স্বর্গের দুয়ারে দুবার

· Prothom Alo

কিছু পথ পায়ের ক্লান্তিতে শেষ হয়, কিছু পথ খুলে দেয় মনের অচেনা জানালা। পাহাড়ের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এক স্বর্গদ্বার, মেঘের ভেলায় ভেসে যাওয়া আকাশ আর বারবার ফিরে আসার গল্প—সব মিলিয়ে এ যেন প্রকৃতির কাছে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের এক অনন্য যাত্রা।

চেংডু থেকে ভোরের হাই-স্পিড ট্রেন হুনান প্রদেশের ঝাংজিয়াজিয়ের দিকে ছুটছে। জানালার বাইরে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে চীনের ভূদৃশ্য। শহরের কংক্রিট পেরিয়ে ভাসছে সবুজের ঢেউ। গন্তব্য থিয়েনমেন পর্বত। চৈনিক ভাষায় ‘থিয়েন’ অর্থ স্বর্গ; ‘মেন’ অর্থ দরজা। অর্থাৎ সহজ বাংলায় এই পর্বতের নাম ‘স্বর্গদ্বার’।

Visit esporist.org for more information.

কেবল কার স্টেশন

ঝাংজিয়াজিয়ে নেমেই সোজা শহরের কেন্দ্রে। পথে নানা স্থান থেকে উঁকি দিয়েছে স্বর্গদ্বার। শহরের কেন্দ্রে আছে পুরোনো কেবল কার স্টেশন। আর খানিকটা দূরে আছে আরেকটি স্টেশন। থিয়েনমেনের মূল আকর্ষণগুলোর একটি এই আকাশরথ। প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ পথটি শহর থেকে সরাসরি উঠে গেছে পাহাড়ে। একদিকে উঠলে নামতে হয় আরেকদিকে। একপথে আছে শুরুতে কেবল কার, এরপর শাটল বাস। অন্যটিতে উল্টো। নিজেই বেছে নেওয়া যায় কোন পথে যেতে চান। আমার পছন্দ দ্বিতীয়টি। তাই ব্যাকপ্যাকটা লকার রুমে জমা রেখেই ছুটলাম শাটল বাস ধরতে। খানিক বাদেই পৌঁছে গেলাম নতুন স্টেশনে।

থিয়েনমেন আসলে ঝাংজিয়াজিয়ে ন্যাশনাল ফরেস্ট পার্কের অংশ নয়; শহরের ঠিক দক্ষিণে দাঁড়িয়ে থাকা আলাদা এক পর্বত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৫১৮ মিটার উঁচু। উচ্চতার বিচারে খুব বিশাল কোনো পর্বত নয় এটি। কিন্তু এর ভূপ্রকৃতির সামনে উচ্চতার হিসাব গৌণ হয়ে যায়। পাহাড়জুড়ে চুনাপাথরের খাড়া প্রাচীর, গভীর খাদ, মেঘ আর অদ্ভুত সব বাঁক।

প্রবেশপথপাহাড়ের ওঠার প্রবেশপথ

প্রকৃতি এখানে একটু জাদু দেখিয়েছে। পাহাড়ের বুকের ভেতর দিয়ে তৈরি হয়েছে বিশাল এক প্রাকৃতিক খিলান; থিয়েনমেন গুহা, অর্থাৎ ‘স্বর্গদ্বার’। প্রায় ১৩১ মিটার উঁচু ও ৫৭ মিটার প্রশস্ত এই প্রাকৃতিক দুয়ার দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পাহাড়ের শরীর কেউ আকাশের বিশাল এক ছবি ঝুলিয়ে দিয়েছে। কেবল-কারে ওঠার পর শহরটি দ্রুত ছোট হতে লাগল। রাস্তা সরু দাগ, গাড়ি বিন্দু। এরপর শহরও মিলিয়ে গেল। দৃশ্যপটে উদিত হলো চাষের জমি, বন, খাড়া পাহাড় আর মেঘ। আকাশরথ তো নয় যেন ভূগোলের শিক্ষক!

