বিতর্ক-চাপ পেছনে ফেলে চতুর্থ জয় লুৎফুরের

· Prothom Alo

পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে ২০১০ সালে প্রথমবার সরাসরি মেয়র নির্বাচনে লেবার পার্টি থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন লুৎফুর রহমান। কিন্তু নির্বাচনের আগে হঠাৎ করেই লেবার পার্টি তাঁর মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে দল ছাড়েন লুৎফুর রহমান। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ২৩ হাজার ২৮৩ ভোট পেয়ে লেবার প্রার্থী হেলাল আব্বাসকে ৭ হাজার ৩৫২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। এরপর থেকে টাওয়ার হ্যামলেটসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কোনো নির্বাচনে আর হারেননি তিনি। প্রতিবারই লেবারের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই বরোতে (স্থানীয় কর্তৃপক্ষ) লেবারকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন।

Visit newsbetsport.bond for more information.

গত ৭ মে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে টানা চতুর্থবারের মতো নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হন এসপায়ার পার্টির নেতা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লুৎফুর রহমান।

গত শুক্রবার প্রকাশিত ফলাফলে লুৎফুর রহমান ৩৫ হাজার ৬৭৯ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টির সিরাজুল ইসলাম পেয়েছেন ১৯ হাজার ৪৫৪ ভোট। কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, এবার বরোটিতে মোট ভোটার ছিলেন ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০ জন। ভোট পড়েছে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ।

মেয়র নির্বাচনে জয়ের পাশাপাশি কাউন্সিল নির্বাচনেও বড় সাফল্য পেয়েছে লুৎফুর রহমানের এসপায়ার পার্টি। শনিবার প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, ৪৫ সদস্যের কাউন্সিলে দলটি ৩০টি আসনে জয় পেয়ে রেকর্ড সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।

লুৎফুর রহমানের এই জয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ষষ্ঠ বিজয়। তিনি প্রথমে ২০০২ সালে এবং পরে ২০০৬ সালে লেবার পার্টির মনোনয়নে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০১০ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে টাওয়ার হ্যামলেটসের সরাসরি নির্বাচিত মেয়র হন। তখন তিনি যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম নির্বাহী মেয়র এবং প্রথম অশ্বেতাঙ্গ মেয়র হিসেবে আলোচনায় আসেন। ২০১৪ সালে তিনি পুনর্নির্বাচিত হন।

আদালতের রায়ে ২০১৫ সালে পদ হারানোর পর পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ২০২২ সালে এসপায়ার পার্টির হয়ে আবারও নির্বাচিত হন লুৎফর রহমান। এবার তাঁর আরেকটি জয় মূলধারার বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাবকে আবারও সামনে এনেছে।

এই বিজয়ের তাৎপর্য আরও বেড়েছে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় সরকারের তদারকির প্রেক্ষাপটে। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের শাসনব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগের পর সরকার ২০২৫ সালে ‘মিনিস্টেরিয়াল এনভয়’ নিয়োগ করে। এনভয়দের দায়িত্ব ছিল কাউন্সিলের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, পরামর্শ, চ্যালেঞ্জ এবং সরকারের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে লুৎফুর রহমানের প্রশাসনের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল। তবে সরকারি তদারকি, অতীত বিতর্ক এবং জাতীয় রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও লুৎফুর রহমান ভোটারদের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর প্রচারণার কেন্দ্রে ছিল আগের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং কমিউনিটির কল্যাণ।

লুৎফর রহমান বিনা মূল্যে স্কুল মিল, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অনুদান, এ–লেভেল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ভাতা, ফ্রি হোম কেয়ার, ইয়ুথ সার্ভিসে বিনিয়োগ, ফ্রি সুইমিং, কাউন্সিল ঘরবাড়ি উন্নয়ন এবং নতুন আবাসন নির্মাণের মতো স্থানীয় সেবা নির্ভর প্রতিশ্রুতিগুলো সামনে আনেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, টাওয়ার হ্যামলেটসে লুৎফুর রহমানের শক্তি তিন জায়গায়। বাংলাদেশি ও সংখ্যালঘু কমিউনিটির ভোটব্যাংক, এসপায়ার পার্টির ল ওয়ার্ডভিত্তিক সংগঠন এবং স্থানীয় সেবা নির্ভর প্রচারণা। জাতীয় রাজনীতির বড় বিতর্কের বদলে তিনি ভোটারদের সামনে এনেছেন পরিবার, শিক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও কাউন্সিল সেবার প্রশ্ন।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দুই প্রার্থীর জয়

