জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে: মুমিন যেভাবে অর্থসংকট সামাল দেবেন

· Prothom Alo

বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। আয় সীমিত, কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীন—এমন পরিস্থিতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো অর্থসংকটের মুখে পড়ছে।

Visit iwanktv.club for more information.

ইসলাম জাগতিক জীবনের যেকোনো সংকট মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা দেয়। তাই এই অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে একজন মুমিন কীভাবে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে পারেন, তার রূপরেখা তুলে ধরা হলো।

১. মধ্যপন্থা ও পরিমিত ব্যয়

অর্থসংকট সামাল দেওয়ার প্রথম ও প্রধান হাতিয়ার হলো খরচে লাগাম টানা এবং মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। ইসলামে কৃপণতা যেমন নিন্দনীয়, তেমনি অপচয় ও বিলাসবহুল জীবনযাপনও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। 

মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৪২৬৯যে ব্যক্তি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে, সে কখনো অভাবগ্রস্ত হয় না।

কোরআনে মুমিনদের ব্যয়ের ভারসাম্য শেখাতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘আর তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয় করে না এবং কৃপণতাও করে না; বরং তাদের পন্থা হয় এ দুয়ের মধ্যবর্তী।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৭)

আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখা গেলে ধারদেনা থেকে বেঁচে থাকা যায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে, সে কখনো অভাবগ্রস্ত হয় না।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৪২৬৯)

বর্তমান বাজারে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা ও শৌখিনতা বাদ দিয়ে শুধু মৌলিক চাহিদার দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

সমস্যায়–সংকটে ইসলামে মুক্তির দিশা

২. আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্টি

অল্পে তুষ্ট থাকার মানসিকতা বা ‘কানাআত’ মুমিনের বড় একটি সম্পদ। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে চারপাশের চাকচিক্য দেখে অনেক সময় মনে হতাশা জাগতে পারে। কিন্তু নিজের চেয়ে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের দিকে তাকালে অন্তরে প্রশান্তি আসে।

মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা জাগতিক বিষয়ে তোমাদের চেয়ে নিচু স্তরের মানুষের দিকে তাকাও, ওপরের স্তরের মানুষের দিকে তাকিয়ো না। এতে তোমাদের প্রতি আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে ক্ষুদ্র মনে হবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৬৩)

অভাবের সময় হা-হুতাশ না করে, যতটুকু আছে তাতেই তৃপ্ত থাকার চেষ্টা করলে মানসিক চাপ অনেক কমে যায়।

ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমামানুষের রুজি আসমান থেকে পড়ে না; বরং শ্রম, মেধা ও পেশাগত বৈচিত্র্যের মাধ্যমেই আল্লাহ রিজিকে প্রশস্ততা দান করেন।

৩. হালাল উপার্জনের নতুন পথ খোঁজা

পরিবারের ব্যয় মেটাতে একটি আয়ের উৎসের ওপর নির্ভরশীল না থেকে হালালভাবে বাড়তি উপার্জনের চেষ্টা করা ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয়। অবসর সময়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কারিগরি কাজ বা নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে

ইসলামে হালাল রুজির সন্ধানকে ফরজ ইবাদতের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত বলা হয়েছে। ইবনে খালদুন উল্লেখ করেছেন, মানুষের রুজি আসমান থেকে পড়ে না; বরং শ্রম, মেধা ও পেশাগত বৈচিত্র্যের মাধ্যমেই আল্লাহ রিজিকে প্রশস্ততা দান করেন। (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, পৃষ্ঠা ৩৮২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৩)

পরিবারের জন্য অর্থ খরচ করা যখন ইবাদত

৪. ঋণ থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকা

অর্থসংকটে পড়লে অনেকেই তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য চড়া সুদে ঋণ বা ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। কিন্তু ইসলামে ঋণ করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, আর সুদি ঋণ তো সম্পূর্ণ হারাম। ঋণ মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নেয় এবং দিনের বেলায় অপমানের কারণ হয়

মহানবী (সা.) নিয়মিত ঋণ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। একান্ত বাধ্য হয়ে যদি ঋণ নিতেই হয়, তবে তা যেন সুদমুক্ত (করজে হাসানা) হয় এবং দ্রুত পরিশোধের দৃঢ় নিয়ত থাকে।

তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পরিশোধের নিয়তে মানুষের সম্পদ ধার নেয়, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা আদায়ের ব্যবস্থা করে দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৮৭)

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি একটি বৈশ্বিক ও কাঠামোগত সমস্যা হলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা, পরিকল্পিত অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করার মাধ্যমে এই সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।

৫. দান-সদকা ও ইস্তিগফার বৃদ্ধি করা

শুনতে অবাক লাগলেও, অভাবের সময় দান-সদকা করলে সম্পদ কমে না, বরং তাতে বরকত বাড়ে। বিপদের সময় নিজের কষ্ট সত্ত্বেও অন্য অভাবীকে সাহায্য করলে আল্লাহ খুশি হয়ে রিজিকের দরজা খুলে দেন।

আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৬)

পাশাপাশি, আর্থিক সংকটে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তিগফার পড়া উচিত। কোরআনে বলা হয়েছে, ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহ ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে বরকত দান করেন। (সুরা নুহ, আয়াত: ১০-১২)

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি একটি বৈশ্বিক ও কাঠামোগত সমস্যা হলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা, পরিকল্পিত অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করার মাধ্যমে এই সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।

মুমিন বিশ্বাস করে, রিজিকের চূড়ান্ত ফয়সালাদাতা একমাত্র আল্লাহ, আর যেকোনো কঠিন পরিস্থিতির পরই আসে স্বস্তি।

সংকট মোকাবিলায় হোসাইন (রা.)-এর জীবন থেকে ৭ শিক্ষা

Read full story at source