মিডল-স্টেশনে নামতেই প্লাটফর্ম থেকে দেখা যায় পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠা টংথিয়ান অ্যাভিনিউ; অর্থাৎ স্বর্গের পথ। ৯৯টি তীব্র বাঁক নিয়ে সাপের মতো পাক খেতে খেতে রাস্তা উঠে গেছে পাহাড়ে। তাই এই রাস্তা ‘নাইনটি-নাইন বেন্ডস রোড’ নামে খ্যাত। ওপরে থেকে তাকালে মনে হয়, কোনো চিত্রকর পাহাড়ের সবুজ শরীরে একটি ফিতা এঁকে দিয়েছে। ১০ কিলোমিটারের এই সড়ক সমতল থেকে সরাসরি উঠে গেছে ১,৩০০ মিটারে। ফ্যাবিও বেরোন নামের এক ইতালীয় নাগরিক বিশেষায়িত ফেরারি চালিয়ে ১১ মিনিটে এই সড়ক অতিক্রম করার পর থেকে এখানে অনেক এক্সট্রিম রেসও আয়োজিত হয়। আকাশরথ চালু হওয়ার আগে এই পথেই দর্শনার্থীরা ওঠানামা করত।

৯৯ বাঁকের রাস্তার সঙ্গে নিজের ভ্রমণস্মৃতি রেখে দিয়েছেন লেখক

কিন্তু থিয়েনমেনের আসল নাট্যমঞ্চ অর্থাৎ স্বর্গদ্বার আরেকটু সামনে। তবে প্রকৃতি বিনামূল্যে স্বর্গের টিকিট দেয় না! সামনে ৯৯৯টি সিঁড়ি। সিঁড়িগুলো নিচ থেকে ওপরে এমনভাবে উঠে গেছে, যেন পাহাড়ের গায়ে কেউ আকাশ পর্যন্ত যাওয়ার মই বসিয়ে দিয়েছে। নামটিও যথার্থ; স্বর্গের সিঁড়ি। টাকা গচ্ছা দিয়ে লিফট ব্যবহার করে এই ওঠানামা এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু এতদূর এসে আমি স্বর্গের সঙ্গে আপস করতে রাজি নই। তাই শুরু হলো ওঠা।

সর্বত্র লোকারণ্য। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুবান্ধবের দল, কেউ আবার আমাদের মতো দূরদেশ থেকে আসা একাকী পথিক। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণে এমনটাই স্বাভাবিক। প্রথম কয়েকশ সিঁড়ি বেশ উৎসাহ নিয়েই উঠেছি। তারপর শুরু হলো পায়ের সঙ্গে মনের কথোপকথন। সিঁড়িগুলো কেন যেন আর কমছে না! কেউ দ্রুত উঠছে, কেউ ধীরে। কেউ কয়েক ধাপ পরপর দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে, কেউ আবার ছবি তুলতে তুলতে নিজের হাঁপ ধরা গোপন করার চেষ্টা করছে। আমি দ্বিতীয় দলের।

এখানে পৌঁছালেই হবে স্বর্গপ্রাপ্তি

অবশেষে নির্বাণ লাভ না করেই ঘটে গেল আমার স্বর্গপ্রাপ্তি। পেছনে পাহাড়ের গা বেয়ে সোজা নেমে যাওয়া সিঁড়ি। সামনে বিশাল স্বর্গদ্বার। পাহাড়ের বুকের সেই দরজার ওপারে ঝুলে আছে নীল আকাশ। নিচে জমানো জলে আকাশের অবিকল প্রতিচ্ছবি। নামের যথার্থতা নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন নেই আমার মনে। এরপর ঘটল দিনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা!

কোনো এক বিভ্রান্তিতে ভুল লিফটে উঠে পড়লাম। পাহাড়ের ভেতরেই খনন করে স্থাপিত লিফট নামছে। একে একে পাঁচটি লিফট। নেমে সামনে যা দেখলাম তা প্রথমে বিশ্বাস হলো না। আবার সিঁড়ি! আর এই সিঁড়ি তো চেনা চেনা লাগছে! একটু পরেই বুঝলাম আমি আবার সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে, যেখান থেকে কিছুক্ষণ আগে ৯৯৯টি সিঁড়ি চড়েছি। পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, থিয়েনমেন হয়তো আমার সাথে রসিকতা করছে। সামনে একই সিঁড়ি। একই পাহাড়। একই আকাশ। একই স্বর্গদ্বার।

