কক্ষ তাপমাত্রায় কি নিউক্লিয়ার ফিউশন সম্ভব

· Prothom Alo

২৩ মার্চ, ১৯৮৯ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই রসায়নবিদ স্ট্যানলি পনস ও মার্টিন ফ্লেশম্যান তড়িঘড়ি করে একটি সাংবাদ সম্মেলন ডাকলেন। তাঁদের দাবি শুনে পুরো বিশ্ব চমকে উঠল। তাঁরা নাকি সাধারণ ল্যাবরেটরিতে কক্ষ তাপমাত্রাতেই নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটিয়ে ফেলেছেন!

Visit lebandit.lat for more information.

কীভাবে? তাঁরা রসায়নের ল্যাবে ভারী পানির মধ্যে প্যালাডিয়াম ও প্লাটিনামের তড়িৎদ্বার ডুবিয়ে বিদ্যুৎপ্রবাহ চালনা করেন। এতে পানি গরম হতে শুরু করে। তড়িৎ বিশ্লেষণের ফলে ভারী পানি ভেঙে ডিউটেরিয়াম ও অক্সিজেন তৈরি হয় এবং কিছু তাপ উৎপন্ন হয়, যা স্বাভাবিক। কিন্তু ফ্লেশম্যানদের দাবি ছিল অন্য জায়গায়। তাঁরা যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাঠাচ্ছিলেন, উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি! তাঁদের যুক্তি ছিল, প্যালাডিয়াম পরমাণুর কেলাস কাঠামোর ফাঁকে ফাঁকে ডিউটেরিয়াম পরমাণুগুলো ঢুকে জোট বাঁধছে এবং হিলিয়ামের সঙ্গে প্রচুর শক্তি তৈরি করছে। একে বলা যায় টেবিলটপ ফিউশন। গবেষণাপত্র প্রকাশের আগেই তাড়াহুড়ো করে তাঁরা এই যুগান্তকারী দাবি বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন।

বিজ্ঞানীদের করা দাবি নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ

খবরটি শুনে বিশ্বজুড়ে রীতিমতো হইচই পড়ে গেল! এরপর বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা নিজেদের ল্যাবে কক্ষ তাপমাত্রায় ফিউশন বা কোল্ড ফিউশন ঘটানোর চেষ্টা করলেন। ভারতের ভেরিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টার এবং মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চসহ বেশ কয়েকটি ল্যাবরেটরি দাবি করল, তারাও এই কোল্ড ফিউশন ঘটাতে পেরেছে। কিন্তু সুইজারল্যান্ড, জাপান ও ব্রিটেনের মতো দেশগুলোর বিজ্ঞানীরা জানালেন, তাঁরা হাজার চেষ্টা করেও এমন কিছুর প্রমাণ পাননি। এমনকি ব্রুকহ্যাভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও একই পরীক্ষা করে ব্যর্থ হন। শেষমেশ কিছুটা বিরক্ত হয়েই বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এর তৎকালীন প্রখ্যাত সম্পাদক জন ম্যাডক্স লিখলেন, ফ্লেশম্যানদের দাবি একটি বিভ্রম মাত্র! ফলে অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়ে তাঁদের এই কোল্ড ফিউশন তত্ত্ব।

পারমাণবিক ফিউশন: পরবর্তী জ্বালানি বিপ্লব
ফ্লেশম্যানদের যুক্তি ছিল, প্যালাডিয়াম পরমাণুর কেলাস কাঠামোর ফাঁকে ফাঁকে ডিউটেরিয়াম পরমাণুগুলো ঢুকে জোট বাঁধছে এবং হিলিয়ামের সঙ্গে প্রচুর শক্তি তৈরি করছে।

তবে সেই বাতিল হয়ে যাওয়া কাজের অনুপ্রেরণাতেই সম্প্রতি কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী কার্টিস বার্লিঙ্গুয়েটের নেতৃত্বে একদল গবেষক নতুন করে আশা জাগিয়েছেন। তাঁরা একটি টেবিলটপ কণা ত্বরক তৈরি করেছেন, যেখানে তুলনামূলক কম তাপমাত্রাতেই নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটানো সম্ভব হয়েছে। তাঁদের এই যুগান্তকারী গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে নেচার সাময়িকীতে।

বিজ্ঞানীদের তৈরি থান্ডারবার্ড রিঅ্যাক্টরের সেটআপ

ফ্লেশম্যানদের মতো এই গবেষকেরাও ডিউটেরিয়াম এবং প্যালাডিয়াম ব্যবহার করেছেন। তবে তাঁদের পদ্ধতির ভিন্নতা রয়েছে। তাঁরা থান্ডারবার্ড নামে একটি চুল্লিতে উচ্চশক্তির ডিউটেরিয়াম রশ্মি একটি প্যালাডিয়াম দণ্ডে নিক্ষেপ করেন। প্যালাডিয়াম দণ্ডটি এই ডিউটেরনগুলোকে শোষণ করতে শুরু করে। শোষিত ডিউটেরনগুলো আবার নতুন আসা ডিউটেরিয়ামের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নিউট্রন কণা তৈরি করে। পরীক্ষা শুরুর প্রথম ৩০ মিনিটের মধ্যেই নিউট্রন উৎপাদনের হার দ্রুত বাড়তে থাকে। এই নিউট্রন নির্গমন থেকেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, সেখানে ফিউশন বিক্রিয়া ঘটছে এবং প্যালাডিয়াম রডটি সর্বোচ্চ পরিমাণ ডিউটেরন শোষণ করেছে।

