চালকবিহীন ট্যাক্সি এখন বাস্তবতা নাকি বাড়তি ঝুঁকি

· Prothom Alo

রাত তখন সাড়ে ১০টা, যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিন শহরে। সাদমান (ছদ্মনাম) নামের এক প্রবাসী বাংলাদেশি প্রকৌশলী ফোনে একটা অ্যাপ থেকে গাড়ি ডাকলেন, বন্ধুর বাসায় আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন একা। কিছুক্ষণ পর যে গাড়িটা এসে থামল, তাতে নেই কোনো স্টিয়ারিং হুইল, নেই কোনো ব্রেক প্যাডেল, এমনকি সামনের সিটেও নেই কোনো চালক! দুই সিটের ছোট্ট সোনালি রঙের গাড়িটা নিজে থেকেই দরজা খুলল, আর সাদমান উঠে বসলেন এক অচেনা রকমের অস্বস্তি নিয়ে। মনে মনে ভাবলেন, ‘যদি হঠাৎ কিছু ভুল হয়ে যায়, আমি তো কিছুই করতে পারব না ভেতরে বসে।’

Visit moryak.biz for more information.

এটাই টেসলার নতুন সাইবারক্যাব বা চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অস্টিনের রাস্তায় প্রায় হাজারখানেক এমন গাড়ি নামানো হয়েছে বাণিজ্যিকভাবে, যেখানে জরুরি অবস্থায় মানুষ চালকের আসনে বসে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কোনো উপায়ই রাখা হয়নি। পুরো ভরসাটাই এআই সেন্সর আর ক্যামেরার ওপর। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রায় ষোলো লাখ কিলোমিটারের বেশি পথ এরই মধ্যে চালক ছাড়াই পাড়ি দিয়েছে তাদের গাড়িবহর—তাই এই বাণিজ্যিক যাত্রা এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ!

কেন এত দ্রুত এল এই বদল?

গত দেড় বছরে টেসলার স্বচালিত প্রযুক্তি লাখো মাইল পাড়ি দিয়ে ফেলেছে চালক ছাড়াই। প্রতিষ্ঠানের দাবি, তাদের সফটওয়্যার এখন যথেষ্ট পরিণত। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস আর ফ্লোরিডার বেশ কয়েকটি শহরে এরই মধ্যে এই সেবা চালু হয়ে গেছে, আর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোও একই দৌড়ে শামিল—একটি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি সম্প্রতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতি পেয়ে বাণিজ্যিক সেবা শুরু করার শেষ ধাপ পার করেছে। সাধারণ গাড়ির নিরাপত্তা নিয়ম মূলত মানুষচালিত গাড়ির জন্য তৈরি—স্টিয়ারিং, আয়না, প্যাডেল থাকা বাধ্যতামূলক ধরে নিয়ে। সাইবারক্যাব সেই নিয়মকেই ভেঙে নতুন এক নকশা এনেছে, আর প্রতিষ্ঠানটি নিজেই ঘোষণা দিয়েছে, তাদের গাড়ি বিদ্যমান সব নিয়ম মেনেই চলছে, কোনো বিশেষ ছাড়পত্র ছাড়াই।

ঝুঁকিটা কোথায় লুকিয়ে?

• যুক্তরাষ্ট্রের সড়ক নিরাপত্তা সংস্থা এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে, কারণ কোম্পানি নিজেই ঘোষণা দিয়ে এই গাড়িকে নিয়ম মেনে চলার সনদ দিয়েছে, কোনো যাচাই ছাড়াই।
• জরুরি পরিস্থিতিতে গাড়ির ভেতরে বসে থাকা যাত্রীর হাতে কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই, পুরোটাই নির্ভর করছে সফটওয়্যারের সিদ্ধান্তের ওপর।
• আগের পরীক্ষামূলক পর্যায়ে একই ধরনের গাড়ি ভুল লেনে চলে যাওয়া, হঠাৎ ব্রেক করা কিংবা মাঝরাস্তায় থমকে দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিল, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরালও হয়েছিল।
• ঘোষণার দিনই বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতির লক্ষণ দেখা গেছে শেয়ারবাজারে, প্রায় ৬ শতাংশ দরপতন হয়েছিল এক দিনেই, যা বলে দেয় প্রযুক্তির দাবি আর বাস্তব আস্থার মধ্যে এখনো বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে।
• এখন পর্যন্ত এই সেবা সীমিত একটা এলাকায়, নির্দিষ্ট আবহাওয়া আর সড়ক পরিস্থিতিতেই চালু আছে। ফলে বাস্তব দুনিয়ার সব রকম চ্যালেঞ্জ এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত নয়। চোখে দেখাই এখন আর নিরাপত্তার প্রমাণ নয়। প্রযুক্তি এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার যাচাই-বাছাই তার চেয়ে পিছিয়ে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা আসলে কী খতিয়ে দেখছে?

