‘সুতারখালীর ভাগ্যে নিশ্চয়ই ভালো কিছু আছে’

· Prothom Alo

রামেনা বেগমের বয়স ৬৫ বছর। খুলনার দাকোপের সুন্দরবনসংলগ্ন কালাবগী থেকে সকাল সাড়ে আটটায় ইজিবাইকে চড়ে এসেছেন নলিয়ানে। এবড়োখেবড়ো মাটির রাস্তায় ভাড়া লেগেছে ৮০ টাকা। ফেরার পথেও লাগবে আরও ৮০ টাকা। তাঁর কাছে এই খরচ অনেক। তবু কষ্ট করে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একনজর দেখার আশায়।

কিন্তু নলিয়ানে এসে দেখেন, প্রধানমন্ত্রীর অবতরণস্থলের কাছেই বাঁশ দিয়ে রাস্তা আটকে রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে সামনে যাওয়ার সুযোগ নেই। দূর থেকেই দেখতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে।

Visit biznow.biz for more information.

রামেনা বেগম বলেন, ‘বাড়ি থেকে আসার সময় ভেবেছিলাম, ভালো করে দেখতে পাব। এসে দেখি, বাঁশ দিয়ে রাস্তা আটকে রাখা। যেতে দিচ্ছে না। তারপরও দূর থেকে একটু দেখতে পেরেছি। এতেই আমি খুশি।’

রামেনার মতো অনেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেখতে আজ বৃহস্পতিবার সকালে এসেছিলেন সুতারখালীর নলিয়ানে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে তাঁদের বেশির ভাগেরই কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়নি। কেউ চেয়েছিলেন একনজর দেখতে, কেউ বলতে চেয়েছিলেন এলাকার সমস্যার কথা। দেখা না হওয়ায় বলা হয়নি অনেক কিছুই। তবু প্রধানমন্ত্রী এখানে এসেছেন, এতেই তাঁরা খুশি।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো খুলনা সফরে এসেছেন তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হেলিকপ্টারে করে দাকোপের সুতারখালী ইউনিয়নের নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠের অস্থায়ী হেলিপ্যাডে পৌঁছান তিনি। বেলা পৌনে ১১টার দিকে মোংলার উদ্দেশে যাত্রা করেন।

বিএনপির মিডিয়া সেল জানিয়েছে, সুন্দরবন পর্যবেক্ষণ, মোংলা বন্দরের জেটি ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শনে খুলনা ও বাগেরহাট সফরে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর এই সফর ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তৈরি হয়েছে নানা প্রত্যাশা।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হেলিকপ্টারে করে দাকোপের সুতারখালী ইউনিয়নের নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠের অস্থায়ী হেলিপ্যাডে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। বেলা পৌনে ১১টার দিকে তিনি মোংলার উদ্দেশে যাত্রা করেন

সুন্দরবনের পর্যটন, মোংলা বন্দরের বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান তৈরি হবে, গতি পাবে স্থানীয় অর্থনীতি—এমন আশা স্থানীয় মানুষের। বিশেষ করে সুতারখালীর মানুষের চাওয়া যোগাযোগ সমস্যার সমাধান, সুপেয় পানির সংকট দূর করা, চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়ানো, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা।

যেখানে এমপির দেখা পাওয়াই কষ্ট...

নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে কিছুটা দূরে একটি দোকানের মোড়ে বসেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুস গাজী। সঙ্গে ছিলেন আরও প্রায় ২৫ জন। সবাই অপেক্ষা করছিলেন প্রধানমন্ত্রীর হেলিকপ্টার দেখার জন্য। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে বিদ্যালয় মাঠের কাছে যেতে পারেননি তাঁরা।

আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমরা দেখতে পাব না, এটা আগে বুঝিনি। আসার পর জানতে পেরেছি। তবে প্রধানমন্ত্রী যে এসেছেন, এতেই আমরা ব্যাপক খুশি। যেখানে এমপির দেখা পাওয়াই কষ্ট, সেখানে প্রধানমন্ত্রী এই মাটিতে পা রাখছেন—এতেই আমরা আনন্দিত।’

সুতারখালী গ্রামের আবদুল গণির আক্ষেপ, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এলাকার সমস্যাগুলো তুলে ধরার সুযোগ পাননি তাঁরা।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তাঁদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, সুপেয় পানি, সেতু, হাসপাতাল ও টেকসই বেড়িবাঁধ। সুন্দরবনঘেরা এই জনপদের মানুষেরা বনে দস্যুতা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ চান।

প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে ভিড় করলেও নিরাপত্তার কারণে বেশির ভাগেরই তাঁর কাছে যাওয়ার সুযোগ পাননি। তবুও প্রধানমন্ত্রী আসায় তাঁরা খুশি

‘সমস্যার কথা ভাববেন’

সুতারখালীর মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চিত, তা বোঝা যায় ফাতেমা বেগমের কথায়। খাবার, সুপেয় পানি ও চিকিৎসা নিয়ে প্রতিদিনই দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় তাঁদের।

ফাতেমা বেগম বললেন, ‘আমাগো চিন্তার শ্যাষ নি। মাঝেমধ্যে দুর্যোগে এলাকা ডুবে যায়। খাবার পানির সমেস্যা। আর এখন মানষির হাতে কাজ নেই...নদীপথে হাসপাতালে যাতি যাতি পথেই অনেকের ডেলিভারি হুয়ে যায়।’

গুনারী গ্রামের হানিফ গাজীও প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে পারেননি। তিনি বললেন, ‘দূর থেকেও দেখতে পেলাম না। কষ্টটা আছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই আমাদের নিয়ে ভাববেন। আমাদের সুপেয় পানি নেই। শিশুরা পুষ্টিহীন। সামান্য স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা নেই। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে নৌপথে উপজেলায় নিতে হয়। আর এত খারাপ রাস্তাঘাট দেশের অন্য কোথাও আছে বলে মনে হয় না।’

নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে প্রধানমন্ত্রীর হেলিকপ্টার অবতরণ করে। এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোতাহার হোসেন চেয়েছিলেন ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে এবং বিদ্যালয়ের ভাঙাচোরা অবকাঠামোর কথা তুলে ধরতে। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের মাঠে নামছেন প্রধানমন্ত্রী। এটা গর্বের বিষয়। তবে আমরা একটু ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে চেয়েছিলাম। আমরা ভাঙাচোরা অবকাঠামোর বিষয়ে বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সুযোগ মেলেনি। তবে যখন এই মাটিতে তিনি এসেছেন, নিশ্চয় ভালো কিছু করবেন।’

প্রধানমন্ত্রী মোংলায় চলে যাওয়ার পর অস্থায়ী হ্যালিপ্যাড এলাকায় ভিড় করেন স্থানীয় লোকজন। বৃহস্পতিবার সকালে দাকোপের নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে

নলিয়ান গাজীপাড়ার বাসিন্দা বাবর আলীর কণ্ঠে আক্ষেপের পাশাপাশি আনন্দও আছে। প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখতে না পারলেও নিজের এলাকায় তাঁর আগমনকে গর্বের বলে মনে করেন তিনি।

বাবর আলী বললেন, ‘দেখতে না পাওয়ার হতাশা আছে। তবে আমাদের মাটিতে তিনি এসেছেন। স্বাধীন হওয়ার পর কোনো প্রধানমন্ত্রী আসেননি। তিনি যেহেতু (প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান) এসেছেন, এতেই আমরা গর্বিত। সুতারখালীর ভাগ্যে নিশ্চয়ই ভালো কিছু আছে।’

Read full story at source