এক জেলাতেই ৭১০ কোটি টাকার সুপারি, যেখানে শ্রমিকের আয় দিনে আড়াই হাজার
· Prothom Alo

সড়কে কিছু দূর পরপর সুপারির বিশাল স্তূপ। ক্রেতারা এক স্তূপ থেকে অন্য স্তূপে গিয়ে সুপারি দেখছেন। দরদামে মিললেই সুপারি কিনে ভরছেন বস্তা কিংবা ঝাঁকায়। এরপর যানবাহনে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন দূরদূরান্তে।
Visit mchezo.co.za for more information.
সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেহমনী এলাকার সুপারির বাজারের সুপারিবাজারে গিয়ে দেখা যায় এমন চিত্র। জানা গেল, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা গ্রামের ছোট হাটে গিয়ে সুপারি কিনে এনে বাজারটিতে বিক্রি করেন। বাজারের ক্রেতারা সবাই জেলার বাইরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকার।
অবশ্য বাজারটি কেবল নয়, লক্ষ্মীপুরের শতাধিক হাটবাজারই এখন এভাবে দিনরাত মুখর সুপারি ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, চলতি মৌসুমে লক্ষ্মীপুরে প্রায় ৭১০ কোটি টাকার সুপারি বেচাকেনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সরেজমিনে লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেহমনী বাজারের একাধিক বিক্রেতার সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানান, সপ্তাহে দুই দিন বাজারটিতে সুপারি কেনাবেচা হয়। পণ ও কাউন হিসেবে সুপারি বিক্রি করেন তাঁরা। বাজারের সুপারি বিক্রেতা নজরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে প্রতি পণ (৮০টি) পাকা সুপারি ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কাউন (১ হাজার ২৮০টি) বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায়। প্রতি সপ্তাহে শুধু তেহমনী বাজারেই এক থেকে দেড় কোটি টাকার সুপারি কেনাবেচা হয়।
জমজমাট বেচাকেনা
জেলার অন্যতম সুপারির বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে রায়পুর উপজেলার হায়দাগঞ্জ, আলিয়া মাদ্রাসা এলাকা, বাসাবাড়ি, দেনায়েতপুর, খাসেরহাট, মোল্লারহাট ও মীরগঞ্জ। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর সদরের দালাল বাজার, রসুলগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, মান্দারী, দত্তপাড়া ও জকসি এবং রামগঞ্জের উপজেলা শহর, সোনাপুর, কাঞ্চনপুর ও করপাড়া বাজারেও সুপারির বেচাকেনা হয়। মৌসুমে এসব বাজারে বাগানমালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সুপারি নিয়ে আসেন। তাঁদের কাছ থেকে সুপারি কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
দুই যুগ ধরে লক্ষ্মীপুরে সুপারির ব্যবসা করছেন রায়পুর উপজেলার রাখালিয়া গ্রামের মোখলেছুর রহমান। তিনি লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন হাটবাজারের খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুপারি কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেন।
মোখলেছুর রহমান বলেন, সুপারির মৌসুমে কেনাবেচা বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের ব্যস্ততাও বাড়ে। স্থানীয় বাজার থেকে সুপারি সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা অনুযায়ী পাঠানো হয়। প্রতিবছর তাঁর হাত ধরেই ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে দাবি মোখলেছুরের।
বিক্রেতা ও চাষিরা জানান, সুপারি তিনভাবে বিক্রি হয়। এখন মূলত পাকা সুপারি বিক্রি হচ্ছে। এর বাইরে ভেজানো সুপারি ও শুকনা সুপারি বিক্রি করা হয়। লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সুপারির বড় একটি অংশই ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয়।
বিক্রেতা ও চাষিরা জানান, সুপারি তিনভাবে বিক্রি হয়। এখন মূলত পাকা সুপারি বিক্রি হচ্ছে। এর বাইরে ভেজানো সুপারি ও শুকনা সুপারি বিক্রি করা হয়। লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সুপারির বড় একটি অংশই ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নদী-নালা, খাল-ডোবা, পুকুর ও পানিভর্তি পাকা চৌবাচ্চায় সুপারি ভিজিয়ে রাখেন। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত সুপারির প্রায় ৬০ শতাংশ এভাবে ভিজিয়ে রাখা হয়। বাকি ৪০ শতাংশ কাঁচা এবং রোদে শুকিয়ে বিক্রি করা হয়ে থাকে।