মার্কিন সড়ক নিরাপত্তা সংস্থার এই তদন্তকে বলা হচ্ছে অডিট কোয়েরি, অর্থাৎ প্রথমে তারা নিশ্চিত করবে যে প্রতিষ্ঠানটি নিজে থেকে যে প্রক্রিয়ায় গাড়িকে নিরাপদ ঘোষণা করেছে, সেই প্রক্রিয়াটাই আদৌ সঠিক পদ্ধতিতে হয়েছে কি না। সাধারণত গাড়ি নির্মাতারা নিজেরাই নিজেদের গাড়ি নিয়ম মেনে চলার সনদ দেয়, কোনো তৃতীয় পক্ষের নিরপেক্ষ পরীক্ষা ছাড়াই—এটাই প্রচলিত রীতি। কিন্তু স্টিয়ারিং হুইল বা ব্রেক প্যাডেলবিহীন গাড়ির ক্ষেত্রে এই পুরোনো নিয়মটাই এখন প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, সেই নিয়মগুলো তৈরি হয়েছিল মানুষচালিত গাড়ির কথা মাথায় রেখে। এই তদন্তের ফলাফল শুধু টেসলার জন্য নয়, ভবিষ্যতে আসা সব চালকবিহীন গাড়ির জন্যই একটা দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যাত্রী হিসেবে কী করবেন?

* যেকোনো নতুন চালকবিহীন সেবায় প্রথমবার চড়ার আগে জেনে নিন, সেটি কোন শহরে, কোন এলাকায় চলাচলের অনুমতি পেয়েছে। পুরোপুরি খোলা রাস্তায় নাকি সীমিত এলাকায়।
* জরুরি অবস্থায় যাত্রীর করণীয় কী, তা আগেই অ্যাপে দেখে রাখুন। সাধারণত একটা জরুরি স্টপ বোতাম থাকে, আর কাস্টমার সাপোর্টের সরাসরি যোগাযোগের উপায়ও জেনে রাখুন।
* খারাপ আবহাওয়া বা রাতের বেলা প্রথম কয়েক মাস এই ধরনের সেবা এড়িয়ে চলাই বিচক্ষণতার কাজ, যতক্ষণ না স্বাধীন তদন্তের ফলাফল প্রকাশ পায়।
* এই ধরনের প্রযুক্তি বাংলাদেশের মতো দেশে আসতে হয়তো এখনো অনেক বছর বাকি, কিন্তু সড়ক আইন আর প্রযুক্তির সমন্বয়ের এই বিতর্কটা আমাদের দেশেও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সেই রাতে সাদমানের যাত্রা নির্বিঘ্নেই শেষ হলো, তবে নামার সময় তিনি খেয়াল করলেন, গাড়িটা একটা মোড়ে এসে কয়েক সেকেন্ড অস্বাভাবিক রকম ইতস্তত করছিল। বাসায় ফিরে বন্ধুদের গ্রুপে লিখলেন, ‘প্রযুক্তিটা মুগ্ধ করার মতো, কিন্তু ভরসা করাটা এখনই অত সহজ নয়।’
তাহলে চালকবিহীন গাড়ি কি ভবিষ্যতের সমাধান, নাকি তাড়াহুড়া করে নামানো ঝুঁকি?

লেখক: টেক ব্লগার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর

Read full story at source