পে স্কেল: উন্নয়ন, নাকি টিকে থাকার লড়াই

· Prothom Alo

বাংলাদেশে যখনই পে স্কেল বৃদ্ধির আলোচনা ওঠে, তখনই একটি পরিচিত আশঙ্কা সামনে আসে—বেতন বাড়লে বাজারদরও বাড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিই কি মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ? এই যুক্তি আংশিক সত্য হলেও পুরো বাস্তব নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মূল্যস্ফীতির বড় অংশ আসে স্ট্রাকচারাল ইনইফিশিয়েন্সি থেকে, শুধু মজুরি বৃদ্ধি থেকে নয়। অর্থাৎ একজন নিম্ন বা মধ্যবিত্ত কর্মচারীর বেতন কিছুটা বাড়লেই বাজার অস্থির হয়ে যায়, এ ধারণা বাস্তবতার সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। বাংলাদেশে মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণ হলো দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা, বাজার সিন্ডিকেট, আমদানিনির্ভরতা, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও বাজার তদারকির সীমাবদ্ধতা। ফলে বেতন বৃদ্ধি অনেক সময় মূল্যস্ফীতির কারণ নয়; বরং মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশে ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে স্কেল ছিল স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় বেতন পুনর্গঠন। তখন সরকারি কর্মচারীদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, দুর্নীতি কমানো ও সরকারি চাকরিকে আরও আকর্ষণীয় করা। কিন্তু দেখা যায়, বেতন বাড়ানোর কয়েক বছরের মধ্যেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সেই বাড়তি সুবিধাকে কমিয়ে দেয়। বাস্তবে পে স্কেল বৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রেই লাইফ আপগ্রেড নয়; বরং স্ট্যাটাস মেইনটেন্যান্সে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ নতুন জীবনমান অর্জন করতে পারছে না; বরং পুরোনো জীবনযাত্রা টিকিয়ে রাখতেই সংগ্রাম করছে। এ কারণেই বেতন বৃদ্ধি প্রকৃত উন্নয়নের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আয় বৈষম্য, নাগরিক ব্যয় বৃদ্ধি ও বাস্তব মজুরি পতনের কারণে বেতন বৃদ্ধির সুফলও সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে পে স্কেল বাড়ানো সার্বিক ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারেনি।

Visit betsport.cv for more information.

বাংলাদেশে পে স্কেল নিয়ে আলোচনার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, আমরা বেতনকে শুধু আয় হিসেবে দেখি, কিন্তু সক্ষমতা হিসেবে দেখি না। অথচ অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর ‘Capability Approach’–এ দেখিয়েছেন, মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে সে কী করতে পারছে এবং কী হতে পারছে, তার ওপর। একজন ব্যক্তি মাসে ৭০ হাজার টাকা আয় করলেও যদি নিরাপদ চিকিৎসা, মানসম্মত শিক্ষা, সুস্থ পরিবেশ, মানসিক স্বস্তি ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা না পান, তাহলে তার জীবনমানকে প্রকৃত উন্নয়ন বলা যায় না। কারণ, এখানে আয় বাড়লেও অনিশ্চয়তা কমছে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ আয়ের অনিরাপদ মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হচ্ছে।