রায়পুরের চর মোহনা গ্রামের কৃষক মফিজ উদ্দিন বলেন, নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বাগানের সুপারি পেকে যায়। ওই সময় ভেজানো সুপারির মজুতদারেরা জোটবদ্ধ হয়ে বাজার থেকে সুপারি কেনেন। কেনা সুপারির বড় অংশ পানিতে ভিজিয়ে রাখেন। কৃষকদের বিক্রি শেষ হয়ে গেলে জানুয়ারি-মার্চ মাসে বাজারে সুপারির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। তখনই মূলত ভেজানো সুপারি বেশি বিক্রি হয়।
বিক্রির জন্য রাখা সুপারিসুপারি পেড়েই দিনে আয় আড়াই হাজার টাকা
সুপারির মৌসুমে শুধু বাগানমালিক বা ব্যবসায়ীরা নন, আয় করেন গাছ থেকে সুপারি পাড়ার শ্রমিকেরাও। সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন, ভেজানো ও শুকানোর কাজেও যুক্ত থাকেন অনেকে। তাঁদের ভালো আয় হয়।
২০ বছর ধরে লক্ষ্মীপুরে গাছ থেকে সুপারি পাড়ার কাজ করছেন রায়পুরের কেরোয়া এলাকার রুবেল হোসেন। তিনি বলেন, প্রতিটি গাছ থেকে সুপারি পেড়ে ১০ টাকা করে পান তিনি। মৌসুমে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০টি গাছে উঠে সুপারি পাড়েন তিনি। এতে দৈনিক আয় হয় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা।
রুবেল হোসেন আরও বলেন, একটি গাছ থেকে দুই থেকে তিনবার সুপারি পাওয়া যায়। সুপারি পাড়ার মৌসুমে আয় ভালো হয়, যা দিয়ে পরিবারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি কিছু টাকা সঞ্চয়ও করা সম্ভব হয়।
জহির আহমেদ, উপপরিচালক, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস সুপারি সংগ্রহের প্রধান সময়। এ সময় উৎপাদন ও বাজারজাতকরণকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুরের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আসে। সুপারির বাজার ভালো থাকলে কৃষকের আয় বাড়ে, পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ উপকৃত হন।এক গাছে ফলন ৩০ বছর, বাড়ছে চাষ
কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা জানান, লক্ষ্মীপুরের মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। একবার সুপারি চারা রোপণ করলে উপযুক্ত পরিবেশে দীর্ঘদিন ফলন পাওয়া যায়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একটি সুপারিগাছ থেকে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ফলন পাওয়া সম্ভব। ফলে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎস হিসেবে সুপারি চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।
এক জেলাতেই ৭১০ কোটি টাকার সুপারি, যেখানে শ্রমিকের আয় দিনে আড়াই হাজারকৃষি কর্মকর্তারা জানান, ভালো দাম পাওয়ার আশায় লক্ষ্মীপুরে নতুন করে সুপারির বাগান করতে আগ্রহী হচ্ছেন অনেক কৃষক। লক্ষ্মীপুরে গত বছর ৭ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে সুপারিবাগান ছিল। বর্তমানে বাগানের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর। গতবার উৎপাদন হয়েছে ৪২ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন সুপারি। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস সুপারি সংগ্রহের প্রধান সময়। এ সময় উৎপাদন ও বাজারজাতকরণকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুরের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আসে। সুপারির বাজার ভালো থাকলে কৃষকের আয় বাড়ে, পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ উপকৃত হন।’
জহির আহমেদ বলেন, ‘লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সুপারির অর্ধেকের বেশি আসে রায়পুর উপজেলা থেকে। এরপরই লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার অবস্থান। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর পাকা, শুকনা ও ভেজানো মিলিয়ে প্রায় ৭১০ কোটি টাকার সুপারি বিক্রি করতে পারবেন কৃষকেরা।’