আনিসুজ্জামান চৌধুরীর জিডিপি প্রবৃদ্ধির ‘নতুন তত্ত্ব’

· Prothom Alo

১১ মে প্রথম আলোয় আমার কলাম, ‘বিএনপি কি একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি হাতে পেয়েছে’ ছাপা হয়েছিল। তার জবাবে ১৮ মে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান চৌধুরী ‘বিরূপাক্ষ পালের লেখাটির ব্যাখ্যা কী’ শিরোনামে একটি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ড. চৌধুরী একজন ইমেরিটাস অধ্যাপক, জাতিসংঘেও কাজ করেছেন এবং সবশেষে তিনি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারে অধ্যাপক ইউনূসের বিশেষ সহকারী। এতখানি ‘হাই প্রোফাইল’-এর একজন মানুষ কী করে ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ গাইলেন, বোঝা গেল না।

Visit afnews.co.za for more information.

আমার বক্তব্য ছিল—বিএনপি একেবারে ভঙ্গুর একটি অর্থনীতি হাতে পায়নি, যদিও এতে অনেক সমস্যা বিদ্যমান। শেষ দিকে আওয়ামী অর্থনীতি সংকটাপন্ন হয়েছিল। ব্যাংকিং খাত হয়েছিল লুণ্ঠিত। কিন্তু ড. ইউনূসের আমলে সমস্যাগুলো আরও অবনতির দিকে গেছে, যা বিএনপির পথচলাকে কঠিন করেছে। তারপরও বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্ভাবনাময়, যার ওপর ভিত্তি করে বিএনপি কাজ করতে পারবে।

রাষ্ট্র আজ উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি লাভের দ্বারপ্রান্তে। আওয়ামী আমলের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মাথাপিছু আয়, সামাজিক পুঁজি ও অবকাঠামোর অর্জনগুলো বিএনপিকে বাড়তি সহায়তা দেবে। কারণ, উন্নয়ন সব দেশেই একটি ক্রমসঞ্চয়মান প্রক্রিয়া বা ‘কিউমিলেটিভ প্রসেস’। এতেই ড. চৌধুরী আমার রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব আবিষ্কার করলেন। তিনি যখন ইউনূস আমলের সাফাই গাইলেন, তখন সেটি কি তাঁর রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব নয়? আমি বিশ্বব্যাংকের ৩৬ বছরের তথ্যভান্ডার ব্যবহার করেছি। তিনি দেড় বছরের শাসনামলের কোনো তথ্য না দিয়েই আমার ইতিহাসজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ড. চৌধুরী লিখেছেন যে আমি নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে ‘ভণ্ডামির ছোঁয়া’ বলেছি। এই শব্দদ্বয় তিনি কোথায় পেলেন? আমি যদি মব-যুগের জাদুস্পর্শ লিখে থাকি, তাহলে তাতে রয়েছে শ্লেষ ও রসবোধের মিশ্রণ, যা লেখকের নিজস্ব শৈলী।

সস্তা কথায় যেমন চিড়া ভেজে না, মাথাপিছু আয় না বাড়লে উন্নয়নের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয় না। সে জন্যই বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন জাতির শ্রেণিবিন্যাসের কাজে মাথাপিছু আয়কে ব্যবহার করে থাকে।

ড. চৌধুরীর অভিযোগমতে আমি নাকি কোনো প্রমাণ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই দাবি করেছি যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মুদ্রাস্ফীতি কমেনি, বেকারত্ব বেড়েছে, বিনিয়োগ কমেছে এবং দারিদ্র্য বেড়েছে। কলামের ক্ষুদ্র পরিসরে সব বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এই চলকগুলো ইউনূস আমলের অগ্নিসভ্যতায় উন্নতির পথে গেছে, এ রকম কোনো তথ্যপ্রমাণও ড. চৌধুরী হাজির করতে পারেননি। আমি বিশ্বব্যাংকের তথ্যভান্ডার থেকে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের গত ২৪ বছরের অঙ্কগুলো ব্যবহার করে প্রবৃদ্ধির হিসাব কষেছি। পক্ষান্তরে ড. চৌধুরীর লেখায় কোথাও কোনো তথ্য বা সংখ্যার নামগন্ধ ছিল না। তিনি আমার মধ্যে অর্থশাস্ত্রের ধারণাগত ‘অভাব’ আবিষ্কার করলেও নিজের ‘দুর্ভিক্ষ’ দেখতে পাননি।

