মরিচের গুঁড়ায় তুষ, জিরার নামে ক্যারাওয়ে বীজ, বগুড়ায় ভেজাল মসলার কারবার থামছেই না

· Prothom Alo

বগুড়ার আমদানিকারকদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মসলা আসে দেশীয় বাজারে। মসলার পাইকারি আড়ত বগুড়ার রাজাবাজার থেকে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সারা দেশে আমদানি করা মসলার সরবরাহ হয়। জেলায় উৎপাদিত মরিচ–হলুদেরও সুনাম রয়েছে দেশে। কিন্তু বগুড়ার বিশাল বাজারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলছে ভেজাল মসলার জমজমাট কারবার। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মসলা কারখানায় বা গুদামে নিয়ে ভেজাল মিশিয়ে নামীদামি প্রতিষ্ঠানের নামে মোড়কজাত করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নানা সময়ে ভেজাল মসলার কারবার বন্ধে অভিযান পরিচালনা করে জেল-জরিমানা দিলেও থামছে না এ অসাধু তৎপরতা। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আমদানিকারকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, ভেজাল কারবারিদের কারণে মসলার গুণগত মান ঠিক থাকছে না। এতে বগুড়ার আমদানিকারকদের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন সারা দেশের ব্যবসায়ীরা।

Visit sweetbonanza-app.com for more information.

মরিচের গুঁড়ার সঙ্গে মেশানো হচ্ছে ধানের তুষ

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং র‍্যাব-১২–এর ক্রাইম প্রিভেনশন স্পেশালাইজড কোম্পানি বগুড়া ক্যাম্পের সদস্যরা মঙ্গলবার দুপুরে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করে। শহরের ফতেহ আলী বাজারের দুটি অনুমোদনহীন মসলা কারখানায় অভিযানে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পচা ও নিম্নমানের মরিচের সঙ্গে ধানের তুষ মিশিয়ে গুঁড়া মরিচ তৈরি করায় দোলন মসলা মিলের মালিক মো. দোলনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া বগুড়া হলুদ মিল নামে একটি কারখানায় নষ্ট ও নিম্নমানের হলুদ ভেজাল মিশিয়ে ভালো হলুদ হিসেবে সংরক্ষণ করায় কারখানা মালিক রোকনুজ্জামানকে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়।

অভিযানে অন্যদের মধ্যে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক ফজিলাতুন্নেসা ফৌজিয়া উপস্থিত ছিলেন।

ক্যারাওয়ে বীজ বিক্রি হচ্ছে জিরার দামে

আমদানি করা জিরার সঙ্গে ক্যারাওয়ে সিড মিশিয়ে বিদেশি ব্র্র্যান্ডের মোড়কে প্যাকেটজাত করার খবর পেয়ে গত সোমবার সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায় আরেক অভিযান চালায় জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং র‍্যাব। ওই গুদামে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে জিরার সঙ্গে ক্যারাওয়ে সিড ভেজাল মেশানোর হাতেনাতে প্রমাণ পেয়ে শাহিদ আলম নামের একজন ব্যবসায়ীকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় ৪২ বস্তা জিরা এবং ১৯২ বস্তা ক্যারাওয়ে সিড জব্দ করে যথাযথভাবে বিক্রির জন্য বগুড়া আমদানিকারক ও মসলা ব্যবসায়ী সমিতিকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন বগুড়া জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফয়সাল আহমাদ।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বগুড়া কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. রাসেল প্রথম আলোকে বলেন, আমদানি করা জিরার পাইকারি বাজারমূল্য প্রতি কেজি ৫৬০ থেকে ৫৮০ টাকা। অন্যদিকে সুগন্ধযুক্ত ‘পার্সিয়ান জিরা’ নামে পরিচিত আমদানি করা ক্যারাওয়ে সিডের পাইকারি মূল্য প্রতি কেজি ২৪০ টাকা। এরুলিয়া এলাকার একটি গুদামে দীর্ঘদিন ধরে জিরার সঙ্গে কম দামে আমদানি করা ‘ক্যারাওয়ে সিড’ পলিশ করে প্যাকেটে ভরে ভারতীয় ব্র্যান্ড ‘বিটি ডায়মন্ড জিরা’ নামে মোড়কজাতের কারবার চলছিল। এটা ভোক্তাদের সঙ্গে রীতিমতো প্রতারণা। গোয়েন্দা তথ্যে খবর পেয়ে সেখানে অভিযান চালিয়ে একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

