রাশিয়ায় যুদ্ধে জোর করে বাংলাদেশিদের নেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ, জড়িত দালালেরা
· Prothom Alo
বাংলাদেশিদের ব্যবসায়িক ভিসার অনুলিপি পেয়েছে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন।
Visit sportbet.rodeo for more information.
বিদেশি দালালদের সঙ্গে রুশ কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে পাচার।
পাচারের শিকার ব্যক্তিদের রুশ বাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ।
বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিকদের প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে রুশ বাহিনীতে নিয়োগ দিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন। কমিশন বলেছে, বিভিন্ন দেশে সক্রিয় দালালদের সঙ্গে সমন্বয় করে রুশ কর্তৃপক্ষ এই মানব পাচার করেছে। নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের ব্যবসায়িক ভিসার অনুলিপিও পেয়েছে কমিশন, যাতে রাশিয়ার একটি বেসামরিক কোম্পানির আমন্ত্রণের উল্লেখ রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের (ওএইচসিএইচআর) দপ্তরের ওয়েবসাইটে ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত একটি খসড়া প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশন ৪৮টি দেশের নাগরিকদের রাশিয়ার বাহিনীতে নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখে ২৯টি দেশের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জবরদস্তির প্রমাণ পেয়েছে।
তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, আজারবাইজান, বেলারুশ, বলিভিয়া, ব্রাজিল, বতসোয়ানা, ক্যামেরুন, কলম্বিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, এল সালভাদর, ঘানা, হন্ডুরাস, জর্ডান, কেনিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, পেরু, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, সোমালিয়া, তাজিকিস্তান, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, উগান্ডা, উজবেকিস্তান, ইয়েমেন ও জিম্বাবুয়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রুশ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দেশের নিয়োগ-এজেন্ট বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব মানুষকে তাদের সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ করেছে। ভুক্তভোগীরা সবাই পুরুষ। তাঁদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। তাঁরা বেশির ভাগই আর্থিকভাবে দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। তাঁদের অনেকের শিক্ষার স্তরও কম। এসব ব্যক্তির অনেককে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের কেউ নিহত, আহত, বন্দী কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন। তবে ভিসার সংখ্যা, বাংলাদেশি নিয়োগপ্রাপ্তদের সংখ্যা, তাঁদের নাম বা তাঁদের পরিণতি সম্পর্কে আলাদা তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশন ৪৮টি দেশের নাগরিকদের রাশিয়ার বাহিনীতে নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখে ২৯টি দেশের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জবরদস্তির প্রমাণ পেয়েছে।রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত নজরুল ইসলাম
প্রতিবেদনে ৩০ জনের একটি দলের কথা বলা হয়েছে। তাঁদের দেওয়া একটি নিশ্চয়তাপত্রে বলা হয়েছিল, তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হবে না। প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত ওই দলের ১৭ জন সামনের সারিতে নিহত, ৫ জন নিখোঁজ এবং ১ জন আহত হয়ে ফিরেছেন। তবে প্রতিবেদনে ওই দলের কর্মীদের দেশের নাম বলা হয়নি।
এর আগে ২১ অক্টোবর ‘চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে, ৩ বছরে ৫৪ জনের মৃত্যু’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। এতে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অন্তত ৫৪ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হয়। এ প্রতিবেদনেও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ উঠে এসেছে।
