ইতিহাসে প্রথম মৌল আবিষ্কার হয়েছিল কীভাবে
· Prothom Alo

তুমি কখনো কেক বানিয়েছ? একটা সুস্বাদু কেক বানাতে কী কী লাগে? ময়দা, ডিম, চিনি, মাখন আর একটুখানি বেকিং পাউডার। এই কয়েকটা জিনিস ঠিকমতো মেশালেই দারুণ স্বাদের কেক তৈরি হয়ে যায়। এখন একটা প্রশ্ন করি। আমাদের এই বিশাল পৃথিবী, তুমি, আমি, তোমার পড়ার টেবিল, কিংবা রাতের আকাশের ওই মিটমিট করে জ্বলা তারাগুলো কী দিয়ে তৈরি? এসবেরও কি এমন কোনো উপাদান আছে, যা মিশিয়ে এই সবকিছু তৈরি হয়েছে?
Visit casino-promo.biz for more information.
হ্যাঁ, আছে! আমাদের চারপাশের সবকিছুই একধরনের উপাদান দিয়ে তৈরি। বিজ্ঞানের ভাষায় এই উপাদানগুলোকে বলা হয় এলিমেন্ট। বাংলায় আমরা বলি মৌল। সোনা, রুপা, লোহা, অক্সিজেন একেকটা মৌল। এগুলো প্রকৃতির লেগো ব্লকের মতো। লেগো ব্লকজুড়ে যেমন বিশাল দুর্গ বানানো যায়, তেমনি বিভিন্ন মৌলজুড়ে তৈরি হয়েছে আমাদের এই পৃথিবী। রসায়নবিদেরা নতুন নতুন মৌল আবিষ্কারের জন্য যুগ যুগ ধরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন। এই এলিমেন্টগুলোকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখার জন্য তৈরি হয়েছে পর্যায় সারণি। তবে এই টেবিল শুধু একটা সাধারণ তালিকা নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত জাদুকরি নকশা। এই নকশা থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, কোন মৌলের স্বভাব কেমন এবং অন্য কোনো মৌলের কাছাকাছি এলে সে কেমন আচরণ করবে। চলো, মৌল আবিষ্কারের এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর গল্প দিয়ে এই যাত্রা শুরু করা যাক।
মহাবিশ্ব কী দিয়ে তৈরি?প্রস্রাব থেকে প্রথম মৌল
সপ্তদশ শতাব্দীর কথা। হেনিগ ব্রান্ড নামের এক জার্মান লোক ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন আলকেমিস্ট। প্রাচীনকালের রসায়নবিদদের আলকেমিস্ট বলা হয়। তবে আলকেমিস্টরা রসায়নবিদ নন, বরং নিজের আখের গোছানোর জন্যই কাজ করছিলেন। হেনিগ ব্রান্ডও তেমনই একজন আলকেমিস্ট। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন খুব লোভী। তিনি সব সময় শুধু টাকা চাইতেন। এককথায় যাকে বলে যায় গোল্ড ডিগার। এই হেনিগের শখ ছিল পরশপাথর খুঁজে বের করা। ইংরেজিতে একে বলে ফিলোসফার্স স্টোন। এটা কোনো সাধারণ পাথর নয়। আলকেমিস্টদের বিশ্বাস ছিল, এই পাথরের ছোঁয়া লাগলে লোহা বা সিসার মতো সস্তা ধাতব জিনিসও দামি সোনা হয়ে যায়! আলকেমিস্টদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই পরশপাথর তৈরি করা। তারপর গল্পের সেই রাজার মতো, যা ছুঁয়ে দেবেন তা–ই সোনা হয়ে যাবে!
