শীতে ছাদবাগানের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেবেন যেভাবে
· Prothom Alo
ঋতু পরিবর্তনের এই সময়টা ছাদবাগানের জন্য যেন এক ‘রিসেট বাটন’ হিসেবে কাজ করে। বিশেষ এই সময়ে সঠিক নিয়ম মেনে মাটি, চারা ও গাছের যত্ন নিলে শীতজুড়ে টাটকা শাকসবজি ও রঙিন ফুলে ভর্তি থাকবে ছাদবাগান
Visit zeppelin.cool for more information.
সঠিক সময়ে একটুখানি যত্ন ও প্রস্তুতিই আপনার পুরো শীতের ছাদবাগানকে করে তুলবে প্রাণবন্ত ও ফলপ্রসূযাঁরা নতুন করে ছাদবাগান শুরু করতে চান কিংবা পুরোনো বাগানকে শীতের উপযোগী করে সাজাতে চান, তাঁদের এখনই ‘মাঠে’ নেমে পড়া উচিত। জেনে নেওয়া যাক, শীতকালীন ছাদবাগানের প্রস্তুতি ও পরিচর্যার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা। এ ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকার আসাদ গেটে অবস্থিত ফলবীথি হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. রুহিদ হাসান।
১. পরিচ্ছন্নতা ও মাটি প্রস্তুতি
রোগাক্রান্ত গাছ অপসারণ
বৃষ্টি পরবর্তী মরা, রোগাক্রান্ত কিংবা পোকাধরা গাছ শিকড়সহ তুলে দূরে ফেলে দিন বা পুড়িয়ে ফেলুন। রোগাক্রান্ত গাছ কোনোভাবেই কম্পোস্ট সার তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে না।
মাটি শোধন
ছাদবাগানে ব্যবহারের জন্য রাখা বস্তাবন্দী পুরোনো মাটি খুলে ৭-১০ দিন কড়া রোদে ছড়িয়ে রাখুন। ভালো ফল পেতে বৃষ্টিতে ভেজা মাটি স্বচ্ছ পলিথিনে ঢেকে ২-৪ সপ্তাহ রোদে রাখুন। একে ‘সোলারাইজেশন’ বলে। এর ফলে মাটিতে থাকা ক্ষতিকর ছত্রাক, পোকামাকড়ের ডিম ও আগাছার বীজ নষ্ট হয়ে যায়।
শস্যপর্যায় অনুসরণ
একই পরিবারের ফসল, যেমন টমেটো, বেগুন, মরিচ, ক্যাপসিকাম ইত্যাদি পরপর একই টবে না লাগিয়ে আলাদা স্থানে লাগান। এতে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণের ঝুঁকি কমবে।
আদর্শ মাটির মিশ্রণ
মাটির গুণগত মান বাড়াতে ৫০ শতাংশ দোআঁশ মাটি, ৩০ শতাংশ পচা গোবর বা ভার্মিকম্পোস্ট এবং ২০ শতাংশ কোকোপিট মিশিয়ে নিতে পারেন। অথবা ৪০ শতাংশ দোআঁশ মাটি, ৩০ শতাংশ জৈব সার, ২০ শতাংশ কোকোপিট ও ১০ শতাংশ বালু বা ধানের তুষ মিশিয়েও মাটির আদর্শ মিশ্রণ তৈরি করা যায়।
ভিত্তিসার
গাছ রোপণের আগে বা টবের মাটি তৈরি করার সময় মাটিতে যে প্রাথমিক সার বা পুষ্টি উপাদান মিশিয়ে দেওয়া হয়, তা-ই মূলত ভিত্তিসার (বেসাল ডোজ)। মূলত গাছের শিকড় গজানো, গাছের প্রাথমিক বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ সময় ধরে পুষ্টি জোগান নিশ্চিত করার জন্য এটি ব্যবহার করা হয়।
ভিত্তিসার হিসেবে প্রতি বড় টবে ৫০-১০০ গ্রাম পচানো শর্ষের খৈল, ১-২ চামচ হাড়ের গুঁড়া ও একমুঠো কাঠের ছাই মিশিয়ে দিন। প্রয়োজনে সামান্য পরিমাণে (১০-১৫ গ্রাম) ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও জিপসাম দেওয়া যেতে পারে।
চারা চার-পাঁচ সপ্তাহের হলে স্থায়ী টবে বা ব্যাগে রোপণ করুন২. শীতের সবজি চাষ ও বিশেষ পরিচর্যা
টব ও জিও ব্যাগের সবজি