তদন্ত প্রতিবেদন বিষয়ে ওএইচসিএইচআরের ওয়েবসাইটে বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রধান এরিক মোসে। তিনি বলেছেন, তদন্তে কমিশন দেখেছে রাশিয়া বিশ্বজুড়ে সক্রিয় এজেন্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে ভর্তি করতে এবং ইউক্রেনের সম্মুখযুদ্ধে পাঠাতে ২৯টি দেশের নাগরিকদের পাচার করেছে। পাচারের শিকার ব্যক্তিদের দুর্বলতাগুলোর সুযোগ নিয়ে এবং মিথ্যা কর্মসংস্থানের কথা বলে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে তাঁদের রাশিয়ায় যেতে আকৃষ্ট করা হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন নিয়ে ঢাকায় রাশিয়ার দূতাবাসের বক্তব্য জানতে গতকাল মঙ্গলবার রাতে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। রাত সাড়ে ১১টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা আলাদাভাবে প্রকাশ করা হবে।
‘আমাদের যুদ্ধে পাঠায় দিচ্ছে, আমার মাকে দেখে রাখিস’তবে রাশিয়ার জাতিসংঘ মিশনের বিবৃতির বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম গত সোমবার জানিয়েছে, রাশিয়া এই তদন্ত কমিশনের এখতিয়ার স্বীকার করে না। মস্কোর দাবি, ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ওই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। নিয়োগপত্র এখন অনেক বেশি যাচাই-বাছাই করে দেখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
‘দুনিয়ায় দেখা না হলে দেখা হবে হাশরের মাঠে’, রাশিয়ায় নিহত বাংলাদেশিদের লাশও দেশে আসে নারাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আবদুর রহিমের নিহত হওয়ার খবরে তাঁর ছবি বুকে নিয়ে আহাজারি করছেন মা-ভাইসহ অন্য স্বজনেরা। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা নামাপাড়া গ্রামেউচ্চ বেতনে বেসামরিক চাকরির প্রস্তাব
বিদেশে থাকা পুরুষেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন দেখে বা নিয়োগ-এজেন্ট ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ায় চাকরির প্রস্তাব পেতেন বলে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশন বলছে, তাঁদের নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান, নির্মাণশ্রমিক, ওয়েল্ডার, মেরামতকর্মী, পরিবহনকর্মী ও টেকনিশিয়ানের কাজের কথা বলা হতো। কোনো কোনো প্রস্তাব ছিল তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, খেলাধুলা বা কৃষি খাতের কাজের। আবার কিছু নিয়োগকারী বলত, কাজটি সামরিক বাহিনীর অধীনে হলেও তা বেসামরিক।
প্রতিবেদনে একজন পেশাদার খেলোয়াড়ের কথা আছে। তাঁকে বলা হয়েছিল, রাশিয়া বিদেশি খেলোয়াড় নিচ্ছে। রাশিয়ায় গিয়ে কাজটি পছন্দ হলে চুক্তিতে সই করা যাবে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁকে সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
চাকরির প্রস্তাবে উচ্চ বেতন, রুশ নাগরিকত্ব, আরামদায়ক বাসস্থান, চাকরি ছাড়ার পর পেনশন এবং অন্যান্য সুবিধার কথা বলা হতো। কোনো কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বাসস্থানের ছবি বা ক্যাটালগ দেখানো হয়েছিল।
কমিশনের মতে, নিয়োগকারীদের আশ্বাস, বিদেশে কাজের আগের অভিজ্ঞতা, একই কাজ পেয়েছেন বলে অন্যদের দেওয়া তথ্য এবং নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সরকারি অনুমোদন-সংক্রান্ত নথির কারণে প্রস্তাব বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তিও চাকরির কথা বলেছিলেন।
কেউ আগে টাকা দিতেন, আবার কারও ক্ষেত্রে পরে বেতন থেকে টাকা কেটে রাখার কথা বলা হতো। দেশ ও অঞ্চলভেদে ভিসার ধরন আলাদা ছিল। কেউ ব্যবসায়িক ভিসা পেয়েছেন, কেউ স্বল্পমেয়াদি পর্যটন ভিসা; আবার কারও ভিসার প্রয়োজন হয়নি।
রাশিয়ায় নিয়ে সামরিক চুক্তিতে সই
চাকরির প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর অনেককে কয়েক দিনের মধ্যে রাশিয়ায় যেতে চাপ দেওয়া হতো। এজেন্টরা ভিসা, বিমানের টিকিট, আবাসন ও যাত্রার অন্যান্য ব্যবস্থা করতেন। কেউ আগে টাকা দিতেন, আবার কারও ক্ষেত্রে পরে বেতন থেকে টাকা কেটে রাখার কথা বলা হতো। দেশ ও অঞ্চলভেদে ভিসার ধরন আলাদা ছিল। কেউ ব্যবসায়িক ভিসা পেয়েছেন, কেউ স্বল্পমেয়াদি পর্যটন ভিসা; আবার কারও ভিসার প্রয়োজন হয়নি।
