জাপানের স্বচ্ছ ছাতার আড়ালে হাজার বছরের কোন গল্প লুকিয়ে
· Prothom Alo

বৃষ্টি, রোদ, স্বচ্ছ ছাতা—নাকি এর পেছনে আছে আরও পুরোনো কোনো গল্প? সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই একটি দৃশ্য বারবার চোখে পড়ছে, জাপানের রাস্তায় ছাতা হাতে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়েরা। কেউ একা, কেউ সতীর্থদের সঙ্গে; কারও হাতে স্বচ্ছ ছাতা, কারও মাথার ওপর রঙিন ছাতা। ছবিগুলোতে জাপানের শহর, আলো, বৃষ্টি আর ছাতার মিশ্রণে তৈরি হচ্ছে একধরনের সিনেমাটিক আবহ।
Visit afsport.lat for more information.
বিশেষ করে এশিয়ান গেমস ২০২৬ ঘিরে ছাতার উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হয়েছে। গেমস চলাকালে নাগোয়া ও আশপাশের এলাকায় বৃষ্টির কারণে বেশ কিছু আউটডোর প্রতিযোগিতা ব্যাহত হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর টেনিসের সব ম্যাচ ইনডোরে সরিয়ে নিতে হয়েছিল; ক্রিকেট, ফুটবলসহ আরও কিছু প্রতিযোগিতা বৃষ্টির প্রভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জাপানে গেলেই ছাতা নিয়ে ছবি তোলার এই প্রবণতা এতটা চোখে পড়ে কেন? উত্তরটা শুধু ‘জাপানে বৃষ্টি বেশি হয়’—এত সরল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাপানের আবহাওয়া, দৈনন্দিন জীবন, প্রযুক্তি ও নকশার ব্যবহারিক বোধ, রোদ থেকে নিজেকে রক্ষা করার সংস্কৃতি, এমনকি কয়েক শতাব্দী পুরোনো আধ্যাত্মিক বিশ্বাসও।
জাপানে বর্ষাকাল ‘ৎসুয়ু’তে এ ছাতা কার্যত দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য সামগ্রী হয়ে ওঠেজাপানে ছাতা যেন দৈনন্দিন জীবনের অংশ
জাপানি ভাষায় ছাতাকে বলা হয় ‘কাসা’। দেশটির বর্ষাকাল ‘ৎসুয়ু’তে এ ছাতা কার্যত দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য সামগ্রী হয়ে ওঠে। জুনের দিকে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়লেও আবহাওয়া সাধারণত উষ্ণ ও আর্দ্র থাকে। ফলে বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে রেইনকোটের চেয়ে ছাতা অনেকের কাছে আরামদায়ক বিকল্প। মজার ব্যাপার হলো, জাপানে ছাতা ব্যবহারকে ‘আনকুল’ বা সেকেলে মনে করা হয় না। শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ, বয়স্ক কিংবা গৃহিণী—সব বয়সের মানুষই প্রয়োজনমতো ছাতা ব্যবহার করেন। অর্থাৎ ছাতা সেখানে কেবল বৃষ্টির দিনের আনুষঙ্গিক নয়; ব্যস্ত জীবনের স্বাভাবিক অংশ।
আর সেই স্বচ্ছ ছাতা? জাপানের রাস্তায় পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি যে ছাতাটি আকৃষ্ট করে, সেটি হলো স্বচ্ছ ভিনাইল ছাতা। হঠাৎ বৃষ্টি নামল, কিন্তু সঙ্গে ছাতা নেই—সমাধান খুব সহজ। কাছের কোনো স্টোর থেকে একটি স্বচ্ছ ছাতা কিনে নেওয়া যায়। ইনসাইড জাপানের তথ্য অনুযায়ী, স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ছাতা দেশটিতে এত সহজলভ্য যে বৃষ্টির আকস্মিক আক্রমণ সামলাতে এটি খুবই পরিচিত একটি পছন্দ। স্বচ্ছ হওয়ার কারণে ভিড়ের মধ্যেও সামনে দেখা যায়, যা ব্যস্ত শহরের রাস্তায় বেশ ব্যবহারিক সুবিধা। কিন্তু এই সাধারণ দেখতে ছাতাটির পেছনেও আছে জাপানি উদ্ভাবনের গল্প।
স্বচ্ছ ভিনাইল ছাতা আজ পৃথিবীর বহু দেশেই দেখা যায়। এর আধুনিক জনপ্রিয় রূপের শিকড় জাপানে। টোকিওভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী ছাতা নির্মাতা হোয়াইট রোজের ইতিহাস অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্লাস্টিক ফিল্ম ব্যবহার করে তারা এমন একটি ছাতা তৈরি করে, যার ছাউনির ভেতর দিয়ে বাইরে দেখা যায়। সেটিই পরবর্তীকালে স্বচ্ছ ভিনাইল ছাতার পরিচিত রূপের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশি ক্রিকেটাররাও ছাতা নিয়ে ছবি তোলেনপ্রথম দিকে স্বচ্ছ ছাতার মূল আকর্ষণ ছিল ব্যবহারিকতা। বৃষ্টির মধ্যেও চারপাশ দেখা যায়। পরে সস্তা সংস্করণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি জাপানের সবচেয়ে পরিচিত দৈনন্দিন পণ্যের একটি হয়ে ওঠে। তবে সব স্বচ্ছ ছাতাই যে একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার মতো, তা নয়। হোয়াইট রোজের মতো জাপানি নির্মাতারা এখনো স্বচ্ছ ছাতাকে দীর্ঘস্থায়ী, টেকসই এবং কারিগরি উৎকর্ষের পণ্য হিসেবে তৈরি করে। অর্থাৎ একই ‘স্বচ্ছ ছাতা’ একদিকে যেকোনো স্টোরের সস্তা দৈনন্দিন সামগ্রী, অন্যদিকে জাপানি কারুশিল্পের সূক্ষ্ম উদাহরণও হতে পারে।
জাপানে ছাতা নিয়ে এত ব্যবস্থা কেন?