ফিউশনের হার আরও বাড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এরপর ভারী পানি (ডিউটেরিয়াম অক্সাইড) দিয়ে একটি তড়িৎ-রাসায়নিক পদ্ধতি চালু করেন। বিদ্যুৎপ্রবাহের ফলে ভারী পানি ভেঙে ডিউটেরিয়াম মুক্ত হয় এবং প্যালাডিয়াম দণ্ডে জমা হতে থাকে। এতে তড়িৎদ্বারে ডিউটেরিয়ামের ঘনত্ব এতটাই বেড়ে যায় যে ফিউশনের হারও ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। গবেষকেরা খেয়াল করেন, এই পদ্ধতিতে ফিউশনের হার শতকরা প্রায় ১৫ ভাগ বেড়ে যায়।

ফিউশন রিয়েক্টরের নতুন সম্ভাবনা
শোষিত ডিউটেরনগুলো আবার নতুন আসা ডিউটেরিয়ামের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নিউট্রন কণা তৈরি করে। পরীক্ষা শুরুর প্রথম ৩০ মিনিটের মধ্যেই নিউট্রন উৎপাদনের হার দ্রুত বাড়তে থাকে।

তবে মনে রাখা জরুরি, এই পরীক্ষায় বিশাল কোনো শক্তি উৎপন্ন হয়নি। এই রিঅ্যাক্টর থেকে ফিউশনের মাধ্যমে এক ওয়াটের এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ (ন্যানো-ওয়াট) শক্তি উৎপন্ন হয়েছে। অথচ এটি চালাতেই খরচ হয়েছে ১৫ ওয়াট বিদ্যুৎ! তাই এটি দিয়ে এখনই আমাদের বাসাবাড়ির ফ্রিজ বা টিভি চালানো সম্ভব নয়। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণ ও সংকট এবং প্রচলিত নিউক্লিয়ার ফিশন চুল্লির তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের কথা মাথায় রাখলে, কম শক্তির ফিউশন বিক্রিয়া ঘটানোর এই প্রাথমিক সাফল্যও পরিচ্ছন্ন শক্তির সন্ধানে এক বিরাট মাইলফলক।

কিন্তু মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হলো, তাঁরা কি সত্যিই কক্ষ তাপমাত্রায় নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন?

যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই রসায়নবিদ স্ট্যানলি পনস ও মার্টিন ফ্লেশম্যান

যদিও ফ্লেশম্যানদের কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে বার্লিঙ্গুয়েট ও তাঁর দল থান্ডারবার্ড চুল্লিতে ফিউশন বিক্রিয়া ঘটাতে পেরেছেন, তবু তাঁদের কাজের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ফ্লেশম্যানরা কাজ করেছিলেন কক্ষ তাপমাত্রায় সাধারণ তড়িৎ-রসায়নের নীতি মেনে। অন্যদিকে বার্লিঙ্গুয়েটের দল ব্যবহার করেছেন শক্তিশালী ডিউটেরিয়াম রশ্মি, যা প্লাজমা থ্রাস্টার দিয়ে নিক্ষেপ করা হয়। এই রশ্মির ভেতরের কণাগুলোর শক্তি বা তাপমাত্রা কয়েক শ মিলিয়ন ডিগ্রি কেলভিনের সমতুল্য! যেখানে সাধারণ হট ফিউশন বিক্রিয়ার জন্যই ১০০ মিলিয়ন কেলভিন তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। তাই একে আক্ষরিক অর্থে কক্ষ তাপমাত্রার কোল্ড ফিউশন বলা যায় না।

নিউক্লিয়ার ঘড়ি কীভাবে কাজ করে
ফ্লেশম্যানরা কাজ করেছিলেন কক্ষ তাপমাত্রায় সাধারণ তড়িৎ-রসায়নের নীতি মেনে। আর বার্লিঙ্গুয়েটের দল ব্যবহার করেছেন শক্তিশালী ডিউটেরিয়াম রশ্মি, যা প্লাজমা থ্রাস্টার দিয়ে নিক্ষেপ করা হয়।

সে হট ফিউশন হোক বা কোল্ড, তাঁদের এই আবিষ্কার কি অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর শক্তির চাহিদা মেটাতে পারবে? এর উত্তর এককথায় দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে বার্লিঙ্গুয়েট আশাবাদী, শক্তির পাশাপাশি তাঁদের এই কৌশলটি ভবিষ্যতে সুপারকন্ডাক্টর বা অতিপরিবাহী তৈরিতে ব্যাপক কাজে লাগবে। বর্তমান বিশ্বে যেসব অতিপরিবাহী পদার্থের চাহিদা রয়েছে, সেগুলোতে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোজেন থাকে। আর ডিউটেরিয়াম তো হাইড্রোজেনেরই একটি আইসোটোপ। এসব অতিপরিবাহী তৈরি করতে যে প্রচণ্ড চাপ ও উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়, তা এই থান্ডারবার্ড চুল্লির প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই অর্জন করা সম্ভব।

লেখক: পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ বিচার সহায়ক বিজ্ঞান পরীক্ষাগার, কলকাতা, ভারতসূত্র: নেচারনিউক্লিয়ার বর্জ্য থেকে ব্যাটারি তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা

Read full story at source