কুষ্টিয়ায় ব্যবসা–বাণিজ্য প্রসারে বাজেটে বরাদ্দ রাখার দাবি

· Prothom Alo

ইইউর সহযোগিতায় কুষ্টিয়ায় ‘জাতীয় বাজেটে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা অন্তর্ভুক্তিকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিলের আয়োজন করে একশনএইডের সুশীল প্রকল্প ও প্রথম আলো।

Visit newssport.cv for more information.

কুষ্টিয়ায় ভাঙাচোরা সড়ক মেরামত, জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনে বরাদ্দ বেশি দিতে হবে। পাশাপাশি একাধিক বড় প্রকল্পের মাধ্যমে জেলার উন্নয়নের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দের প্রত্যাশার কথা উঠে এসেছে।

গতকাল মঙ্গলবার কুষ্টিয়ায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘দিশা’র সম্মেলনকক্ষে ‘জাতীয় বাজেটে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা অন্তর্ভুক্তিকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন বক্তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহযোগিতায় একশনএইডের সুশীল প্রকল্প ও প্রথম আলোর উদ্যোগে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে সূচনা বক্তব্য দেন একশনএইড বাংলাদেশ সুশীল প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মৌসুমী বিশ্বাস। ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ‘সমষ্টি’র গবেষণা পরিচালক রেজাউল হক। এতে জেলার সাধারণ মানুষেরা জেলার উন্নয়নের জন্য কী প্রত্যাশা করেন, তা তুলে ধরা হয়।

বরাদ্দ ও অবকাঠামো বাড়ানোর তাগিদ

কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব উদ্দীন বলেন, কুষ্টিয়া অঞ্চল কৃষিকাজের জন্য খুবই উপযোগী। এখানে খুবই জরুরিভাবে একটি সরকারি কৃষি কলেজ দরকার; যার জন্য জাতীয় বাজেটে অন্তত ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দীন বলেন, ‘বিগত জাতীয় নির্বাচনের সময় আমরা জেলার উন্নয়নের জন্য কী করতে হবে, কীভাবে করা হবে, সেই ব্যাপারে বিশদ তুলে ধরেছিলাম। উন্নয়নের সব দিক সরকারের কাছেও জানানো আছে। এখন দরকার বরাদ্দ। তাহলেই জেলার কাজগুলো শুরু করা যাবে।’

জেলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি সুজা উদ্দীন জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘কুষ্টিয়া চিনিকল দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে আছে। সেটি চালু করার উদ্যোগ জাতীয়ভাবেই নিতে হবে। জেলাকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলবে, তার অনেক কিছু আছে। সেদিকে বরাদ্দ বাড়ালে জেলায় ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে।

জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকার বলেন, কুষ্টিয়া শহরের বিষফোড়া হচ্ছে রেললাইন। শহরের মাঝখান দিয়ে এটা যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকে। শহরের জগতি এলাকা থেকে বড়বাজার পর্যন্ত এলিভেটর সড়ক করা প্রয়োজন। পদ্মা ব্যারাজ কুষ্টিয়ার শিলাইদহে করলে এলাকাসহ আশপাশের জেলার মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। জরাজীর্ণ মোহিনী মিল ভেঙে সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ প্রয়োজন। কুষ্টিয়ায় নদীবন্দর থেকে শুরু করে দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ আরও সহজ ও দ্রুত করতে কুষ্টিয়ার হরিপুর এলাকায় পদ্মা নদীর ওপর আরও একটি সেতু হলে খুব ভালো হয়।

কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান বলেন, কৃষি–শিল্প ত্বরান্বিত করতে প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান করতে বাজেটে বরাদ্দ থাকা দরকার। তাঁতশিল্পকে ধরে রাখতে সেদিকে নজর দিতে হবে।

‘তরুণসমাজ নিয়ে ভাবতে হবে’

কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাবিলা আলম খান বলেন, কুষ্টিয়া শিক্ষানগরী হিসেবে গড়ে উঠছে। আশপাশের জেলার অনেক ছেলেমেয়ে এই জেলায় পড়াশোনা করতে আসছে। তরুণ সমাজ নিয়ে ভাবতে হবে। তাদের কর্মসংস্থান বাড়াতে বাজেট রাখতে হবে।

নারীবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নূরে সফুরা ফেরদৌস বলেন, জেলায় হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন। নারীদের জন্য জেলায় একটি কর্মজীবী হোস্টেল ও পণ্য কেনাবেচার জন্য শুধু নারীদের মার্কেট গড়ে তোলা খুবই দরকার।

দেশের মোট চাহিদার ৩০ শতাংশ চাল কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকাম থেকে সারা দেশে সরবরাহ করা হয় জানিয়ে জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন প্রধান বলেন, ‘আমরা দেশের জন্য এত সেবা দিচ্ছি, অথচ আমাদের চাল উৎপাদনে কোনো সরকার তেমন কোনো নজর দেয় না। স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি কোনো প্রণোদনা পাওয়া যায়নি। বিদ্যুৎব্যবস্থা ঠিকমতো পাওয়া যায় না।’ নিরবচ্ছিন্নভাবে চাল উৎপাদন করতে বাজেটে বরাদ্দ রেখে চালকলের মালিকদের প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

জেলায় কয়েকটি বড় বড় ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে জানিয়ে কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি কাজী রফিকুর রহমান বলেন, কুষ্টিয়ার অনেকেই আছেন ব্যবসার প্রসার ঘটাতে। বিনিয়োগ করার জন্য তাঁরা প্রস্তুত; কিন্তু জায়গা মেলে না। জেলায় আরও একটি বিসিক প্রতিষ্ঠান ও নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে
তুলতে তিনি জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখতে বলেন। ব্যবসার প্রসার ঘটলে জেলার তরুণ সমাজের কর্মসংস্থান হবে।

সনাক কুষ্টিয়া শাখার সভাপতি আসমা আনসারী বলেন, জেলায় কয়েক হাজার প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোর–কিশোরী রয়েছে। তাদের বিকাশ ঘটাতে জেলার জন্য আলাদা বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন।

মুক্তি নারী ও শিশু উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মমতাজ আরা বেগম বলেন, জেলায় তামাক চাষের প্রসার ঘটেছে। এ চাষের বিকল্প কিছু বের করে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। বাজেট বাড়িয়ে বিকল্প চাষাবাদে প্রণোদনা দিতে হবে। তাহলে কৃষক বাঁচবেন, মানুষ সুস্থ থাকবেন।

বিভিন্ন সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বহুতল বিপণিবিতানে প্রতিবন্ধীদের জন্য র‌্যাম্প থাকা দরকার বলে মন্তব্য করেন নিকুঞ্জ নারী ও শিশু উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফেরদৌসী বেগম।

সাংস্কৃতিক বিকাশেও গুরুত্ব দিতে হবে

সংস্কৃতিকর্মী ‘তরঙ্গ’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, কুষ্টিয়া ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত; কিন্তু এখানে সংস্কৃতি বিকাশে তেমন কোনো বরাদ্দ মেলে না।

জেলা শিল্পকলা একাডেমির ভাড়া ঢাকার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এতে জেলায় কোনো অনুষ্ঠান সেখানের কোনো সংগঠন করতে পারে না। সংস্কৃতিকর্মীদের বিকাশের জন্য বাজেটে বেশি বরাদ্দ রাখা দরকার।

গণমাধ্যমকর্মী আনিসুজ্জামান বলেন, জেলায় পদ্মা ও গড়াই নদ–নদীতে কয়েক হাজার কোটি টাকার বালু কেনাবেচা হয়। এসব বালু বস্তায় ভরে যথাযথভাবে বিক্রি করার বিষয়ে তিনি সরকারের বাজেটে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান।

জেলার কৃষিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে উল্লেখ করে গণমাধ্যমকর্মী এম জুবায়েদ বলেন, রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে জৈব সার উৎপাদিত হচ্ছে। রাসায়নিক সারের আমদানি কমাতে জৈব সারের উৎপাদন আরও বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সেমিনারে বক্তব্য দেন দিশার পরিচালক আনিছুর রহমান, নিকুঞ্জ নারী ও শিশু উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফেরদৌসী বেগম, আলো সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফিরোজ আহমেদ, নিকুঞ্জের সমন্বয়কারী আহসান হাবীব, মুক্তি ও নারী উন্নয়ন সংস্থার জেলা সমন্বয়কারী জাহেদুল হক প্রমুখ।

স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলো কুষ্টিয়ার নিজস্ব প্রতিবেদক তৌহিদী হাসান। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

Read full story at source