যা–ই হোক, এই জাদুর পাথর খোঁজার জন্য তো অনেক টাকা দরকার। চাকরি করে সেই টাকা জোগানো সম্ভব নয়। তাই হেনিগ সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিলেন। এরপর এক বড়লোকের মেয়েকে বিয়ে করলেন। স্ত্রীর সব টাকা দিয়ে তিনি পরশপাথর খোঁজার পরীক্ষা শুরু করলেন। কিছুদিন পর তাঁর প্রথম স্ত্রী মারা যান। হেনিগের ব্যবসায় লালবাত্তি। মানে পরশপাথর তৈরির পরীক্ষা বন্ধ হওয়ার জোগাড়। কিন্তু হেনিগ অন্য ধাতুতে তৈরি। তিনি এত সহজে দমে গেলেন না! তিনি টাকার জন্য আবার বিয়ে করেন। এবার নতুন স্ত্রীর টাকা দিয়ে একই কায়দায় পরীক্ষা চালিয়ে যান।
হঠাৎ একদিন হেনিগ ব্রান্ডের মাথায় এক অদ্ভুত বুদ্ধি খেলে গেল। হেনিগ ভাবলেন, মানুষের শরীরের ভেতরে নানা রকম তরল পদার্থ থাকে। সেখান থেকেই হয়তো জাদুর পাথর বানানো সম্ভব! এই চিন্তা থেকে তিনি এক ভয়াবহ কাণ্ড করে বসলেন। তিনি প্রায় ১ হাজার ৫০০ গ্যালন মানুষের প্রস্রাব জোগাড় করলেন! ভাবতে পারো? ১ হাজার ৫০০ গ্যালন মানে প্রায় ৬ হাজার লিটার প্রস্রাব!
এরপর ১৬৬৯ সালে হেনিগ বিশাল সব পাত্রে সেই প্রস্রাব ফুটিয়ে আলাদা করার কাজ শুরু করলেন। দিনের পর দিন এই অদ্ভুত আর দুর্গন্ধযুক্ত কাজ করে তিনি পরশপাথর তো পেলেন না। কিন্তু দারুণ একটা জিনিস পেয়ে গেলেন। তিনি প্রস্রাব থেকে এমন একটা জিনিস আলাদা করলেন, যা অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে!
হেনিগ এর নাম দিলেন কোল্ড ফায়ার। হেনিগ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি, তিনি আসলে কী আবিষ্কার করেছেন। প্রস্রাব ফুটিয়ে তিনি রসায়নের ইতিহাসের প্রথম মৌলটি আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন! এই জ্বলজ্বলে মৌলটির নাম ফসফরাস। এই ফসফরাস কিন্তু খুব ভয়ংকর একটা রাসায়নিক জিনিস। এটি বিষাক্ত নার্ভ গ্যাস বানানোর কাজে ব্যবহার করা হয়।
তোমরা হয়তো অন্ধকারে জ্বলে এমন খেলনা দেখেছ। আধুনিক অনেক খেলনাতেও এই ফসফরাসের বৈশিষ্ট্য কাজে লাগানো হয়। আলকেমিস্টরা সোনা বানাতে গিয়ে ব্যর্থ হলেও, তাঁদের এই পাগলাটে পরীক্ষা-নিরীক্ষার হাত ধরেই আধুনিক রসায়নের জন্ম হয়েছিল। তাঁরাই প্রথম ল্যাবরেটরির অনেক যন্ত্রপাতি এবং রাসায়নিক প্রক্রিয়ার উদ্ভাবন করেছিলেন।