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনের পাওয়া সাক্ষ্য ও নথিতে যাত্রাপথের ট্রানজিট দেশ হিসেবে বাহরাইন, ব্রাজিল, ইথিওপিয়া, ফ্রান্স, কেনিয়া, মেক্সিকো, মরক্কো, ওমান, পানামা, স্পেন, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে এজেন্টরা নিয়োগপ্রাপ্তদের সঙ্গে যাত্রা করতেন বা ট্রানজিট দেশে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতেন। কোনো কোনো নিয়োগপ্রাপ্তকে পাশের দেশে সড়কপথে গিয়ে সেখান থেকে বিমানে উঠতে বলা হতো, যাতে বিমানবন্দরে ধরা না পড়ে।
কমিশন বলেছে, বিভিন্ন দেশে নিয়োগ-এজেন্টরা স্থানীয়, আঞ্চলিক বা রুশ নাগরিক ছিলেন। তাঁরা ভ্রমণ বা পর্যটন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতেন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় লাইসেন্স ছিল। কেউ কেউ নিজেদের বৈধ বা সরকারি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান বলে পরিচয় দিতেন। রুশ দূতাবাস থেকে দেওয়া ভিসাও অনেক ক্ষেত্রে এজেন্টদের মাধ্যমে দেওয়া হতো।
চুক্তিগুলো রুশ ভাষায় লেখা ছিল। অধিকাংশ নিয়োগপ্রাপ্ত রুশ ভাষা জানতেন না। ফলে চুক্তির শর্ত বুঝতে পারেননি। ফোন হাতে না থাকায় অনুবাদের সুবিধাও তাঁরা নিতে পারেননি।
রাশিয়ার বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর নিয়োগপ্রাপ্ত অনেকের চলাচলের স্বাধীনতা থাকত না। তাঁদের অস্থায়ী আবাসনে রাখা হতো এবং পরে রুশ সশস্ত্র বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হতো। পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে তাঁদের রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক বছরের সামরিক চাকরির চুক্তিতে সই করানো হতো। চুক্তিগুলো রুশ ভাষায় লেখা ছিল। অধিকাংশ নিয়োগপ্রাপ্ত রুশ ভাষা জানতেন না। ফলে চুক্তির শর্ত বুঝতে পারেননি। ফোন হাতে না থাকায় অনুবাদের সুবিধাও তাঁরা নিতে পারেননি।
কমিশন বিভিন্ন দেশের নিয়োগপ্রাপ্তদের চুক্তির অনুলিপি পেয়েছে। চুক্তিগুলো একই ধরনের ছিল। সেগুলোর শিরোনামে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে সামরিক চাকরির জন্য নিয়োগের কথা ছিল। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথিতেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাহিনীতে কাজ করছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। চুক্তিতে সই করতে অস্বীকার করলে নিয়োগপ্রাপ্তদের ওপর চাপ, হুমকি বা নির্যাতন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একজন নিয়োগপ্রাপ্ত জানান, তাঁর সামনে চারজনকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং তাঁকে বলা হয়, সই না করলে পরের ব্যক্তি তিনি হবেন। এরপর তিনি সই করেন।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সমন্বয়ক সেলিম রেজাদেশের একজন কর্মীও যাতে প্রতারিত হয়ে বা জোরপূর্বক যুদ্ধে জড়াতে না পারে, সে দিকে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের ক্ষতিপূরণ আদায় ও দেশটিতে যুদ্ধ জড়িয়ে যাঁরা আটকা আছেন, তাঁদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে।কমিশন বলছে, বিদেশ থেকে নিয়োগের পাশাপাশি রাশিয়ায় আগে থেকেই থাকা বিদেশি নাগরিকদেরও প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীতে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের কেউ পুলিশি হেফাজতে বা বিদেশি নাগরিকদের অস্থায়ী আটককেন্দ্রে ছিলেন। কেউ কারাগারে সাজা ভোগ করছিলেন। কয়েকজনকে বলা হয়েছিল, সামরিক চুক্তিতে সই করলে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা, দীর্ঘ সাজা, নির্জন কারাবাস বা নির্যাতন এড়ানো যাবে। সই না করলে নির্যাতনের হুমকি বা সাজা বাড়ানোর কথা বলা হতো।
একজন নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি জানান, তিনি রাঁধুনি ছিলেন, সৈনিক হতে চাননি; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সামনের সারিতে পৌঁছে যান।
কেউ কারাগারে সাজা ভোগ করছিলেন। কয়েকজনকে বলা হয়েছিল, সামরিক চুক্তিতে সই করলে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা, দীর্ঘ সাজা, নির্জন কারাবাস বা নির্যাতন এড়ানো যাবে। সই না করলে নির্যাতনের হুমকি বা সাজা বাড়ানোর কথা বলা হতো।
অল্প প্রশিক্ষণের পর যুদ্ধক্ষেত্রে