স্বর্গলাভের আশায় উঠছে মানুষ ৯৯৯ সিঁড়ি বেয়ে

আর পিছু হটার উপায় নেই। দ্বিতীয়বার শুরু হলো স্বর্গযাত্রা। এবারের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। প্রথমবার উঠেছি স্বর্গের দুয়ার দেখতে। এবার উঠছি নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে। তবে ওপরে উঠে আর আফসোস থাকল না। স্বর্গদ্বার পেরোলেই শুরু হয় আরেক পৃথিবী। পাহাড়ের কিনারা ধরে তৈরি পথ একের পর এক নতুন জানালা খুলে দেয়। কোথাও মেঘের সমুদ্র, কোথাও খাড়া খাদ, কোথাও দূরের পাহাড়ের সারি। কোথাও পাথরের পথ, কোথাও কাঠের প্ল্যাটফর্ম, কোথাও নিচে তাকালেই কয়েকশ মিটার গভীর খাদ।

আরও এক দফা লিফট চড়লাম। এবার সঠিকটাতেই। চলে এলাম আপার-স্টেশনে। খানিকটা যেতেই কাচের পথ। পায়ের নিচে স্বচ্ছ কাচ। নিচে গভীর খাদ। প্রথমবার কাচের ওপর পা রাখার মুহূর্তটা অদ্ভুত। চোখ নিচে যায়, মন সাথে সাথে বলে, ‘ওদিকে তাকানোর দরকার নেই’। অথচ মানুষ স্বভাবতই নিষেধ করা জিনিসের দিকেই বেশি তাকায়। এই পাহাড়ে তিনটি কাচ-পথ আছে; পূর্ব লাইন, পশ্চিম লাইন এবং কয়েলিং ড্রাগন ক্লিফ লাইন। ১০০ মিটার দীর্ঘ এবং ১.৬ মিটার প্রশস্ত কয়েলিং ড্রাগনই এরমধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ।

কাঁচপথে হাঁটা এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে

এখানটায় অনেক হাইকিং ট্রেইল আছে। একদিকে গিয়ে অন্যদিকে নেমে আসা যায়। পথ এতটাই নির্দেশিত যে চাইলেও হারানোর উপায় নেই। একেকটা ট্রেইল নিয়ে যায় একেক ভিউপয়েন্টে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো থিয়েনমেন মঠ ও ইউনমেঙ ফেইরি পিক। ১৫১৮.৬০ মিটার উচ্চতার ইউনমেঙ ফেইরি পিকই থিয়েনমেনের শীর্ষবিন্দু।

দিনের আলো কমে আসছে। আমাকেও ফিরতে হবে। পরদিন ভোরে অ্যাভাটার মাউন্টেইন নামে বিখ্যাত পর্বত দেখতে যাব। তাই রাতেই পাড়ি দিতে হবে আরও ঘণ্টাখানেকের পথ। বিপরীত দিক থেকে উঠতে থাকা শিশুদের হাই-ফাইভ দিতে দিতে দুই দফা এলিভেটর পেরিয়ে আবারও নামলাম সিঁড়ির নিচে; এবার জেনেশুনেই। এরপর শাটল বাসে চড়লাম ৯৯ বাঁকের রাস্তা পেরোতে। পাহাড়ের গায়ে ছুরির ফলার মতো সুতীক্ষ্ণ একেকটা বাঁক। প্রতিটা মোড়েই মনে হয়ে এই বুঝি খাদে পড়ে গেলাম! অবশেষে ৪২ নম্বর বাঁকে এসে বুঝলাম এযাত্রায় বেঁচে গেছি। এখান থেকেই শহরে ফিরতে হবে আকাশরথে চড়ে।

ভূগর্ভস্থ এলিভেটর

শরীর ক্লান্ত; তবে মন তৃপ্ত। আকাশরথে চড়ে আকাশ পেরিয়েছি। ৯৯ বাঁকের রাস্তা দেখেছি। ৯৯৯ সিঁড়ি দুবার উঠেছি। স্বর্গের দুয়ারে দাঁড়িয়েছি। পাহাড়ের কিনারা ধরে হেঁটেছি। কাচের ওপর দাঁড়িয়ে দেখেছি অতল শূন্যতা। তবে সব আয়োজনকে ছাপিয়ে মনে রইল সেই স্বর্গদ্বার। আর এর মাঝ দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখা নীল আকাশ।

ছবি: লেখক

Read full story at source