তবে ফসফরাসকে একটি আলাদা মৌল হিসেবে স্বীকৃতি পেতে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। হেনিগের আবিষ্কারের অনেক বছর পর, ১৭৭০-এর দশকে ফসফরাসকে একটি নতুন মৌল হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। তত দিনে রসায়নের জগতে একটা পাগলামি শুরু হয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা চারদিক থেকে নতুন নতুন মৌল আবিষ্কার করতে লাগলেন। মাত্র ১০ বছরের মধ্যে বিজ্ঞানীরা অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ক্লোরিন এবং ম্যাঙ্গানিজ নামের মৌলগুলো আলাদা করে ফেললেন।
হেনিগের ওই আবিষ্কারের ঠিক দুই শতাব্দী পর, ১৮৬৯ সালে দিমিত্রি মেন্ডেলিভ নামের এক রুশ বিজ্ঞানী দারুণ একটা কাজ করলেন। তিনি আবিষ্কৃত সব মৌলকে সাজিয়ে একটা চমৎকার ছক বানালেন। এর নাম দিলেন পিরিওডিক টেবিল। একেই আমরা বলি পর্যায় সারণি। এই ছকে হেনিগের সেই ফসফরাস তার সঠিক জায়গা খুঁজে পেল। ফসফরাসের জায়গা হলো সিলিকন ও সালফারের ঠিক মাঝখানে।
জিলাপির মোড়কে খাঁটি সোনা, মহামূল্যবান এই ধাতুটি কেন এত নরম ও নমনীয়মৌল আবিষ্কারের হিড়িক
মৌলদের এই পর্যায় সারণিতে গেলে তুমি কোনো মৌলের পুরো নাম দেখতে পাবে না। সেখানে শুধু ইংরেজি অক্ষর দেওয়া থাকে। কিছু অক্ষর দেখলে তুমি সহজেই নাম বুঝতে পারবে। যেমন, সিলিকনের জন্য লেখা থাকে Si।
কিন্তু কিছু অক্ষর দেখলে তোমার মাথা চুলকাতে ইচ্ছা করবে! যেমন টাংস্টেন মৌলটির জন্য লেখা থাকে W। টাংস্টেনের বানানে তো কোথাও W নেই! তাহলে এমন কেন? কারণ, এই অক্ষরগুলো অনেক সময় মৌলটির খুব পুরোনো বা প্রাচীন নাম থেকে নেওয়া হয়। টাংস্টেনের পুরোনো নাম ছিল উলফ্রাম (Wolfram)। সেখান থেকেই W নেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি অক্ষরের ওপরে এবং নিচে কিছু সংখ্যা লেখা থাকে। ওপরের সংখ্যাটিকে বলে ভর সংখ্যা। একটি মৌলের নিউক্লিয়াসের ভেতর প্রোটন এবং নিউট্রনের মোট সংখ্যাই হলো এই ভর সংখ্যা। প্রোটন ও নিউট্রনকে একসঙ্গে বলে নিউক্লিয়ন। ভর সংখ্যা দিয়ে এই নিউক্লিয়নের হিসাব বোঝানো হয়। আর অক্ষরের নিচের সংখ্যাটিকে বলে পারমাণবিক সংখ্যা বা প্রোটন সংখ্যা।
প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন হলো মৌলের ভেতরের মূল তিনটি কণা। নিউক্লিয়াস হলো অ্যাটমের একেবারে কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে প্রোটন ও নিউট্রন একসঙ্গে জড়াজড়ি করে বসে থাকে। আর ইলেকট্রনগুলো সেই কেন্দ্রকে ঘিরে দূর থেকে ঘুরতে থাকে। সূর্যকে ঘিরে গ্রহগুলো যেমন ঘোরে, অনেকটা তেমন!
মিথেন: ধরা–ছোঁয়া যায় না, তবে মানুষের পরম বন্ধুমৌল আসলে কী
আগের লেখায় আমরা পরমাণু নিয়ে অনেক কথা বলেছিলাম। সেই লেখাটা পড়া না থাকলে এখান থেকে পড়তে পারো: পরমাণু কী, কেন, কীভাবে। পরমাণুর লেখাটা পড়ার পরে তোমার মনে একটা খটকা লাগতে পারে। মৌল আর পরমাণুর মধ্যে আসল পার্থক্য কী? পার্থক্যটা আসলে খুব সোজা।
