইতেন।
খুরশীদ আলম: এবং সাংঘাতিক, এত হাসির গান গাইতেন ব্যাঙ-ট্যাং নিয়ে গান গাইতেন, জীবিত ব্যাঙ নিয়ে গাইতেন। তো দিলীপ বিশ্বাসের ওখান সবাই গেছে… সত্যদাকে (আমি বলেছি), ‘দাদা, আমার বউ।’ দিলীপ বিশ্বাস বলতেছে, ‘খুরশীদ, গতকালকে যে নিউমার্কেটে কলেজ রেস্টুরেন্টে একটা মেয়েকে দেখালি আমার বউ, ওই মেয়ে হচ্ছে এ মেয়ে তো চেহারা মিলতেছে না।’ আমার ওয়াইফ ব্লটিং পেপার, বুঝছেন? তো পরে আবার...
উনি সিরিয়াসলি নিলেন এবং আপনার...
খুরশীদ আলম: না না, মানে অবাক হয়ে গেছে। সত্যদাও অবাক হয়ে গেছে, আমার ওয়াইফও অবাক, আমিও খুব। পরে আবার দিলীপ বিশ্বাস বলল, ‘না না, সত্যদা কিছু মনে নিয়েন না, এমনিই ফান করলাম।’
সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে ফিজিক্যালি অ্যাকটিভ থাকতে হবেআচ্ছা। আচ্ছা, এখন আবার গানে আসি। আমরা বলছিলাম যে সত্তরের দশকে স্কুলে পড়েছি, আশির দশকে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। আপনার গান, রেডিও খুললেই আপনার গান, সেটা তো এখন দেখা যাচ্ছে সিনেমার গানও যেমন, সিনেমার বাইরের আধুনিক গানও তেমন। ‘মাগো মা ওগো মা’, এই গানটা তো মানে আমাদের কী বলব, সর্বরাষ্ট্রীয় সংগীত, জনগণের প্রত্যেকের হৃদয়ের গান হয়ে গেছে।
খুরশীদ আলম: এটা ‘সমাধি’ ছায়াছবির। এটার পরিচালক ছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার সাহেব। গাজী মাজহারুল আনোয়ার সাহেব অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন গীতিকার। একাধারে গীতিকার, প্রযোজক, পরিচালক এবং সংলাপ রচয়িতা এবং গান লিখেছেন, বহু গান লিখেছেন। উনি ‘সমাধি’ ছবি করবেন। গানটা সত্যদার সুরারোপিত। এটার রেকর্ডিং হয়েছিল ইপসা স্টুডিওতে, কাকরাইলে, যেটা কর ভবন ছিল, এখন কর ভবন আছে ওইখানে। তখন যেটা হতো যে ভালো কাজ করার জন্য যে রকম সাবিনা, রুনা লায়লা কিংবা শাহনাজ রহমাতুল্লাহ, ফেরদৌসী আপা, আঞ্জুমান আরা এনারা যখন গাইতেন তখন নায়িকা যাঁরা নায়িকার গান গাইতেছে হয়তো সাবিনার তখন তাঁরা আসতেন। সাবিনা কীভাবে এক্সপ্রেশনটা দিচ্ছে, রুনা লায়লা কীভাবে দিচ্ছে, আঞ্জুমান আরা আপা কীভাবে, ফেরদৌসী রহমান কীভাবে দিচ্ছে।
স্টুডিওতে পারফরমাররা চলে আসতেন?
খুরশীদ আলম: নায়িকারা কিংবা সহনায়িকার সঙ্গে যাঁরা ছিলেন বা কমেডিয়ানরা আসতেন প্রত্যেকেই। সমাধি ছবির ‘মাগো মা’ গান রিলিজ হওয়ার পর একটা ব্যাপার ঘটল। সে সময় কাকরাইলে সব সিনেমার অফিস ছিল। প্রযোজকদের অফিস। আর ছিল গুলিস্তানে। লোকে যখন মফস্সল থেকে সিনেমার রিল নিতে আসত, তখন নাম বলত ‘মাগো মা’। ছবির নাম ছিল সমাধি। কিন্তু তারা সেটা বলত না। তারা বলত ‘মাগো মা’। গাজী ভাই সব সময় বলত, ‘আমি ছবির নাম রাখলাম সমাধি, আর হয়ে গেল মাগো মা।’
এটা একটু গেয়ে শোনাতে হবে। হ্যাঁ? অল্প একটু গেয়ে শোনান।
খুরশীদ আলম: হ্যাঁ। গানটাতে নায়করাজ রাজ্জাক আর সুমিতা দেবীর সঙ্গে আরও কয়েকজন কমেডিয়ান ছিলেন।
‘মাগো মা ওগো মা
আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা
মাগো মা ওগো মা
আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা
আমি দুনিয়া ছাড়ি যেতে পারি
তোকে আমি ছাড়ব না
ও মা তোকে আমি ছাড়ব না
মাগো মা ওগো মা
আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা’
সাংঘাতিক! আমি কিন্তু বিস্মিত, অভিভূত, মুগ্ধ।
খুরশীদ আলম: এটা আবারও বলি, আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি যে আল্লাহ সবাইকে সব জিনিস দেয় না। আমাকে হয়তো এটা দিয়েছে। এটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা উচিত বলে আমি বিশ্বাস করি।
নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই আমাদের কৃতজ্ঞ থাকতে হবে আল্লাহর প্রতি।
খুরশীদ আলম: অবশ্যই শুকরিয়া আদায় করা...