ছাতা ব্যবহারের সঙ্গে জাপানের সামাজিক শৃঙ্খলাও জড়িয়ে আছে। বৃষ্টির দিনে কোনো দোকান, রেস্তোরাঁ বা অফিসে ঢোকার সময় ভেজা ছাতা নিয়ে ভেতরে ঢুকলে মেঝে ভিজে যেতে পারে। তাই অনেক প্রতিষ্ঠানের বাইরে ছাতা রাখার স্ট্যান্ড থাকে। কোথাও আবার ভেজা ছাতার জন্য বিশেষ প্লাস্টিক কভার দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে, যাতে পানি ঝরে মেঝে নোংরা না হয়। বড় ভবনে ভেজা ছাতা ঝেড়ে পানি ঝরিয়ে নেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থাও দেখা যায়। কিছু হোটেল, স্পোর্টস সেন্টার ও সরকারি অফিসে লকারও থাকে। একটি সাধারণ ছাতাকে ঘিরে এত ব্যবস্থাই দেখায় জাপানে দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট অসুবিধাগুলোকে কীভাবে পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে সামলানো হয়।
শুধু বৃষ্টিতে নয়, রোদেও ছাতা
এখানেই আসে আরও একটি মজার বিষয়। জাপানে রোদ থাকলেও অনেক মানুষ ছাতা ব্যবহার করেন। তবে সেটি সাধারণত বৃষ্টির ছাতা নয়, প্যারাসোল বা সান আমব্রেলা রোদ ও অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড রোদ ও গরম থেকে নিজেকে আড়াল করার পাশাপাশি ত্বককে অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করাও এর একটি উদ্দেশ্য। ফলে জাপানের রাস্তায় উজ্জ্বল রৌদ্রোজ্জ্বল দিনেও ছাতা হাতে মানুষ দেখা অস্বাভাবিক নয়। ইনসাইড জাপানে উল্লেখ রয়েছে, বর্ষার পর রোদ থেকে সুরক্ষার জন্য প্যারাসোলের ব্যবহার বেড়ে যায়। অর্থাৎ সেখানে ছাতার গল্পটি আসলে বৃষ্টি হোক কিংবা রোদ, সঙ্গে থাকতে পারে।
গল্প এখানেই শেষ নয়
সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশটি সম্ভবত এখানেই। জাপানে ছাতার ইতিহাস এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। দেশটির সরকারি প্রকাশনা এবং বিবিসির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানে ছাতার ব্যবহার নবম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে দেখা যায়। তবে সে সময় এটি সাধারণ মানুষের বৃষ্টি থেকে বাঁচার উপকরণ ছিল না। বরং ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মাথার ওপর ধরে রাখা হতো। যা ছিল ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতীক। দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু প্রাচীন জাপানি বিশ্বাসে ছাতার আরও একটি অর্থ ছিল।
ছাতা কি আত্মার আশ্রয় হতে পারে?
