ইলিশের নামে চলা চন্দনা ও সুরমা মাছ কীভাবে চিনব

· Prothom Alo

ধরো, তুমি হোটেলে খেতে গেছ। প্লেটে রুপালি মাছ ভাজা এসেছে। হোটেলের মালিক হাসিমুখে বললেন, ‘এটা চন্দনা ইলিশ।’ পাশের টেবিলে আরেকজনকে মাছ পরিবেশন করে বলা হলো, ‘এটা সুরমা ইলিশ।’ দুটো মাছের নামেই ইলিশ আছে। কিন্তু সত্যিই কি এগুলো ইলিশ? না। চন্দনা ইলিশের আত্মীয় হলেও ইলিশ নয়। আর সুরমার সঙ্গে ইলিশের কোনো সম্পর্কই নেই। তবু অনেক সময় এই দুই মাছকে ইলিশ বলে বিক্রি করা হয়।

আগে আসল ইলিশকে চিনে নেওয়া দরকার। ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Tenualosa ilisha। মাছটি মূলত সাগরে থাকে। ডিম পাড়ার সময় হলে ঝাঁক বেঁধে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও সুন্দরবনের নদীতে আসে। ডিম ফুটে জন্ম নেওয়া ইলিশের বাচ্চাকে বলা হয় জাটকা। একটু বড় হলে জাটকা আবার সাগরে ফিরে যায়। ফেরার পথে অনেক ইলিশ জেলেদের জালে ধরা পড়ে। ২০১৭ সালে ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। পৃথিবীর মোট ইলিশের প্রায় ৬৫ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে ৫৮ দিন সাগরে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়।

Visit xsportfeed.quest for more information.

ইলিশের গোত্রের মাছ আমাদের জলেই রয়েছে তিন প্রজাতির-Tenualosa ilisha, Tenualosa toli ও Tenualosa kelee। আমরা যে মাছকে ইলিশ বলে চিনি, সেটি প্রথম প্রজাতির। দ্বিতীয় প্রজাতিটিই চন্দনা। মৎস্যবিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ইলিশের কাছাকাছি একটি প্রজাতি। দেখতে প্রায় ইলিশের মতো হলেও স্বাদে পার্থক্য আছে। সিলেট ও উত্তরাঞ্চলে মাছটিকে ‘চন্দনা ইলিশ’ বলা হয়। চট্টগ্রামে এর নাম ‘ফুইট্টা ইলিশ’। ইংরেজিতে একে বলা হয় টোলি শ্যাড।

শরৎ এলেই কাশফুল এত বেশি ফোটে কেনচন্দনা ইলিশ

চন্দনা উপকূলের পানিতে ঝাঁক বেঁধে ঘোরে। মোহনা ও জোয়ার-ভাটার নদীতেও ঢোকে। ইলিশের মতো ডিম পাড়তে নদীর উজানেও যেতে পারে। এ ধরনের মাছকে বিজ্ঞানীরা বলেন অ্যানাড্রোমাস। সহজ করে বললে, যেসব মাছ সাধারণত নোনা পানিতে থাকে, কিন্তু ডিম পাড়তে মিঠাপানিতে আসে, তাদের এ নামে ডাকা হয়। চন্দনার গায়ের রং রুপালি, তাতে হলদে আভা থাকে। ফুলকার পেছনে অস্পষ্ট কালচে ছাপ দেখা যায়। ওপরের চোয়ালের মাঝখানে ছোট একটি খাঁজও রয়েছে।

তবে চন্দনা নামটি শুধু একটি মাছের জন্য ব্যবহৃত হয় না। Sardinella melanura নামের আরেকটি সামুদ্রিক মাছকেও কোথাও কোথাও চন্দনা ইলিশ বলা হয়। ইংরেজিতে এর নাম ব্ল্যাকটিপ সার্ডিনেলা। বাংলায় ‘কালটিপ তাকিয়া’ নামেও পরিচিত মাছটি। এর লেজের ডগায় কালো রং থাকে। তাই বাজারে ‘চন্দনা’ শুনলেই ঠিক কোন মাছের কথা বলা হচ্ছে, তা বোঝা কঠিন।

সুরমার গল্প অবশ্য আলাদা। এটি ম্যাকেরেল পরিবারের মাছ। ইংরেজিতে একে কিং ম্যাকেরেল বলা হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Scomberomorus commerson। ইলিশ ও চন্দনা একই বর্গের মাছ হলেও সুরমা পড়ে অন্য বর্গে। অঞ্চলভেদে একে ‘ডোরা মাইট্টা’ বা ‘চম্পা’ নামেও ডাকা হয়।