জি, শুকরিয়া আদায় করতে হবে। আর ওই গানটার কথাটাও আমার খুব ভালো লাগে, ‘ওগো নিরুপমা, ওগো...’
খুরশীদ আলম: এইটা হলো...
‘পাখির বাসার মতো দুটি চোখ তোমার ঠিক যেন...’
খুরশীদ আলম: রুনা লায়লা এলেন পাকিস্তান থেকে। ’৭৪-এর শেষের দিকে। ফারুক ভাই হলো প্রথম— ওনার সঙ্গে গাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে, আর আমি সেকেন্ড আর্টিস্ট। গানটির সুরকারকে বাংলাদেশে বহু লোক ভুলে গেছে, মনসুর আহমেদ। ওনার বাড়ি রংপুর। আমি তখন পুরানা পল্টন লাইনে থাকি। আমার বাসায় গাড়ি নিয়ে এক মহিলা এলেন। আমার বাড়ির নাম ছিল ‘অগত্যা’। এসে বললেন, ‘আমার নাম জবা চৌধুরী। আমার হাজব্যান্ড প্রডিউসার। আমি একটা ছবি করব জিঘাংসা।’ গানটার সুরকার মনসুর আহমেদ আর গীতিকার দেওয়ান নজরুলও এসেছিলেন। মনসুর ভাইয়ের বাড়ি রংপুর এবং দেওয়ান নজরুল সাহেবের বাড়ি সিরাজগঞ্জ।
আপনার বাড়ি বগুড়া।
খুরশীদ আলম: আমার বাড়ি জয়পুরহাট/বগুড়া যেটাই বলেন না কেন! আর দেওয়ান নজরুল সাহেবের আরেকটা পরিচয় আছে। সে সময় অত্যন্ত জনপ্রিয় পরিচালক ছিলেন ইবনে মিজান সাহেব। কিন্তু ওনার সম্পর্কে লোকের একটা কথা ছিল যে উনি ভারতীয় সুপারহিট ছবিগুলো রিমেক করতেন এখানে। অনুমতি নিয়েই করতেন। তো তাঁর ভাগনে ছিলেন দেওয়ান নজরুল সাহেব। দেওয়ান নজরুল কিন্তু একটা সাংঘাতিক গান লিখেছিলেন যেটা আমি ৭৫ বা ৭৬-এ গেয়েছি। সেটা এখনো লোকে গায়; এ প্রজন্মের শিল্পীরাও গায়।
‘চুমকি চলেছে’?
খুরশীদ আলম: হ্যাঁ। তবে আপনি বললেন যে ছবির কথা; জিঘাংসা…
আমরা একটু শুনি গানটা।
খুরশীদ আলম: এটা রেকর্ডিং হয়েছিল ইন্দিরা রোডের একটা স্টুডিওতে। এটা রুনা লায়লার সঙ্গে আমার জীবনের প্রথম গান। গাওয়ার চেষ্টা করছি।
ও অনুপমা, ও নিরুপমা
পাখির বাসার মতো দুটি চোখ তোমার
ঠিক যেন নাটোরের বনলতা সেন
এই পাখির বাসার মতো দুটি চোখ তোমার
ঠিক যেন নাটোরের বনলতা সেন
আমি আজ হারিয়েছি তোমারি পরশে
স্বপ্নীলা বেশে
ও অনুপমা, ও নিরুপমা
সাংঘাতিক! সাংঘাতিক!
খুরশীদ আলম: এটা জবা চৌধুরী আর ওয়াসিমের ওপর ধারণ করা হয়েছিল।
একটা প্রশ্ন, ঢাকা শহরে কোনো একটা ভালো ভবন দেখলে আমার মনে হয়, এটা খুরশীদ আলমের বাড়ি। কারণ, আপনার ৫০০ গানের প্রায় সবই জনপ্রিয়। তাহলে আপনার মতো বড়লোক তো কেউ নেই। এদিকে চাকরিও করেছেন, তাই না?
খুরশীদ আলম: চাকরি করে কিন্তু পেনশন পাই নাই। আমি বিসিআইসিতে চাকরি করতাম। যখন এলপিআরে গেলাম, তার দুই বছর পর থেকে পেনশন। করপোরেশনের পেনশন চালু হলো।
তাহলে বাড়িগুলো সব আপনার না?
