বাংলা সিনেমা কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে? কী বলছেন নির্মাতারা

· Prothom Alo

বছরের ১১তম মাস চলছে। অথচ এক-দুটি সিনেমা ছাড়া এখন পর্যন্ত বছরের বেশির ভাগ ছবিই বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখ দেখেনি। নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেও দর্শক টানতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে চলচ্চিত্রশিল্প, কী ধরনের পরিবর্তন জরুরি? গল্প, নির্মাণ, পরিবেশনা থেকে শুরু করে সিনেমা প্রদর্শনের পরিসর—শিল্পটির সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন পাঁচ নির্মাতা।

Visit biznow.biz for more information.

চলচ্চিত্রশিল্পে বিনিয়োগ দরকার

তানিম নূর

চলচ্চিত্রশিল্পের উন্নতির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিনিয়োগ। আমাদের দেশে ভালো নির্মাতার অভাব নেই। অনেক তরুণ নির্মাতা ভালো কাজ করার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় তাঁরা নিয়মিত ছবি নির্মাণের সুযোগ পাচ্ছেন না। এ ক্ষেত্রে সরকারেরও কিছু নীতিগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, যাতে বিনিয়োগকারীরা চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হন। বিশেষ করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চলচ্চিত্রশিল্পে যুক্ত করা জরুরি। বিনিয়োগ বাড়লে ছবি নির্মাণের সংখ্যাও বাড়বে। সরকার যদি দেশি সিনেমার জন্য কর মওকুফ করে তাহলে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে নতুন নির্মাতাদের কাজের সুযোগ তৈরি হবে।

তানিম নূর। ছবি: ফেসবুক থেকে

আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশে আরও অনেক ভালো ছবি নির্মাণের সম্ভাবনা রয়েছে। এর উদাহরণ আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি। গত বছর বরবাদ, তাণ্ডব, উৎসবসহ বেশ কয়েকটি ছবি ভালো ব্যবসা করেছে। অর্থাৎ দর্শক ছবি দেখতে চান। ভালো ছবি মুক্তি পেলে দর্শক প্রেক্ষাগৃহে যাচ্ছেন। তাই দর্শক নেই, বিষয়টি এমন নয়। বরং দর্শকের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত ভালো ছবি নির্মাণ ও মুক্তির পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণও খুব বেশি নয়। বছরে ৪০ থেকে ৫০টি ছবি নির্মিত হলেও সব মিলিয়ে এই শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ খুব সীমিত। আমার ধারণা, বছরে ৫০ থেকে ৭০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ হয় না। এত অল্প বিনিয়োগ দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে তোলা কঠিন। তাই নতুন বিনিয়োগকারী ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

তবে শুধু বিনিয়োগ হলেই হবে না, কোন ছবিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এখানে অনেক সময় যথাযথ পরিকল্পনা বা যাচাই-বাছাই ছাড়াই ছবিতে বিনিয়োগ করা হয়। ফলে কোনো ছবি প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা না করলে বিনিয়োগকারীরা বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েন এবং পরবর্তী সময়ে আর বিনিয়োগ করতে চান না। এ জন্য বিনিয়োগের পাশাপাশি ছবির গল্প, নির্মাতা, দর্শক ও বাজারের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে সঠিকভাবে ছবি নির্বাচন বা কিউরেশন করতে হবে।

রায়হান রাফী

ভালো সিনেমা বানালেই ইন্ডাস্ট্রি ঘুরে দাঁড়াবে

রায়হান রাফী

আমরা তো ঘুরে দাঁড়ানোর জায়গাতেই আছি। আমাদের সিনেমা মোটামুটি ভালোই চলছে। আমাদের সিনেমার মান ভালো হচ্ছে। আমাদের শেষ সিনেমাগুলো তো কাজ করেছে। সিনেমা দেখতে হলে যাচ্ছেন দর্শক। এখন আমাদের সিনেমা ঈদের বাইরে হলে নিয়ে আসতে হবে। বেশি বেশি সিনেমা বানাতে হবে, মানসম্পন্ন সিনেমা বানাতে হবে। সেসব সিনেমা বছরজুড়ে মুক্তির পরিকল্পনা করতে হবে। পাঁচ বছর ধরে ঈদে নিয়মিত সিনেমা বানিয়ে আসছি। একটা সময়, ঈদের সিনেমা কোনো আলোচনায় থাকত না। সেখানে আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে ঢালিউড সিনেমা। এগুলো অবশ্যই ইতিবাচক দিক। বেশি বেশি ভালো সিনেমা বানালেই ইন্ডাস্ট্রি ঘুরে দাঁড়াবে, এ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য পেশাদার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান লাগবে। শুটিং করার জন্য যে ধরনের সুবিধা দরকার, সেগুলো থাকতে হবে। অভিজ্ঞতা থেকে বলি, একটা সিনেমা শুটিং পরিকল্পনা করতে চাইলে লোকেশন পারমিশন নিয়ে বড় একটা সময় চলে যায়। কারণ, শুটিংয়ের অনেক লোকেশন পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। এগুলো নিয়ম অনুযায়ী হতে হবে।