সুরমার দেহ লম্বাটে ও দুই পাশে চাপা। পিঠ নীলচে রুপালি, পেট সাদাটে। শরীরে সারি সারি কালচে খাড়া দাগ থাকে। ইলিশের গায়ে এমন দাগ দেখা যায় না। সুরমার চোয়ালে শক্ত দাঁত রয়েছে, যেগুলোর কিনারা করাতের মতো খাঁজকাটা। অর্থাৎ মাছটি ভালোভাবে চিনে নিলে ইলিশের সঙ্গে এর পার্থক্য বোঝা সম্ভব। তবু অনেক সময় সুরমাকেও ইলিশ বলে বিক্রি করা হয়।

ব্রকলি শরীরের জন্য কতটা উপকারী

ইলিশ বাঙালির আবেগের মাছ। এর স্বাদ যেমন জনপ্রিয়, দামও তেমন চড়া। এ বছর চাঁদপুরের মাছঘাটে প্রতি কেজি ইলিশের দাম ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে বলে জানা গেছে। কক্সবাজারের জেলে হাসান আলীর দুটি নৌকা একবার সাগর থেকে ফিরেছিল মাত্র ২০০টি ইলিশ নিয়ে। অথচ একসময় তাঁর জাল ইলিশে ভরে উঠত। ইলিশের এমন চড়া দাম ও কমে আসা প্রাপ্তির সুযোগে অসাধু বিক্রেতারা অন্য মাছকে ইলিশ বলে চালিয়ে দিতে পারে।

বেশ কয়েক বছর আগে প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে ইলিশ কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছিল। আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্ডিন, চৌক্কা, চন্দনা, চকোরি ও টাকিয়া মাছও আসল ইলিশ বলে বিক্রি হচ্ছে। আস্ত মাছ দেখে অভিজ্ঞ ক্রেতারা কিছুটা হলেও পার্থক্য ধরতে পারেন। কিন্তু হোটেলে রান্না করা মাছের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ কম। সেখানে ক্রেতাকে অনেকটাই নির্ভর করতে হয় বিক্রেতার কথার ওপর।

তবে ছোট মাছ দেখেই চন্দনা ভেবে বসো না। ইলিশের বাচ্চাও ছোট হয়। ছোট ইলিশকে বলা হয় জাটকা। এটি ইলিশেরই কিশোর বয়সের পর্যায়, আলাদা কোনো প্রজাতি নয়। জাটকা ধরা, পরিবহন করা বা বিক্রি নিষিদ্ধ। অন্যদিকে চন্দনা আলাদা প্রজাতির মাছ। বড় হওয়ার পরও এটি আকারে ইলিশের তুলনায় ছোট থাকতে পারে। তাই শুধু আকার দেখে মাছ চেনার চেষ্টা করলে ভুল হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা মাছের নামের ক্ষেত্রে লম্বা লাতিন নাম ব্যবহার করেন কেন, জানো? কারণ, স্থানীয় নাম নিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। একই মাছকে সিলেটে ‘চন্দনা’, আবার চট্টগ্রামে ‘ফুইট্টা ইলিশ’ বলা হয়। অন্যদিকে একই নাম দিয়ে একাধিক মাছকেও বোঝানো হতে পারে। বৈজ্ঞানিক নামের সুবিধা হলো, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে সেই নাম ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট প্রজাতিটিকেই বোঝানো যায়।

তাহলে বাজারে গিয়ে আসল ইলিশ চিনবে কীভাবে? সম্ভব হলে আস্ত মাছ কিনবে। কাটা মাছের ক্ষেত্রে পার্থক্য বোঝা কঠিন। মাছের আকার ও গায়ের দাগ খেয়াল করতে পারো। চন্দনা সাধারণত ইলিশের তুলনায় ছোট হয়, আর সুরমার গায়ে খাড়া কালচে দাগ থাকে। তবে শুধু একটি বৈশিষ্ট্য দেখে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। হোটেলে মেনুতে ইলিশ লেখা থাকলে অর্ডার দেওয়ার আগে মাছটির পরিচয় জেনে নিতে পারো। দাম অস্বাভাবিক কম মনে হলে বা বিক্রেতা মাছ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে না চাইলে সতর্ক হওয়া ভালো।

ইলিশ আমাদের নদী, সংস্কৃতি ও উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই ইলিশের নামে অন্য মাছ বিক্রি করা শুধু ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা নয়, আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গেও একধরনের চালাকি। চন্দনা ও সুরমা মাছেরও নিজস্ব পরিচয় আছে। সঠিক নামে বিক্রি হলে সেগুলোও ক্রেতার পছন্দ হতে পারে। আপত্তি তখনই, যখন অন্য মাছকে ইলিশ বলে পরিবেশন করা হয়।

তথ্যসূত্র: ফিশ বেজ, আইন্যাচারালিস্টঅ্যাপলের নতুন হোম গ্যাজেট আসছে, কী সুবিধা আছে এতে

Read full story at source