ধরো, তোমার কাছে এক বালতি লাল রঙের লেগো ব্লক আছে। এখানে একটা ছোট্ট লাল ব্লক হলো একটা পরমাণু। এটি হলো সবচেয়ে ছোট একক। আর এই একই রকম লাল ব্লকের পুরো বালতিটা হলো একটা মৌল। মৌল হলো যেকোনো পরিমাণের একটি নির্দিষ্ট পদার্থ।
প্রাচীনকালে বিজ্ঞান এত উন্নত ছিল না। মানুষ ভাবত, পৃথিবীর সবকিছু মাত্র চারটি জিনিস দিয়ে তৈরি। আগুন, বাতাস, পানি এবং মাটি। তাদের ধারণা ছিল, এই চারটি জিনিস মিশিয়েই দুনিয়ার সবকিছু বানানো সম্ভব।
কিন্তু আকাশের ওই তারাগুলো কী দিয়ে তৈরি? তারা তো আর মাটি বা পানি দিয়ে তৈরি হতে পারে না! তখন বিখ্যাত দার্শনিক অ্যারিস্টটল একটা নতুন কথা বললেন। তিনি বললেন, তারাগুলো তৈরি হয়েছে ইথার নামে এক রহস্যময় উপাদান দিয়ে। মৌল শব্দটির ইংরেজি এলিমেন্ট। এই শব্দটি এসেছে লাতিন ভাষার এলিমেন্টাম শব্দ থেকে। এর মানে ‘সবচেয়ে আদি রূপ’।
হেনিগের আবিষ্কৃত সেই কঠিন ফসফরাসের দলাটি হলো একটি মৌল। এর ভেতরে থাকা কোটি কোটি ছোট কণা হলো ফসফরাসের পরমাণু।
তবে একটা দারুণ মজার ব্যাপার আছে। একই মৌলের সব টুকরা কিন্তু দেখতে এক রকম হয় না। ফসফরাসের পরমাণুগুলো ভেতরে কীভাবে সাজানো আছে, তার ওপর নির্ভর করে এর বাইরের চেহারা বদলে যায়।
পরমাণুর সাজানোর ধরন পাল্টে গেলে ফসফরাস দেখতে সাদা, কালো, লাল বা বেগুনি রঙের হতে পারে! শুধু রং নয়, এদের স্বভাবও বদলে যায়। সাদা ফসফরাস প্রচণ্ড গরমের দিনে সাধারণ রোদে রাখলেই গলে যায়। কিন্তু কালো ফসফরাস গলাতে হলে অনেক খাটনি করতে হবে। কালো ফসফরাসকে চুলায় ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় গরম করতে হবে! কী অবাক ব্যাপার, তাই না? অথচ সাদা ও কালো উভয় ফসফরাসই কিন্তু একই ধরনের পরমাণু দিয়ে তৈরি। দুটি পরমাণুর ভেতরেই ঠিক ১৫টি প্রোটন ও ১৫টি ইলেকট্রন আছে। শুধু ভেতরের পরমাণুগুলোর একটু এদিক-সেদিক করে সাজানোর কারণেই এমন বিশাল পার্থক্য তৈরি হয়।
বাস্তব জীবনে এর সবচেয়ে চমৎকার উদাহরণ হলো কার্বন। তোমরা খাতায় যে পেনসিল দিয়ে লেখো, তার ভেতরে কালো রঙের একটা জিনিস থাকে। ওটাকে বলে গ্রাফাইট। এটাও একধরনের কার্বন। আবার বিশাল দামি হীরার আংটির হীরাও কিন্তু সেই একই কার্বন দিয়ে তৈরি! কার্বনের পরমাণুগুলো একভাবে সাজালে হয় নরম কালচে গ্রাফাইট আর অন্যভাবে সাজালে হয় পৃথিবীর অন্যতম কঠিন পদার্থ হীরা। লেগো ব্লক দিয়ে যেমন তুমি চাইলে একটা সুন্দর বাড়ি বানাতে পারো, আবার ব্লকগুলো খুলে একটা গাড়িও বানিয়ে ফেলতে পারো। পরমাণুও ঠিক তেমনি!