সিনেমা নির্মাণকে সহজ করতে হবে। একজন প্রযোজক, পরিচালক যে–ই হোক, সে যেন সহজেই নির্মাণ করতে পারে। এতে তরুণেরা অনেক আগ্রহ নিয়ে সিনেমা বানাতে এগিয়ে আসবে। ঈদে এক ডজন সিনেমা মুক্তি না দিয়ে এর বাইরে ২৬ মার্চ, পূজা, আমাদের মহান বিজয় দিবস—এমন দিনগুলোতে পরিকল্পিতভাবে সিনেমা মুক্তি দিতে হবে। আমি নিজেই চেষ্টা করছি ২৬ মার্চ সিনেমা নিয়ে আসতে। চাইছি একটি উৎসবের আমেজ তৈরি হোক। আর সিনেমা হলগুলো গলিতে, বাসস্ট্যান্ডে না হয়ে প্রধান জায়গাগুলোতে করতে হবে। সেখানে সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে। খাবার থাকবে, কফি শপ থাকবে, কেনাকাটার ব্যবস্থা থাকবে। দর্শক সেখানে গিয়ে সেলফি তুলবেন। আমাদের সিনেমার দর্শক অনেক, বাজারও অনেক বড়। সিনেমা সারা দেশের বড় দর্শকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। তাহলেই ঢালিউডের বাজার ঘুরে দাঁড়াবে।

রুবাইয়াত হোসেন। নির্মাতার সৌজন্যে

চলচ্চিত্র–বিষয়ক যথাযথ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের দরকার

রুবাইয়াত হোসেন

চলচ্চিত্র–বিষয়ক যথাযথ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের দরকার। কারণ, এখন কারিগরি দক্ষতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কারিগরি দক্ষতা শেখার মতো তেমন কোনো জায়গা নেই। আমাদের প্রশিক্ষিত কলাকুশলীরও অভাব। পাশাপাশি পোস্ট-প্রোডাকশনের প্রয়োজনীয় সুবিধাও নেই—যেমন কালার গ্রেডিং, ৫.১ সাউন্ড মিক্সিং, লোকেশন সাউন্ড রেকর্ডিংয়ের সরঞ্জাম। এসব সুবিধা আমাদের এখানে নেই। আমার কাছে মনে হয়, এগুলো যথাযথভাবে করা গেলেই সিনেমাকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

খারাপ চিত্রনাট্য থেকে ভালো সিনেমা প্রায় অসম্ভব

মাকসুদ হোসেন

আমার মনে হয়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গা চিত্রনাট্য। আমরা সব সময় গল্পের কথা বলি। কিন্তু চিত্রনাট্য রচনা যে সম্পূর্ণ আলাদা একটি শিল্পমাধ্যম, সে বিষয়ে আমাদের এখনো যথেষ্ট উপলব্ধি তৈরি হয়নি। এই জায়গায় দক্ষতারও অভাব রয়েছে। একটি ভালো চলচ্চিত্রের ভিত্তি হচ্ছে ভালো চিত্রনাট্য। ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে; কিন্তু সাধারণ নিয়ম হলো, ভালো চিত্রনাট্য থেকে ভালো সিনেমা হতে পারে। খারাপ চিত্রনাট্য থেকে ভালো সিনেমা তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।

চিত্রনাট্য লেখার কৌশল ও ব্যাকরণ সম্পর্কে আমাদের লেখক ও পরিচালকদের আরও দক্ষ হতে হবে। কারণ, চিত্রনাট্য লেখা আর উপন্যাস লেখা এক নয়। দুটির ধরন ও কৌশল আলাদা। এই পার্থক্য বুঝতে হবে এবং চিত্রনাট্য রচনাকে স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে।

চলচ্চিত্র নির্মাতা মাকসুদ হোসেন

এরপর আসে পরিচালনা। একজন পরিচালককে চলচ্চিত্র নির্মাণের আগে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হয়। পরিচালককে বলা হয় চলচ্চিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃজনশীল ব্যক্তি। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর পুরো সিনেমার নির্মাণ নির্ভর করে। কিন্তু সেই প্রস্তুতি কীভাবে নিতে হবে, আমাদের এখানে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা ও চর্চা কতটা আছে, সেটি ভেবে দেখা দরকার।

যেকোনো শিল্পমাধ্যমেই সেরা শিল্পকর্মটি সৃষ্টির জন্য অনুশীলনের বিকল্প নেই। চলচ্চিত্র নির্মাণও তেমন। এ জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি, অনুশীলন ও দক্ষতা প্রয়োজন। আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পে এই প্রস্তুতির জায়গাটিতে আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

আরেকটি বিষয় হলো, ফর্মুলা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একটি সিনেমা ব্যবসাসফল হলেই একই ধরনের আরও ২০টি সিনেমা বানানোর প্রবণতা থেকে বের হতে হবে। কারণ, আমরা দেখেছি, এই কৌশল সব সময় কাজ করছে না। বরং আমাদের মৌলিক গল্প বলতে হবে। তবে শুধু গল্পের ভাবনা ভালো হলেই হবে না, সেটিকে চিত্রনাট্যে যথাযথভাবে তুলে আনতে হবে।

নির্মাতা মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম। ফেসবুক থেকে

চলচ্চিত্রশিল্পের বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি

মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম

চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের আরও অনেক কিছু অনুসন্ধান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে চলচ্চিত্রভাষার জায়গা থেকে নতুন কিছু করার সুযোগ আছে। এ ক্ষেত্রে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় বিকেন্দ্রীকরণ। বিকেন্দ্রীকরণ বলতে আমি শুধু দেশের বিভিন্ন জায়গায় আলাদা আলাদা চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে তোলার কথা বলছি না। বরং দেশের নানা প্রান্ত থেকে নতুন নির্মাতা তৈরি এবং বিভিন্ন ধরনের গল্প বলার সুযোগ সৃষ্টি করাকে বোঝাচ্ছি। চলচ্চিত্র নির্মাণের চর্চা ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে আমাদের সিনেমার বৈচিত্র্য বাড়বে। একই সঙ্গে দেশীয় গল্প ও ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বৈশ্বিক দর্শকের কাছেও পৌঁছানো সম্ভব হবে।

হলে ফিরছেন দর্শক, বাংলা সিনেমা কেন দেখছে না

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশনা (ডিস্ট্রিবিউশন) ও প্রদর্শন (এক্সিবিশন)। আমাদের দেশে সিনেমা প্রদর্শনের জায়গা খুবই সীমিত। পাশাপাশি সিনেমার বিপণন ও প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রেও আমরা এখনো প্রত্যাশিত দক্ষতা দেখাতে পারছি না। একটি সিনেমা নির্মাণের পর সেটি দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় দক্ষ লোকবল ও পেশাদার প্রতিষ্ঠান অনেক সময় পাওয়া যায় না। ভালো পরিবেশক, মার্কেটিং টিম ও প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি রয়েছে। এ জায়গাগুলোতে দক্ষতা ও পেশাদারত্ব বাড়ানো জরুরি।

সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রদর্শনের পরিসর। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও সম্ভাব্য দর্শকের তুলনায় এক পর্দা (সিঙ্গেল স্ক্রিন) কিংবা বহু পর্দা (মাল্টিপ্লেক্স)—দুই ধরনের সিনেমা হলই খুব কম। সরকার এ বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছে, এটি ইতিবাচক। তবে নতুন সিনেমা হল, মাল্টিপ্লেক্স কিংবা মিনি থিয়েটার নির্মাণ বেশ ব্যয়বহুল। তাই কোথায় কী ধরনের অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে দর্শক পাওয়া যাবে কি না এবং বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসার সম্ভাবনা কতটুকু, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে বিকল্প পরিবেশনা ও প্রদর্শনব্যবস্থার কথা ভাবা যেতে পারে। আমাদের দেশে শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভালো অডিটোরিয়াম রয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামও সিনেমা প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব। এসব জায়গায় নিয়মিত সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

Read full story at source