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো ২০ মিনিট থেকে কয়েক দিন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ এক মাস পর্যন্ত চলত। এরপর তাঁদের ইউক্রেনের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হতো। তাঁদের দিয়ে পরিখা খোঁড়া, এলাকা পাহারা, খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়া এবং মরদেহ সংগ্রহের কাজ করানো হয়েছে। তাঁদের প্রধান কাজের মধ্যে ছিল আক্রমণ চালানো ও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তাঁরা খাবার ও পানি ছাড়া দিন কাটানো, মারধর, আটক রাখা ও মৃত্যুর হুমকির কথাও জানিয়েছেন।
নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব খুলতে নিয়ে যাওয়া হতো। কিন্তু বেতন নিয়ে তাঁদের ও পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ ছিল। অনেকে বেতন পাননি, কেউ অল্প পেয়েছেন। কারও ব্যাংক হিসাব থেকে অনুমতি ছাড়া টাকা তোলা হয়েছে; কারও বেতন আটকে রাখা হয়েছে বা হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগ-এজেন্ট বা সামরিক কর্মীরা ব্যাংকের কার্ড নিয়ে নিতেন। যুদ্ধে যাওয়ার পর নিয়োগপ্রাপ্ত অনেকের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
‘অস্ত্র দিয়ে বলে, যুদ্ধ করতে হবে না, সামনে-পিছে যাবা’প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়োগসংক্রান্ত তদন্তে কমিশন ২৪৫টি সাক্ষ্য ব্যবহার করেছে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের হাতে আটক বা দেশে ফিরতে পেরেছেন—এমন নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি, তাঁদের পরিবারের সদস্য, আইনজীবী, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, গবেষক ও সাংবাদিক। কমিশন আমন্ত্রণপত্র, যাত্রাপথ, বিমানের টিকিট, ভিসা, রাশিয়ায় প্রবেশের নথি, হোটেল বুকিং, সামরিক চুক্তি এবং রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথি সংগ্রহ করেছে। বিভিন্ন দেশকে এ বিষয়ে ৬৯টি চিঠি পাঠানো হয়েছিল; কমিশন উত্তর পেয়েছে ৬টির। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া কমিশনের ৪১টি লিখিত অনুরোধের জবাব দেয়নি।
অনেকে বেতন পাননি, কেউ অল্প পেয়েছেন। কারও ব্যাংক হিসাব থেকে অনুমতি ছাড়া টাকা তোলা হয়েছে; কারও বেতন আটকে রাখা হয়েছে বা হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগ-এজেন্ট বা সামরিক কর্মীরা ব্যাংকের কার্ড নিয়ে নিতেন। যুদ্ধে যাওয়ার পর নিয়োগপ্রাপ্ত অনেকের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
কমিশন বলেছে, রুশ কর্তৃপক্ষ নিয়োগ-এজেন্টদের সঙ্গে মিলে মানব পাচার করেছে এবং এতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘিত হয়েছে। রুশ সামরিক চুক্তিতে সই করার পর পাচারের শিকার ব্যক্তিরা রুশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য হয়েছেন। তাই তাঁদের ভাড়াটে যোদ্ধা বলা যাবে না। তাঁরা আত্মসমর্পণ করলে বা বন্দী হলে, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধবন্দীদের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার তাঁদের রয়েছে।
তদন্ত কমিশন কিছু সুপারিশও করেছে। এতে রাশিয়াকে বিদেশি নাগরিকদের প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে নিয়োগ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। বাহিনীতে থাকা পাচারের শিকার ব্যক্তিদের অব্যাহতি দিতে এবং তাঁদের সহায়তা দিতে বলেছে। নিয়োগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তদন্ত ও বিচারের মুখোমুখি করার সুপারিশও করেছে কমিশন।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সমন্বয়ক সেলিম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, রাশিয়ার শ্রমবাজার সম্ভাবনার হতে পারে, কিন্তু বাজারের চাহিদা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। জোর করে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানার পরও দেশটিতে যেতে ছাড়পত্র দিয়ে যাচ্ছে সরকার; বরং যুদ্ধে নিয়োগ বন্ধে তৎপরতা দরকার ছিল। রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এটি প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের একজন কর্মীও যাতে প্রতারিত হয়ে বা জোরপূর্বক যুদ্ধে জড়াতে না পারে, সে দিকে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের ক্ষতিপূরণ আদায় ও দেশটিতে যুদ্ধ জড়িয়ে যাঁরা আটকা আছেন, তাঁদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে।