সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রাকে না বলুন

· Prothom Alo

‘সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রা, রুখতে হবে এখনই’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ব্র্যাক ও প্রথম আলো।

Visit mwafrika.life for more information.

রঙিন জীবনের স্বপ্ন এবং অর্থনৈতিক মুক্তির আশায় সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন একশ্রেণির মানুষ। দালাল চক্রের ফাঁদে পড়ে এ পথে যেতে গিয়ে নির্মম নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। কেউ কেউ সাগরে ডুবে মারা যাচ্ছেন, কারও কারও নির্যাতনেই মৃত্যু হয়। এমন যাত্রার কারণে দেশের মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাই সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রাকে না বলতে হবে।

গতকাল শনিবার পর্যটন শহর কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথাগুলো বলেন। অস্ট্রেলিয়া সরকারের সহযোগিতায় ব্র্যাক ও প্রথম আলো যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। কক্সবাজারের সায়মন বিচ রিসোর্টের সম্মেলনকক্ষে ‘সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রা, রুখতে হবে এখনই’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠক বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত চলে।

বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, সমুদ্রপথে ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যাত্রা থামাতে হবে। এমনিতেই অনেক সমস্যা তৈরি হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ে আসা ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দুঃসহ বর্ণনার বরাত দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রঙিন জীবনের স্বপ্নে, উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন। দালালদের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে জমিজমা বিক্রি করে, ধারকর্জ করে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাত্রা করেন লোকজন। কিন্তু মাঝপথে ভয়াবহ ঘটনার শিকার হতে হয়। দালালেরা তাঁদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করেন। তাঁদের ন্যূনতম খাবার-পানি পর্যন্ত দেওয়া হয় না। অনেকে মাঝপথে মারা যান। যাঁরা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের তীরে ভিড়তে পারেন, সেখানে পুলিশের হাতে আটক হন।

এ ধরনের ঘটনা শুধু ভুক্তভোগী নন, তাঁর পরিবার ও সমাজের জন্য মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।

বিদেশগামীদের জন্য দেশে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র (টিটিসি) থাকলেও কিছু কেন্দ্র পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন নয় বলে গোলটেবিল বৈঠকে জানান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। তিনি বলেন, এগুলোর মান বাড়ানোর জন্য কাজ চলছে।

সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রা বন্ধে একেবারে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রচারণা চালানোর পক্ষে মত দেন প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। তিনি বলেন, এমন প্রচারণার কাজে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিওর পাশাপাশি রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। গণমাধ্যমকর্মীদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।

জাহাজে তোলার পর শুরু হয় নির্যাতন

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূল দিয়ে বিদেশযাত্রা রুখতে প্রশাসন অনেক বেশি তৎপর। এনজিও ও সাধারণ মানুষকে প্রশাসনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের ক্যাম্প ইনচার্জ ও উপসচিব সুরাইয়া আক্তার সুইটি বলেন, বাংলাদেশিদের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের মধ্যেও সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রার প্রবণতা বেশি, বিশেষ করে কিশোরীদের। তাদের ‘বেটার হাজবেন্ড’ বা ভালো স্বামীর প্রলোভন দেখিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবেই অনেক নারী পাচারের শিকার হন।

বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের পূর্ব জোনের (চট্টগ্রাম) জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রার একটি রুট হচ্ছে কক্সবাজার। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এনে এখানে পাহাড়সহ বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়। সময়-সুযোগ বুঝে তাঁদের ছোট ছোট নৌকা করে এনে বড় ট্রলার বা জাহাজে নিয়ে যাওয়া হয়। যাত্রার আগে তাঁদের নানা ধরনের স্বপ্নের কথা শোনানো হয়, কিন্তু জাহাজে তোলার পর থেকে শুরু হয় নির্যাতন–নিপীড়ন। দোষীদের শাস্তি হলে এ ধরনের ঘটনা কমত।