লুৎফুর রহমানের সমর্থকেরা মনে করেন, সরকারিভাবে তদারকি আরোপ করা হলেও সাধারণ ভোটারদের বড় অংশ সেটিকে স্থানীয় সেবার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখেছে। তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল বিনা মূল্যে খাবার, শিক্ষা সহায়তা, আবাসন, যুবসেবা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় কাউন্সিলের ভূমিকা।

ব্রিটিশ স্থানীয় রাজনীতিতে লুৎফুর রহমানের এই ধারাবাহিক সাফল্য বিরল। একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে লেবার পার্টি, কনজারভেটিভ পার্টি, লিবডেম এবং গ্রিন পার্টির মতো মূলধারার বড় দলগুলোর বাইরে দাঁড়িয়ে চারবার সরাসরি মেয়র নির্বাচনে জয় পাওয়া যুক্তরাজ্যের স্থানীয় রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিতর্কমুক্ত নয়, তবু টাওয়ার হ্যামলেটসের ভোটাররা আবারও তাঁকে নেতৃত্বের দায়িত্ব দিয়েছেন, যা পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক শক্তির বড় প্রতিফলন।

লুৎফুর রহমান বরাবরই সাবেক লেবার নেতা জেরেমি করবিনের সমর্থন পেয়েছেন। এবারের নির্বাচনী প্রচারণার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও জেরেমি করবিন উপস্থিত ছিলেন।

যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত ডেইলি ড্যাজলিং ডনের প্রকাশক সাংবাদিক মুনজের আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘এখানে অন্য যাঁরা প্রার্থী ছিলেন, তাঁরা নেতৃত্বের দক্ষতা, কৌশল ও জন–আস্থার বিচারে লুৎফুর রহমানের কাছাকাছি পৌঁছানোর মতো কেউ ছিলেন না। টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলাদেশিরা বরাবরই দল নয়, প্রার্থী দেখে ভোট দেন। সে কারণেই লুৎফুর রহমানের এ বিশাল বিজয়।’

জয়ের পর প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে লুৎফুর রহমান বলেন, ‘আমাকে ও এসপায়ার দলকে পুনর্নির্বাচিত করায় টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণকে ধন্যবাদ। আমরা জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলা, সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ ও কমিউনিটি–কেন্দ্রিক সেবা অব্যাহত রাখব। আমাদের স্লোগান “এসপায়ার ফর ডেলিভারি অ্যান্ড কমিউনিটি” তথা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও কমিউনিটির কল্যাণে এসপায়ার ।’

লুৎফুর রহমান বলেন, এসপায়ার প্রশাসন দেশের প্রথম কাউন্সিল হিসেবে সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর জন্য সার্বজনীন ফ্রি স্কুল মিল এবং এ–লেভেল শিক্ষার্থীদের জন্য এডুকেশন মেইনটেন্যান্স অ্যালাউন্স পুনরায় চালু করেছে। নতুন মেয়াদে কম আয়ের পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি ট্রাভেল পাস চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

টাওয়ার হ্যামলেটসকে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার ও সিটি অব লন্ডনের পর তৃতীয় বৃহৎ স্থানীয় অর্থনৈতিক হাব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কাউন্সিলটির বার্ষিক নেট বাজেট বর্তমানে ৫০ কোটি পাউন্ডের বেশি। নির্বাহী মেয়র হিসেবে লুৎফুর রহমান কয়েক শ কোটি পাউন্ডের বাজেট, আবাসন, শিক্ষা, সামাজিক সেবা ও স্থানীয় উন্নয়ন নীতির ওপর সরাসরি প্রভাব রাখার ক্ষমতা রাখেন। লন্ডনের ৩২টি বরোর মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে এই ধরনের শক্তিশালী নির্বাহী মেয়র ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

পূর্ব লন্ডনের স্থানীয় নির্বাচনে লড়ছেন তিন শতাধিক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী

Read full story at source