জাপানি লোকবিশ্বাসে কিছু বস্তু ‘ইওরিশিরো’ হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ এমন বস্তু, যা দেবতা বা আত্মিক সত্তাকে আকর্ষণ বা ধারণ করতে পারে। বিবিসির সঙ্গে কথা বলার সময় জাপানি লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তাতসুও দানজ্যো ব্যাখ্যা করেছেন, জাপানি অ্যানিমিস্টিক চিন্তায় ছাতার গোলাকার আকৃতি আত্মার আকৃতির সঙ্গে এবং হাতল একটি স্তম্ভের সঙ্গে তুলনীয়। সেই কারণে ছাতাকে আত্মিক সত্তার অবতরণের জন্য একটি সম্ভাব্য স্থান হিসেবে ভাবা হতো। এই বিশ্বাসের প্রতিফলন এখনো দেশটির বিভিন্ন উৎসবে দেখা যায়।
কিয়োটোর ইয়াসুরাই মাতসুরিতে ফুল দিয়ে সাজানো ছাতা রোগব্যাধি মানুষের শরীর থেকে টেনে নিয়ে যায়, এমন বিশ্বাস রয়েছে। ফুকুওকার হাকাতা দোনতাকু উৎসবে বিশাল ছাতার মতো কাঠামো বহন করা হয়, যার নিচ দিয়ে গেলে সৌভাগ্য ও সুস্বাস্থ্যের আশীর্বাদ পাওয়ার বিশ্বাস রয়েছে। আবার কোচি প্রিফেকচারের ওকিনোশিমাতে ওবন উৎসবের সময় ছাতার মতো কাঠামো মৃতদের আত্মাকে ধারণ ও পথ দেখানোর প্রতীকী ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ আধুনিক জাপানে ছাতা যতটা ব্যবহারিক, তার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে এটি ততটাই প্রতীকী।
চেরনোবিলের যে রাত বদলে দিয়েছিল পারমাণবিক ইতিহাসআধুনিক জাপানে ছাতা যতটা ব্যবহারিক, তার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে এটি ততটাই প্রতীকীছাতারও আছে ‘ভূত’!
জাপানি লোককথায় ‘কাসা ইয়োকাই’ নামে ছাতা-আত্মার ধারণাও রয়েছে। দেশটির পুরোনো শিল্পকর্মে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ব্যবহৃত বা পরিত্যক্ত কোনো সাধারণ বস্তু একসময় অতিপ্রাকৃত সত্তায় পরিণত হয়েছে, এমন বিশ্বাস। ছাতা-আত্মা সাধারণত এক চোখওয়ালা অদ্ভুত ও কৌতুকপূর্ণ চরিত্র হিসেবে চিত্রিত হয়। এটি জাপানের সেই অ্যানিমিস্টিক বিশ্বাসেরই অংশ, যেখানে দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসের মধ্যেও আত্মা বা সত্তার উপস্থিতি কল্পনা করা হয়।
ভাবুন, যে ছাতাটি আজ আপনার মাথাকে বৃষ্টি থেকে বাঁচাচ্ছে, জাপানি লোককথার জগতে সেটিই আবার একদিন ‘জীবন্ত’ হয়ে উঠতে পারে!
তাহলে খেলোয়াড়েরা ছাতা হাতে ছবি তুলছেন কেন?
এবার ফিরে আসা যাক সেই ছবিগুলোতে। এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে জাপানে যাওয়া খেলোয়াড়দের হাতে ছাতা থাকার প্রথম এবং সবচেয়ে সহজ কারণ দেশটির আবহাওয়া। এবারের এশিয়ান গেমসে বৃষ্টি বাস্তবেই বড় ভূমিকা রেখেছে; নাগোয়ায় প্রবল বৃষ্টির কারণে গেমস শুরুর আগেই শত শত ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তা সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে গেমস চলাকালেও একাধিক প্রতিযোগিতা বৃষ্টির কারণে ব্যাহত হয়েছে।
তবে একজন বিদেশি খেলোয়াড়ের কাছে জাপানের স্বচ্ছ ছাতা কেবল বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার উপকরণ নয়। এটি খুব সহজেই ভ্রমণের একটি ভিজ্যুয়াল স্মারক হয়ে ওঠে। স্বচ্ছ ছাতার মধ্য দিয়ে মুখ দেখা যায়, পেছনের শহর দেখা যায়, বৃষ্টির ফোঁটা দেখা যায়। ভেজা রাস্তায় আলো প্রতিফলিত হয়; ছাতার ওপর জমে থাকা পানির ফোঁটা ছবিতে আলাদা আবহ তৈরি করে। ফলে একটি সাধারণ বৃষ্টির দিনও ছবিতে হয়ে ওঠে জাপানি শহরের একধরনের পোস্টকার্ড। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ছবিই হয়ে যায়—‘আমি জাপানে আছি’ মুহূর্তটির দৃশ্যমান ঘোষণা।
রাজারহাট, কুড়িগ্রাম
চীনের এই কালো ডিমকে ‘শতবর্ষী ডিম’ বলা হয় কেন