বেগুন, টমেটো, ওলকপি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, গাজর, বিটরুট, স্কোয়াশ, মরিচ, ক্যাপসিকাম, লেটুস, পুদিনাপাতা, মিষ্টি আলুসহ নানা পদের শাক চাষের জন্য ১২ থেকে ১৫ ইঞ্চি গভীর টব বা জিও ব্যাগ নির্বাচন করুন।
সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের শুরুতেই বীজতলায় চারা তৈরির কাজ শুরু করা ভালো। চারা চার-পাঁচ সপ্তাহের হলে স্থায়ী টবে বা ব্যাগে রোপণ করুন। টমেটো ও বেগুনগাছ ভারী হয়ে ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে কঞ্চি বা লাঠির সাপোর্ট দিন।
সরাসরি বপনযোগ্য শাকসবজি
মুলা, ঢ্যাঁড়স, শালগম, গাজর, পালংশাক, লালশাক, বাটিশাক, বথুয়াশাক, শর্ষেশাক, ধনেপাতা ও লেটুসের বীজ সরাসরি টবে বোনা যায়। বীজ বোনার আগে ২০-৩০ মিনিট রোদে শুকিয়ে নিন। শুকানোর পর ঠান্ডা হলে ১০-১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে টবে বা বেডে লাগান, এতে বীজ গজানোর হার বাড়ে।
লালশাক, পালংশাক ও ধনেপাতা ১০-১৫ দিন পরপর অল্প অল্প করে বুনুন, তাহলে ধাপে ধাপে গাছ বড় হতে থাকবে, শীতজুড়ে তুলতে পারবেন টাটকা শাকপাতা।
মাচার জন্য লতানো সবজি
লাউ, শিম, বরবটি ও শসার মতো লতানো সবজির জন্য ২০ ইঞ্চির টব বা বড় হাফ ড্রাম উপযোগী। টবের আকার যত বড় হবে, তত ভালো। চারা লতিয়ে উঠতে শুরু করলে বাঁশ, দড়ি বা নেট দিয়ে শক্ত মাচা তৈরি করে দিতে হবে।
কীভাবে এত সবজি ফলে ডালিয়ার ছাদবাগানে?বীজ ও চারা সংগ্রহ
বীজ
বীজের জন্য যেতে পারেন ঢাকায় থাকা বিএডিসির চারটি বিক্রয়কেন্দ্রে—গাবতলী বীজ ভবন, মতিঝিল কৃষি ভবন, জাতীয় সংসদ ভবনের বিপরীতে সেচ ভবনের সামনে এবং গ্রিন রোড ল্যাবএইড হাসপাতালের বিপরীতে।
এসব বিক্রয়কেন্দ্র থেকে সরকার নির্ধারিত স্বল্প মূল্যে বীজ নিতে পারবেন। এ ছাড়া যেতে পারেন দেশের সর্ববৃহৎ বীজবাজার গুলিস্তানের সিদ্দিকবাজারে।
চারা
স্বল্পমূল্যে ভালো জাতের চারা সংগ্রহ করতে পারেন সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার থেকে। ঢাকাসহ দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা শহরেই হর্টিকালচার সেন্টার রয়েছে।
ঢাকায় আছে আসাদ গেট–সংলগ্ন ফলবীথি হর্টিকালচার সেন্টার ও গুলশানে গুলশান হর্টিকালচার সেন্টার। এখানে সবজির চারার দাম শুরু মাত্র ২ টাকা থেকে; পাওয়া যায় বীজও। শুক্র, শনি ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া অন্যান্য দিনে সরকারি অফিস সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত হর্টিকালচার সেন্টার খোলা পাবেন।
এ ছাড়া চারা নিতে পারেন আপনার নিকটবর্তী বিশ্বাসযোগ্য কোনো নার্সারি থেকেও।
বৃষ্টি পরবর্তী মরা, রোগাক্রান্ত কিংবা পোকাধরা গাছ শিকড়সহ তুলে দূরে ফেলে দিন বা পুড়িয়ে ফেলুনবিশেষ পরিচর্যা
টমেটোর পরিচর্যা: টমেটো ফলের নিচে কালো দাগ হতে পারে, যাকে ‘ব্লসম এন্ড রট’ রোগ বলে। এটি মূলত ক্যালসিয়ামের ঘাটতি ও অনিয়মিত সেচের কারণে হয়। নিয়মিত সমপরিমাণ পানি দিন। সঙ্গে জিপসাম সার বা ফেলে দেওয়া শুকনা ডিমের খোসা গুঁড়া করে গাছের গোড়ায় দিন।