শুধু আইনের প্রয়োগ করে সমুদ্রপথে অবৈধ বিদেশযাত্রা থামানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন জেলা পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান। তিনি বলেন, এ ধরনের বিদেশযাত্রা বন্ধে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের এগিয়ে আসতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে হবে।

‘এই ১ নম্বর হওয়া ভীষণ বিব্রতকর’

গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান। তিনি বাংলাদেশের অভিবাসন-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য–উপাত্ত তুলে ধরেন।

নিজের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শরিফুল ইসলাম হাসান গোলটেবিল বৈঠকে বলেন, ২০১১ সালের দিকে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার সময় অনেক বাংলাদেশি মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছিল থাইল্যান্ডে। এই মৃত ব্যক্তিদের কোনো নাম-পরিচয় ছিল না। শুধু সংখ্যার মাধ্যমে তাঁদের কবরগুলো চিহ্নিত করে রাখা হয়েছিল। ১৪ বছর পার হলেও এখনো এমন অবস্থার পরিবর্তন হয়নি।

শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়া দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এই ১ নম্বর হওয়া দেশের জন্য ভীষণ বিব্রতকর।

সবার চেষ্টায় এ দেশে অ্যাসিড–সন্ত্রাস বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে উল্লেখ করে শরিফুল ইসলাম আরও বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশযাত্রাও বন্ধ করা সম্ভব হবে।

‘আমার সব এলোমেলো হয়ে গেল’

গোলটেবিল বৈঠকে দালালদের মাধ্যমে বিদেশ যেতে গিয়ে প্রতারণার শিকার দুজন বক্তব্য দেন।

তাঁদের একজন অং অং উ জুয়েল। কলেজে পড়াশোনার সময় দালালদের খপ্পরে পড়েন জানিয়ে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেন দালালেরা। এ জন্য দিতে হয় ১২ লাখ টাকা। প্রথমে কক্সবাজার থেকে মিয়ানমার নিয়ে যান। সেখানেই পুলিশের হাতে আটক হয়ে ঠাঁই হয় কারাগারে। পরে কারাগারে থাকার সময় এক পুলিশ সদস্যের সাহায্যে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। দূতাবাসের সহায়তায় পরে দেশে ফিরে আসেন।

এই তরুণ বলেন, দেশে ফিরে এসে দেখেন, তাঁর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।

জুয়েলের মতো দুর্ভাগ্যের শিকার আরেকজন মালয়েশিয়াফেরত তারেকুর রহমান। কক্সবাজারের মহেশখালীর এই বাসিন্দা বলেন, দালাল মালয়েশিয়ায় ভালো চাকরির সুযোগের কথা বলে জাহাজে তুলে নেন। কিন্তু মিয়ানমার নিয়ে গিয়ে এক লাখ টাকা নেন পরিবারের কাছ থেকে। পরে থাইল্যান্ডে নিয়ে গিয়ে নেন আরও সাত লাখ টাকা। কিন্তু মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে সীমান্তে ধরা পড়া যান। জেল খেটে পরে দেশে ফেরত এসেছেন।

গোলটেবিল বৈঠকে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর কক্সবাজারের নিজস্ব প্রতিবেদক আব্দুল কুদ্দুস। আরও বক্তব্য দেন ইউএনএইচসিআরের সহকারী প্রতিনিধি আস্ট্রিড ক্যাসেলিন, কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোবারক হোসেন, কক্সবাজার জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক লিটন কান্তি চৌধুরী, রামু টিটিসির অধ্যক্ষ মো. শাহ জালাল, ভুক্তভোগী হামিদা ইয়াসমিন, কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারি, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির বিশ্বজিৎ ভৌমিক, ব্র্যাকের মানবিক সংকট ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক ও অফিস ইনচার্জ রেজাউল করিম, ইপসার কক্সবাজারের আঞ্চলিক প্রধান ও উপপরিচালক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম।

গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী

Read full story at source