মানবদেহের মূল্য কতপর্যায় সারণির গুপ্ত রহস্য
পর্যায় সারণি প্রথমবার দেখলে তোমার কাছে একটু অদ্ভুত লাগতে পারে। মনে হতে পারে, এটা যেন টেট্রিস গেমের একটা বোর্ড। কিছু ব্লক যেন এখনো ঠিকমতো নিচে নামেনি। দেখে মনে হবে, ছকটাকে একটু গোছগাছ করা দরকার।
কিন্তু আসলে এটা চমৎকারভাবে গোছানো একটা ছক। বিজ্ঞানের যেকোনো ছাত্র এই ছকের দিকে তাকালেই নিজের দরকারি জিনিসটা চট করে খুঁজে পান। কারণ, রুশ বিজ্ঞানী মেন্ডেলিভ খুব বুদ্ধি করে এই ছক বানিয়েছেন। এর ভেতরে অনেক লুকানো নকশা আছে। মৌলদের পরমাণুর গঠন ও স্বভাবের ওপর ভিত্তি করে এগুলো সাজানো হয়েছে।
ছকের সারিগুলোতে মৌলগুলোকে তাদের প্রোটন সংখ্যা অনুযায়ী ছোট থেকে বড় হিসেবে পর পর সাজানো হয়েছে। মেন্ডেলিভের সবচেয়ে বড় বুদ্ধির জায়গাটা ছিল অন্যখানে। তিনি খেয়াল করলেন, পারমাণবিক সংখ্যা বাড়তে থাকলে একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর মৌলগুলোর স্বভাব আবার আগের মতো মিলে যায়। যখনই স্বভাব মিলে যেত, তিনি সারিটা ঘুরিয়ে নতুন লাইনে চলে আসতেন।
এই কারণেই ছকের কলামগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। একই কলামে থাকা মৌলগুলোর স্বভাব প্রায় একই রকম হয়। যেমন ধরো, ছকের একেবারে ডান দিকের শেষ কলামে আছে হিলিয়াম থেকে শুরু করে রেডন পর্যন্ত মৌল। এদের বলা হয় নিষ্ক্রিয় গ্যাস। স্বাভাবিক অবস্থায় এদের কোনো রং থাকে না। আর এরা প্রচণ্ড অলস! অন্য কোনো মৌলের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করতে এদের একদম ভালো লাগে না। নিয়ন গ্যাস এতই অলস যে তাকে কোনোভাবেই অন্য কোনো মৌলের সঙ্গে মেশানো যায় না।
কেন এরা এমন অলস? কারণটা লুকিয়ে আছে এদের ইলেকট্রনের ভেতরে। যেকোনো পরমাণুর ভেতরে ইলেকট্রনগুলো পেঁয়াজের খোসার মতো স্তরে স্তরে সাজানো থাকে। একেকটি স্তরে নির্দিষ্ট সংখ্যার ইলেকট্রন থাকতে পারে। একটি স্তর পুরোপুরি ভরে গেলে, নতুন ইলেকট্রনগুলো তার বাইরের নতুন স্তরে গিয়ে বসতে শুরু করে। পারমাণবিক সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৌলগুলোর ইলেকট্রন সংখ্যাও বাড়ে। ফলে একেক মৌলে ইলেকট্রন সাজানোর ধরন একেক রকম হয়।
নিষ্ক্রিয় বা অলস গ্যাসগুলোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এদের একদম বাইরের স্তরটা ইলেকট্রন দিয়ে কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। ধরো, তুমি পেট ভরে তোমার প্রিয় বিরিয়ানি খেয়েছ। পেটে আর একটুও জায়গা নেই। এরপর কি তুমি আরেকটু কাচ্চি খেতে চাইবে? একদম না! তুমি তখন চুপচাপ শুয়ে বিশ্রাম নিতে চাইবে। নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলোর অবস্থাও ঠিক এমন। এদের বাইরের স্তর ইলেকট্রন দিয়ে পুরোপুরি ভরা থাকে বলে এরা খুব শান্ত ও স্থিতিশীল থাকে। ইলেকট্রনগুলোকে কোনোভাবেই লোভ দেখিয়ে কাজে লাগানো যায় না।
জার্মেনিয়াম নামের একটি মৌল আবিষ্কার করেছিলেন বিজ্ঞানী ক্লেমেন্স আলেকজান্ডার উইঙ্কলার। তিনি বলেছিলেন, ‘রাসায়নিক বিক্রিয়ার জগৎটা একটা মঞ্চের মতো...মৌলগুলো হলো এখানকার অভিনেতা।’
পর্যায় সারণিতে এমন আরও অনেক প্যাটার্ন আছে। তুমি যদি ছকের বাঁ দিক থেকে ডান দিকে যাও, কিংবা নিচ থেকে ওপরের দিকে ওঠো, তবে দেখবে মৌলের পরমাণু থেকে একটা ইলেকট্রন চুরি করে নেওয়া আস্তে আস্তে কঠিন হয়ে যায়। এর জন্য অনেক বেশি শক্তি খরচ করতে হয়। ছকের মাঝখানের জায়গাটা দখল করে রেখেছে ধাতব মৌলগুলো। তুমি ছকের যত বেশি বাঁ দিকের কোনায় যাবে, মৌলগুলো তত বেশি ধাতুর মতো আচরণ করবে। বিজ্ঞানীরা এই প্যাটার্নগুলো বুঝেই আগে থেকে বলে দিতে পারেন, কোন মৌল কার সঙ্গে কেমন আচরণ করবে।
৪০০ কোটি বছরের পুরোনো পানিসুপার হেভিওয়েট মৌলের খোঁজে
বক্সিং বা কুস্তি খেলার সঙ্গে রসায়নের একটা দারুণ মিল আছে। বক্সিংয়ে যেমন খুব ভারী ও শক্তিশালী সুপার হেভিওয়েট খেলোয়াড় থাকে, মৌলদের জগতেও ঠিক তেমন সুপার হেভিওয়েট মৌল আছে।
ছকের একদম ওপরের দিকে থাকে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মতো একদম হালকা মৌলরা। এদের ওজন একদম কম। হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের পরমাণু মিলিয়ে প্রোটন আছে মাত্র তিনটি!