মালচিং: মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে গাছের গোড়ায় শুকনা খড় বা পাতার আস্তরণ দিন। সবজির বেডে চাষের ক্ষেত্রে পলিথিন মালচিং ব্যবহার করতে পারেন।
ছাদবাগান থেকেই শতাধিক প্রজাতির হাজারের বেশি ছবি তুলেছেন আশিফুল, রইল তারই ১৫টি৩. রঙিন ফুলের বাগান
শীতকালেই ছাদবাগানে সবচেয়ে বেশি ফুলের সমারোহ ঘটে। গাঁদা, কসমস, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, পিটুনিয়া, ক্যালেন্ডুলা, স্যালভিয়া, ডায়ান্থাস, প্যানজি, জিনিয়া, সূর্যমুখী ও বোতাম ফুলের বীজ বা চারা এ সময়েই রোপণ করা হয়।
আলোর চাহিদা: দিনে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা রোদ থাকা প্রয়োজন।
পিঞ্চিং বা গাছের ডগা ছাঁটাই: গাঁদা ফুল রোপণের ২৫-৩০ দিনের মধ্যে ডগা ছাঁটলে গাছ ঝোপালো হয়ে বেশি ফুল দেয়।
গোলাপের ডাল ছাঁটাই: অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি গোলাপগাছ ছাঁটাইয়ের উপযুক্ত সময়। ডাল ছাঁটাইয়ের ৭-১০ দিন আগে থেকে পানি দেওয়ার মাত্রা কমিয়ে দিন। মরা, চিকন ও রোগাক্রান্ত ডালপালা ৪৫ ডিগ্রি কোণে কেটে দিন এবং কাটা অংশে বোর্দো পেস্ট লাগান।
পানিতে তুঁতে ও কলিচুন সমান অনুপাতে মিশিয়ে এই পেস্ট তৈরি করা হয়। ডালপালার কাটা অংশকে রোগজীবাণুর সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে এটি প্রলেপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ডাল ছাঁটাইয়ের ৭-১০ দিন পর জৈব সার, হাড়ের গুঁড়া ও পটাশ প্রতি টবে ১ চামচ করে দিন। সঠিক সময়ে ডাল ছাঁটলে নতুন ডালে প্রচুর কুঁড়ি আসে এবং ফুলও আকারে বড় হয়।
অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখুন৪. কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ও সেচ ব্যবস্থাপনা
জৈব সুরক্ষা: গাছে পোকার আক্রমণ রোধে সপ্তাহে ১-২ বার প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলিলিটার করে নিম তেল মিশিয়ে স্প্রে করুন। ছত্রাক বা পাতাপচা রোগ থেকে বাঁচতে গাছে কাঠের ছাই ছিটাতে পারেন।
সেচ সতর্কতা: শীতের রাতে শিশির পড়ে, তাই সান্ধ্য সেচ এড়িয়ে চলাই ভালো। রাতে সেচ দিলে গাছের গোড়ায় পচন ধরতে পারে; তাই সব সময় সকালে সেচ দিন এবং টবের মাটি শুকিয়ে এলে তবেই পানি দিন।
৫. ছাদের নিরাপত্তা ও বাড়তি পরামর্শ
পানির প্রবাহ ঠিক রাখা: অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখুন।
টবের নিচে স্ট্যান্ড ব্যবহার: টব বা ড্রামের নিচে স্ট্যান্ড, ট্রে বা ইট ব্যবহার করুন, যাতে ছাদের গায়ে সরাসরি পানি জমে ছাদের ক্ষতি না হয়।
টবের বণ্টন: ছাদের এক স্থানে অনেকগুলো ভারী টব না রেখে সুষমভাবে ছড়িয়ে রাখুন।
নতুন বাগানপ্রেমীরা শুরুতেই খুব বেশি গাছ না নিয়ে অল্প যত্নে ফলে এমন লালশাক, পালংশাকের মতো অল্প কিছু শাক, টমেটো, বেগুনের মতো সবজি কিংবা কয়েকটি গাঁদা বা কসমস ফুল দিয়ে যাত্রা শুরু করতে পারেন। সঠিক সময়ে একটুখানি যত্ন ও প্রস্তুতিই আপনার পুরো শীতের ছাদবাগানকে করে তুলবে প্রাণবন্ত ও ফলপ্রসূ।
ছাদবাগান মশামুক্ত রাখার উপায়