দুর্ঘটনায় হারিয়েছিলেন দুই হাত, পা দিয়ে লিখেই পেলেন জিপিএ-৫

· Prothom Alo

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম। এ দুর্ঘটনায় দুই হাত হারিয়েছিলেন তিনি। এরপর মুখ দিয়ে লিখে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা দিয়েছেন। পরে শেখেন পা দিয়ে লেখা। এভাবেই তিনি মাধ্যমিকে পান জিপিএ-৫। এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিনি।

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম। এ দুর্ঘটনায় দুই হাত হারিয়েছিলেন তিনি। এরপর মুখ দিয়ে লিখে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা দিয়েছেন। পরে শেখেন পা দিয়ে লেখা। এভাবেই তিনি মাধ্যমিকে পান জিপিএ-৫। এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিনি।

Visit lebandit.lat for more information.

গতকাল শনিবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। রফিকুল চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।

রফিকুল ইসলাম, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী।কলেজে যাতায়াতেই অনেক সময় চলে যেত। ফলে নিয়মিত ক্লাস করতে পারিনি। অনলাইনে ক্লাস করে এবং ইউটিউব ঘেঁটে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছিলাম।

রফিকুল ইসলাম এলাকায় রাব্বি নামে পরিচিত। তিনি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের পূর্ব হাসনাবাদ গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা বজলুর রহমান পেশায় জাহাজভাঙা শ্রমিক ছিলেন। মা রোজি আক্তার দিনমজুরের কাজ করেন। তিন ভাই–বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।

রফিকুলের জীবনের বড় ধাক্কাটি আসে ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর। তখন তিনি ভাটিয়ারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে একটি পদচারী–সেতু পার হওয়ার সময় সেতুর সঙ্গে লাগানো বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তাঁর দুই হাত কেটে ফেলতে হয়।

তবে রফিকুল ইসলাম দমে যাননি। এরপরও পড়া চালিয়ে গেছেন তিনি। হাত কেটে ফেলার পর প্রথম দিকে তিনি মুখ দিয়ে লিখতেন। এভাবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ–৪ দশমিক ৮৩ পেয়েছিলেন তিনি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর পা দিয়ে লেখার অভ্যাস করেন। এরপর উপজেলার হাজী টিএসি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পান।

পায়ে লিখে জিপিএ–৫ পেয়েছে দুই হাতবিহীন রফিকুল

রফিকুলের এইচএসসির ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইংরেজি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), রসায়ন ও জীববিজ্ঞানে তিনি ‘এ’ প্লাস পেয়েছেন। বাকি বিষয়গুলোয় পেয়েছেন এ গ্রেড।

ভাটিয়ারীতে দুই কক্ষের একটি ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে এখন থাকেন রফিকুল। আজ সকাল আটটার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর মা রোজি আক্তার দিনমজুরের কাজ করতে বাড়ি থেকে বের হয়েছেন। বাড়িতে রয়েছেন রফিকুল ও তাঁর অসুস্থ বাবা বজলুর রহমান।

বাসার সামনে রফিকুল ইসলাম। আজ সকাল ৮টায় সীতাকুন্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের হাসনাবাদ গ্রামে

রফিকুল জানান, ভাটিয়ারী থেকে তাঁর কলেজের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। প্রতিদিন যাতায়াতে প্রায় ১০০ টাকা খরচ হতো। পরিবারের পক্ষে এই খরচ বহন করা কঠিন ছিল। তিনি বলেন, ‘কলেজে যাতায়াতেই অনেক সময় চলে যেত। ফলে নিয়মিত ক্লাস করতে পারিনি। অনলাইনে ক্লাস করে এবং ইউটিউব ঘেঁটে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছিলাম’।

রফিকুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চান। নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আপাতত তাঁর লক্ষ্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। এ জন্য অনলাইনে বিভিন্ন কোর্স করছেন। পাশাপাশি ইউটিউবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতিমূলক বিভিন্ন ভিডিও দেখছেন। ভবিষ্যতে সফল হয়ে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়া মানুষদের সহযোগিতা করতে চান তিনি।

ভাটিয়ারীতে দুই কক্ষের একটি ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে এখন থাকেন রফিকুল। আজ সকাল আটটার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর মা রোজি আক্তার দিনমজুরের কাজ করতে বাড়ি থেকে বের হয়েছেন। বাড়িতে রয়েছেন রফিকুল ও তাঁর অসুস্থ বাবা বজলুর রহমান।

রফিকুলের বাবা বজলুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনার পর দুই বছরের বেশি সময় ছেলেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। তাঁকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে তাঁদের বাড়িঘরসহ যা সম্পদ ছিল, সব বিক্রি করে দিয়েছেন। এরপর শ্বশুরবাড়িতে একটি ঘরে থেকে দিনমজুরের কাজ করতেন। তাঁর ছেলে অত্যন্ত মেধাবী। সে পড়াশোনা করতে চায়। মানুষের সহযোগিতা নিয়ে ছেলের সেই আগ্রহ পূরণের চেষ্টা করছেন তিনি।

বজলুর রহমান জানান, রফিকুলের পড়াশোনাসহ যাবতীয় খরচ বহন করছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী। এসএসসি পরীক্ষার পর প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন দেখে তিনি সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসেন। এ ছাড়া মো. ওসমান নামের একজন শিক্ষক বিনা মূল্যে তাঁকে কোচিং করাতেন।

রফিকুলের একমাত্র বোন রোকাইয়া আক্তারও ভাটিয়ারী বিজয় স্মরণি কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। বজলুর রহমান বলেন, দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো তাঁদের পক্ষে কঠিন ছিল। এখন নিজের ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান। অভাব-অনটনের সংসারে ছেলের একাগ্রতা না থাকলে তাঁকে পড়ানো সম্ভব হতো না। উচ্চশিক্ষা শেষে ছেলে যেন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে, সেটাই তাঁর প্রত্যাশা।

Read full story at source