ভেজাল জিরা প্রস্তুতের দায়ে কারখানার মালিককে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। গত সোমবার বগুড়া সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর পূর্বপাড়ায়

বগুড়া জেলা মসলা আমদানিকারক এবং মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এবং ওম এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিমল প্রসাদ (রাজ) প্রথম আলোকে বলেন, বগুড়ায় বছরে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি মসলা আমদানি হয়। এই বিশাল বাজারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি ভেজাল মসলার কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। ভেজাল এই মসলা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে মসলার সঠিক গুণগত মান ঠিক থাকছে না। ফলে বগুড়ার আমদানিকারকেরা ব্যবসায়ীদের আস্থা হারাচ্ছেন। অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা ঠেকাতে প্রশাসনের অভিযান আরও জোরদার করা দরকার।

অভিযানেও থেমে নেই ভেজাল মসলার কারবার

শুধু সাম্প্রতিক অভিযানই নয়, এর আগেও বিভিন্ন সময় ভেজাল মসলা ঠেকাতে অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন। গত দেড় বছরে অন্তত ১০টি বড় অভিযানের খবর পাওয়া যায়।

এর মধ্যে বগুড়ার পাইকারি আড়ত রাজাবাজারে কাপড়ের রং, গোখাদ্য ও ধানের তুষ ব্যবহার করে হলুদ এবং মরিচের গুঁড়ার দায়ে আল-আমিন মসলা মিলে অভিযান তিন লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা কাজিপাড়া এলাকায় কাপড়ের রং ও পচা উপাদান মিশিয়ে ভেজাল মসলা তৈরির দায়ে আরএসি ইন্ডাস্ট্রি নামে অনুমোদনহীন একটি মসলা কারখানায় এ অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ৩ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ছাড়াও একজনকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। বগুড়া শহরের মগলিশপুর এলাকায় নকল কালো এলাচি তৈরির কারখানায় জংলি ফল তারাগোটায় খয়েরের প্রলেপ, রাসায়নিক ও রং মিশিয়ে ‘কালো এলাচি’ হিসেবে বিক্রির দায়ে একজন ব্যবসায়ীর অর্থদণ্ড করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এ ছাড়া বগুড়া শহরের বাদুড়তলা এলাকার মেসার্স আলী এন্টারপ্রাইজের গুদামে জিরার সঙ্গে মহুরিজাতীয় মসলা ও বালু মিশিয়ে এবং জিরায় পানি মিশিয়ে ওজন বাড়িয়ে বাজারজাত করার অপরাধে প্রতিষ্ঠানটির মালিক আলী আহম্মেদকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গোখাদ্যে রং মিশিয়ে গুঁড়া মসলা (হলুদ-মরিচের গুঁড়া) তৈরি করার অপরাধে শহরের রাজাবাজারে মুন্সি হলুদ মিল একটি কারখানায় অভিযান পরিচালনা করে মিলটি সিলগালা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় সেনাবাহিনীর একটি অভিযানে শহরের রাজাবাজার এলাকায় মসলার গোডাউনে অভিযান পরিচালনা করে মেয়াদোত্তীর্ণ ও খাওয়ার অনুপযোগী মসলা মজুত করার দায়ে জাহাঙ্গীর স্টোরকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা শহরের রাজাবাজারে একটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে ইটের গুঁড়া, তুষ ও কাঠের রং মিশিয়ে মসলা তৈরির অপরাধে সুলতান বাদশাহ নামে এক ব্যবসায়ীকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে। শহরের চেলোপাড়ায় গুদামে মজুত করা বিপুল পরিমাণ কালো এলাচি পানি দিয়ে ওজন বৃদ্ধি ও মেয়াদোত্তীর্ণ মসলা মজুত করায় ব্যবসায়ী জগদীশ প্রসাদকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর।

বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের নেফ্রোলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এহসানুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, যেকোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। মসলায় ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হলে তা হৃৎপিণ্ড, লিভার অকেজো করে দিতে পারে। এ ছাড়া ভেজাল মসলায় ক্ষতিকর রং বা রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হলে তা মানবদেহে ক্যানসার ছড়ানো ছাড়াও কিডনি, যকৃৎ বিকল করে দিয়ে মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।

Read full story at source