ড. চৌধুরীর অভিযোগ, আমি নাকি আওয়ামী অর্থনৈতিক অবস্থাকে ‘ধামাচাপা’ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি লিখেছি, ‘আওয়ামী অর্থনীতি কোভিড-উত্তর সময়কালে দরবেশ যুগে প্রবেশ করেছিল—সে কথা সবারই জানা।’ কলামের শেষ দিকে লিখেছি, ‘বিএনপির শেষ বছর (২০০৬) খেলাপি ঋণের হার শতকরা ১৩ ভাগে উঠলেও এটি বর্তমানে ৩০ ভাগের ওপর। এটি আওয়ামী লীগের সবচেয়ে ব্যর্থ ও কালিমালিপ্ত জায়গা। ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সমর্থন কিনেছিল দলটি। ধনিকগোষ্ঠী তখন লুটের সনদ পেয়ে ব্যাংক খাতকে ফোকলা করে দিয়েছে।’ ড. চৌধুরী আমার পুরো লেখাটি না পড়েই সম্ভবত তাঁর প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। 

ড. চৌধুরীর কথায় আওয়ামী আমলের শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্য করে দেওয়া হয়েছিল। এই তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-এর ৩১ জুলাই রিজার্ভ ছিল প্রায় সাড়ে ২০ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬-এর ১০ ফেব্রুয়ারিতে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। সে জন্যই আমি লিখেছি, ‘রিজার্ভ সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার বাড়লেও সেটি সম্ভব হয়েছে পুঁজি পণ্যের আমদানিতে কষনির কারণে। এর ফলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে চলে গেছে তিন দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে।’ একজন অর্থনীতিবিদ সাড়ে ২০ বিলিয়ন ডলারকে একেবারে ‘শূন্য’ ঘোষণা করতে পারেন কি?

ড. চৌধুরী লিখেছেন যে ড. ইউনূস অর্থনীতির অবস্থাকে গাজার ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে তুলনা করায় আমি নাকি অসন্তুষ্ট। আসলে আমি হতাশ। ড. ইউনূসের মতো অর্থশাস্ত্রে মার্কিন প্রশিক্ষিত একজন ডক্টরেট বাংলাদেশকে কী করে ‘গাজার ধ্বংসস্তূপের’ সঙ্গে তুলনা করেন? কোনো রেটিং এজেন্সি বা বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ২০২৪-এর বার্ষিক প্রতিবেদন সে কথা বলে না। বাংলাদেশকে গাজা বলা মানে মব-যুগের অগ্নিসভ্যতার অকর্মণ্যতা ঢাকার ফন্দি হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ আছে।

ড. চৌধুরী জাতীয় আয় বা জিডিপি বৃদ্ধির অপকারিতা নিয়ে এক ‘নতুন তত্ত্বের’ অবতারণা করে ফেলেছেন। কারণ, বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী আওয়ামী আমলে মাথাপিছু জিডিপির বৃদ্ধি ছিল এই অঞ্চলে সর্বোচ্চ।

আমি কখনো বলিনি যে একমাত্র মাথাপিছু জিডিপিই উন্নয়নের সর্বাত্মক সূচক। কিন্তু সস্তা কথায় যেমন চিড়া ভেজে না, মাথাপিছু আয় না বাড়লে উন্নয়নের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয় না। সে জন্যই বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন জাতির শ্রেণিবিন্যাসের কাজে মাথাপিছু আয়কে ব্যবহার করে থাকে।

ড. চৌধুরী বলেন যে খারাপ কাজ থেকেও জিডিপি বাড়তে পারে। ‘বন্দিশিবির বা আয়নাঘর তৈরি করলেও জিডিপি বাড়বে। বেসরকারি ব্যবস্থার পক্ষে জনস্বাস্থ্য বা শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করলেও জিডিপি বাড়বে। আরও ইয়াবা উৎপাদন করলেও জিডিপি বাড়বে। জিডিপি আরও বাড়বে, যদি আপনি আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটান এবং বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিকীকরণ করেন, যার ফলে আরও বেশি তালা তৈরি হবে, ঘুষের ব্যবসা ব্যাপক আকার ধারণ করবে এবং বেসরকারি নিরাপত্তাব্যবস্থার বিস্তার ঘটবে।’

ড. চৌধুরী তাঁর এই ‘প্রবৃদ্ধির নবতত্ত্বের’ পক্ষে একজন সুস্থ অর্থনীতিবিদকেও জোগাড় করতে পারেন কি? আওয়ামী আমলের প্রবৃদ্ধিতে অনেক ত্রুটি ছিল বৈকি, যেমন আয়বৈষম্য বৃদ্ধি। কিন্তু সেটি শুধু আয়নাঘর, তালার ফ্যাক্টরি বা ইয়াবা উৎপাদনের যোগফল নয়। ড. চৌধুরী উল্লিখিত এই অনাচারগুলো প্রবৃদ্ধি বাড়ালে ড. ইউনূসের মব যুগ ৫৫ বছরের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করত। প্রতিষ্ঠান, বিচারিক গতি, নৈতিকতা, অবকাঠামো ও জীবনযাত্রার মান উন্নত না করলে কোনো জাতির প্রবৃদ্ধিই টেকসই হয় না।

  • ড. বিরূপাক্ষ পাল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ড-এ অর্থনীতির অধ্যাপক

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source