আর ছকের একদম নিচের দিকের সারিগুলোতে থাকে খুব ভারী সব মৌল। পারমাণবিক ভারের কারণে এরা ছকের নিচে ডুবে আছে। নতুন নতুন ভারী মৌল আবিষ্কারের কারণে বছরের পর বছর ধরে এই ছকটি বড় হয়েছে।
প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায়, এমন মৌলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভারী হলো ইউরেনিয়াম। পর্যায় সারণিতে এর নম্বর ৯২। এই ইউরেনিয়াম একটি তেজস্ক্রিয় মৌল। ইউরেনিয়াম যখন প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয় হতে থাকে, তখন সেখান থেকে প্লুটোনিয়াম নামে আরেকটি মৌল তৈরি হয়। কিন্তু প্রকৃতিতে এর পরিমাণ এতই কম যে তা ধরাই যায় না।
প্লুটোনিয়াম নামে মৌলটি প্রথম আবিষ্কার করা হয়েছিল একটি পারমাণবিক চুল্লির ভেতরে। এর চেয়েও ভারী যেসব সুপার হেভিওয়েট মৌল আছে, সেগুলো বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে তৈরি করেন। বিশাল আকৃতির পার্টিকেল অ্যাক্সেলারেটর নামের যন্ত্রে পরমাণুদের মধ্যে প্রচণ্ড বেগে ধাক্কা লাগিয়ে এই ভারী মৌলগুলো বানানো হয়।
তবে নতুন মৌল খোঁজার কাজ এখনো শেষ হয়নি। বিজ্ঞানীরা নিয়মিত চেষ্টা করে যাচ্ছেন আরও নতুন মৌল খুঁজে বের করতে। মেন্ডেলিভের পর্যায় সারণিতে এখনো কিছু ঘর ফাঁকা আছে যে! তবে একটা কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, মানুষের প্রস্রাব ফুটিয়ে মৌল আবিষ্কার করার চেয়ে এখনকার কাজটা অনেক বেশি জটিল এবং আধুনিক!
মানুষের শরীরে কী কী মৌল আছেএকনজরে মৌল আবিষ্কারের ইতিহাস
১৬৬৯ সাল: রাসায়নিক পরীক্ষার সাহায্যে প্রথম মৌল ফসফরাস আবিষ্কার হয়।
১৮৬৯ সাল: রুশ বিজ্ঞানী দিমিত্রি মেন্ডেলিভ তাঁর বিখ্যাত পর্যায় সারণির প্রথম রূপ প্রকাশ করেন।
১৯১৩ সাল: হেনরি মোসলে পরমাণুর পারমাণবিক সংখ্যা দিয়ে মৌলদের সংজ্ঞায়িত করেন।
১৯৩৭ সাল: মানুষের তৈরি করা প্রথম কৃত্রিম মৌল টেকনেটিয়াম বানানো হয়।
২০০০ সাল: রুশ বিজ্ঞানীরা লিভারমোরিয়াম নামে অতি ভারী মৌল তৈরি করেন।
২০১০ সাল: ১১৭ প্রোটন যুক্ত নতুন একটি মৌল আবিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। একে বলা হতো আনআনসেপ্টিয়াম।
২০১৬ সাল: ১১৮ নম্বর মৌল হিসেবে ওগানেসন পর্যায় সারণিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে ভারী মৌল এটিই।
মাছের নাম কেন ‘ভূত মাছ’