অনেকেই মনে করেন, বেতন বাড়লেই জীবনমান উন্নত হবে, কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। জীবনমান শুধু মাস শেষে কত টাকা হাতে আসে, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই টাকায় একজন মানুষ কতটা নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছে, সেটিই মূল বিষয়। আধুনিক অর্থনৈতিক গবেষণা বলছে, জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ইকোনমিক রিজিলিয়েন্স বা আর্থিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারে কয়েক মাস আয় বন্ধ থাকলেই বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। এর অর্থ, বেতন বৃদ্ধি তাদের স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ হলো জীবনমান উন্নয়নে কেবল আয় নয়, ব্যয়ের কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। একজন সরকারি কর্মচারী ২০১৫ সালে যে বেতনে পরিবার চালাতে পারতেন, ২০২৬ সালে একই জীবনযাত্রা বজায় রাখতে তাঁকে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে পে স্কেল বৃদ্ধি একধরনের অর্থনৈতিক দুষ্টচক্রের অংশ হয়ে উঠেছে। বেতন বাড়ে, সঙ্গে বাড়ে মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক ব্যয়, এরপর আবার নতুন বেতন বৃদ্ধির দাবি ওঠে। কিন্তু এই চক্রের মধ্যেও মানুষের প্রকৃত জীবনমান খুব সামান্যই উন্নত হয়। মানুষ কাগজে–কলমে বেশি আয় করলেও বাস্তবে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও টেকসই জীবনযাপনের সুযোগ সীমিতই থেকে যায়।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা। যদি একজন মানুষের বেতন ৫০ শতাংশ বাড়ে, কিন্তু একই সময়ে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয় ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়, তাহলে প্রকৃত উন্নয়ন খুব সামান্যই ঘটে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে অনেক চাকরিজীবী এখন আগের তুলনায় বেশি বেতন পেলেও সঞ্চয় করতে পারছেন না। এ বাস্তবতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ভিয়েতনামের কথা বলা যায়। দেশটি একসময় নিম্ন আয়ের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ছিল। কিন্তু উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে তারা আয় ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল থেকেছে এবং মূল্যস্ফীতিও তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সরকার শুধু মজুরি বৃদ্ধি করেনি, পাশাপাশি খাদ্য ও জ্বালানিতে ভর্তুকি দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ তুলনামূলক কম পড়েছে।

পে স্কেল ও মূল্যস্ফীতির অসামঞ্জস্য দূর করতে কয়েকটি বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ জরুরি।

প্রথম, দীর্ঘ বিরতিতে বড় আকারে বেতন বৃদ্ধি না করে প্রতিবছর সীমিত আকারে মূল্যস্ফীতি সামঞ্জস্যে বেতন সমন্বয় চালু করা যেতে পারে। এতে বাজারে হঠাৎ চাপ তৈরি হবে না।

সরকারি চাকরিজীবীদের সন্তানের শিক্ষা ভাতা ১৫০০ টাকা বৃদ্ধির সুপারিশ, টিফিনে ৮০০

দ্বিতীয়, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়াতে হবে।

তৃতীয়, বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশে অনেক সময় প্রকৃত সংকট ছাড়াই কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হয়। এটি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা জরুরি।

চতুর্থ, বাসাভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পিত নগরায়ণ প্রয়োজন।

পঞ্চম, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একজন কর্মচারীর আয়ের বড় অংশ এই দুই খাতে ব্যয় হয়। রাষ্ট্র যদি এসব খাতে কার্যকর সহায়তা দিতে পারে, তাহলে মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।

ষষ্ঠ, শ্রমবাজারে সামগ্রিক ভারসাম্যের জন্য বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।

সপ্তম, দুর্নীতি ও অপচয় কমাতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপরই চাপ সৃষ্টি করে।

এ ছাড়া পে স্কেল বৃদ্ধিকে শুধু সাময়িক সমাধান হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ, নির্দিষ্ট বেতনের চেয়ে স্থিতিশীল ক্রয়ক্ষমতা মানুষের প্রকৃত জীবনমান উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ভিত্তি। তাই ভবিষ্যতে জীবনমান উন্নয়নের জন্য পে স্কেল বৃদ্ধির পাশাপাশি সমন্বিত অর্থনৈতিক সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, বাজার নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় কার্যকর পে স্কেল নীতি হতে পারে ‘স্মার্ট ইনকাম রিফর্ম’। অর্থাৎ শুধু বেতন বাড়ানো নয়; বরং স্বাস্থ্য, আবাসন ও শিক্ষা ব্যয় কমাতে রাষ্ট্রীয় সহায়তা বৃদ্ধি করা। কারণ, প্রকৃত জীবনমান উন্নয়ন নির্ভর করে মানুষের মোট ব্যয় কতটা নিয়ন্ত্রিত, তার ওপর। কারণ, বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন মানুষ মাস শেষে শুধু টিকে থাকে না; বরং নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্নও দেখতে পারে।

লেখক: অনজন কুমার রায়, ব্যাংক কর্মকর্তা

Read full story at source