খুরশীদ আলম: তখন কি টাকা বেশি পাওয়া যেত? পেতাম না তো, খুবই নগণ্য।
একটা ফিল্মে একটা গান গেয়ে ৭২ সালে, ৭৫ সালে, ৮০ সালে কত টাকা পেতেন?
খুরশীদ আলম: আগে সর্বোচ্চ সম্মানী ছিল এক থেকে দেড় হাজার টাকা।
সর্বোচ্চ!
খুরশীদ আলম: যদি দ্বৈত গান হতো, তাহলে পাঁচ শ, এক হাজার।
ও। আমাদের শিল্পীদের প্রত্যেকেরই এখন যেসব গান বাজে, সেগুলোর রয়্যালটি পান না?
খুরশীদ আলম: না, রয়্যালটি হয় না। রয়্যালটি দেওয়া উচিত। আমি সরকারকে অনেকবার বলার চেষ্টা করেছি যে যদি একবার রয়্যালটি সিস্টেমটা চালু করতে পারে, তাহলে কিন্তু সরকারকে আর শিল্পী, অভিনেতা, অভিনেত্রীদের জন্য থোক বরাদ্দ থেকে ৫ লাখ, ১০ লাখ দিতে হয় না। মানে করুণাটা করতে হয় না। যদি একটা লোককে রিটায়ারমেন্টের পর পেনশন দেওয়া হয়, তাহলে ১০ বছর জীবিত থাকলে এবং তারপর তার স্ত্রীও সেটা পায়। ওটা যদি দিতে পারে, এটা দেবে না কেন? সারা পৃথিবীতেই রয়্যালটি আছে। শিল্পীদের রয়্যালটি দেওয়া উচিত বলে আমি বিশ্বাস করি। আশা করি, এটা দেখবেন। আর আমার মনে হয় যে আমরা নিজেরাও ঐক্যবদ্ধ নই। শিল্পীরা ঐক্যবদ্ধ নয়। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হতাম যে বেতার বন্ধ করো, টেলিভিশন বন্ধ করো.. তাহলে সবই হতো।
তাহলে হতো, জি।
খুরশীদ আলম: তো এ পর্যন্ত আমরা যেতে পারিনি। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। নতুন প্রজন্ম হয়তো চেষ্টা করলে পারবে, আমার মনে হয়।
তো খুরশীদ ভাই, আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আপনি এখনো আছেন, ভালো, সুস্থ আছেন এবং প্রাণবন্ত আছেন, হাসিখুশি আছেন। সুন্দর গান শোনালেন আর অনেক সময় দিলেন প্রথম আলোকে, ক্রাউন সিমেন্টকে, আমাদের অভিজ্ঞতার আলোয়। সবাইকে ধন্যবাদ এতক্ষণ থাকার জন্য। আমরা শেষ করে দেব, কিন্তু আমার অনুরোধ হচ্ছে আপনি ‘চুমকি চলেছে’ গানটা গাইবেন; এর মধ্য দিয়েই আমরা শেষ করব।
খুরশীদ আলম: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ এত সুন্দর উপস্থাপনা করার জন্য। আর যাঁরা ক্যামেরায়, সেটে, লাইটে ছিলেন, তাঁদেরও আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। যাঁরা এত কষ্ট করে দেখছেন, তাঁদের আমি বলব যে আমার জন্য দোয়া করুন, আমার শরীর-স্বাস্থ্য যেন ভালো থাকে। আমি সুস্থভাবে যেন গান গাইতে পারি, এটা আল্লাহরর কাছে আমিও চাই, আপনারাও আমার জন্য দোয়া করবেন। অনেক অনেক ধন্যবাদ। আর যে গানটি গাইছি, এটি ‘দোস্ত দুশমন’ ছায়াছবিতে। এটাতে ওয়াসিম সাহেব আর সোহেল রানা সাহেব ছিলেন এবং শাবানা ম্যাডাম। এটার গীতিকার দেওয়ান নজরুল সাহেব এবং সুরকার আলম খান।
চুমকি চলেছে একা পথে
আরে সঙ্গী হলে দোষ কী তাতে
হার মেনেছে দিনের আলো
রাগলে তোমায় লাগে আরও ভালোওও…
সুন্দরী চলেছে একা পথে
এই সঙ্গী হলে দোষ কী তাতে
রাগ কোরো না সুন্দরী গো
রাগলে তোমায় লাগে আরও ভালোওও…
চুমকি চলেছে একা পথে
অনেক ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ। মুগ্ধ! মুগ্ধ!
খুরশীদ আলম: দোয়া করবেন।
ভালো থাকবেন।
খুরশীদ আলম: থ্যাংক ইউ।
বাংলাদেশ ভালো থাকুক।
খুরশীদ আলম: অবশ্যই।