‘জীবনে অনেক দুর্ভোগ পাইছি, ইবারের লাখান এমন কষ্ট আর ফওয়াছিনা’

· Prothom Alo

হবিগঞ্জে খোয়াই নদের বাঁধ ভেঙেছে তিন দিন আগে। বন্যার পানিতে এখনো হাজারো মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছেন। উঁচু এলাকার পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চলের অনেক গ্রামের ঘরবাড়িতে এখনো দুই থেকে আড়াই ফুট পানি। আজ রোববার সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। অনেক পরিবার ঘরের ভেতরে পানির মধ্যে বসবাস করছে। রান্না, বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ ও শৌচাগার ব্যবহারও হয়ে উঠেছে কষ্টকর।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, ভাঙা বাঁধ মেরামতের কাজ আগামীকাল সোমবার শুরু হবে। তবে বন্যাকবলিত মানুষের অভিযোগ, জেলা প্রশাসনের দেওয়া শুকনা খাবার ও ত্রাণ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

Visit afnews.co.za for more information.

সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের সুঘর গ্রামের বাসিন্দা হেমেন্দ্র দাস (৭০) প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই বয়সে এমন কষ্ট আর সহ্য হচ্ছে না। ঘরের ভেতর পানি, রান্না করতে পারছি না। শুকনা জায়গা না থাকায় খাটের ওপর কোনোমতে বসবাস করছি। যা খাবার ছিল, সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন সবচেয়ে বেশি দরকার শুকনা খাবার আর বিশুদ্ধ পানি।

প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ও ৬ হাজার ৪০০ পরিবার পানিবন্দী হয়েছে বলে প্রথম আলোকে জানান হবিগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৬০০টি শুকনা খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় খোয়াই নদের এই ভাঙা বাঁধ দিয়ে এখনো লোকালয়ে পানি ঢুকছে

গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার কালীগঞ্জ-চরহামুয়া এলাকায় খোয়াই নদের ডান তীরের বাঁধের প্রায় ৩০০ ফুট অংশ ভেঙে যায়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে নদের পানি আশপাশের গ্রামে ঢুকে পড়ে। সদর উপজেলার কালীগঞ্জ, চরহামুয়া, বনগাঁও, সুঘর, বৈদ্যেরবাজারসহ অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। হবিগঞ্জ-ধুলিয়াখাল-মিরপুর আঞ্চলিক সড়কে টানা তিন দিন যান চলাচল বন্ধ ছিল। আজ থেকে সীমিত পরিসরে যান চলাচল শুরু হয়।

আজ দুপুরে কালীগঞ্জ-চরহামুয়া এলাকার ভাঙনস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নদের পানি কিছুটা কমলেও ভাঙা অংশ দিয়ে এখনো লোকালয়ে পানি ঢুকছে। স্রোতের তীব্রতা কমলেও পানি নামার গতি ধীর। স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য, বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নদের পানির চাপ কিছুটা কমেছে।

জাহিদা খাতুন (৭০)নদীর বানখানা ফট কইরা ভাইঙা পানি আফরে আওয়া শুরু করছে। বুঝার আগেই বাড়িঘর তল হইয়া গেছেগা। অখন ঘরের ভিতরে পানি নিয়ে আছি। রাইত ঘুম হয় না। খাবারের কষ্ট, ওষুধের কষ্ট—সব মিলাইয়া খুব অসহায় অবস্থায় আছি।

লস্করপুর ইউনিয়নের হাতিরথান, নোয়াবাদ, সুঘর, আব্দাখাই, চরহামুয়া, বনগাঁও, কালীগঞ্জ ও কাটিয়াদি গ্রামের অধিকাংশ ঘরবাড়ি এখনো পানির নিচে। অনেক বাড়ির উঠান, রান্নাঘর ও গবাদিপশুর খোঁয়াড় ডুবে গেছে। কোথাও বাঁশের সাঁকো বানিয়ে, আবার কোথাও ছোট নৌকায় চলাচল করছেন মানুষ। অনেকে উঁচু ঘর বা স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিলেও নিজেদের বসতভিটা ছাড়েননি।

বনগাঁও গ্রামের সিরাজ মিয়া (৬৫) বলেন, ‘আমাদের ঘরে প্রায় আড়াই ফুট পানি। গরু-ছাগল নিরাপদ জায়গায় রাখতে হয়েছে। কৃষিজমির সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই পানি না নামলে আরও বড় ক্ষতি হবে।’

হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বনগাঁও গ্রাম এখনো পানিতে ডুবে আছে। আজ রোববার সকালে তোলা

চরহামুয়া গ্রামের জাহিদা খাতুন (৭০) চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘জীবনে অনেক দুর্ভোগ পাইছি। ইবারের লাখান এমন কষ্ট আর ফওয়াছিনা। নদীর বানখানা ফট কইরা ভাইঙা পানি আফরে আওয়া শুরু করছে। বুঝার আগেই বাড়িঘর তল হইয়া গেছেগা। অখন ঘরের ভিতরে পানি নিয়ে আছি। রাইত ঘুম হয় না। খাবারের কষ্ট, ওষুধের কষ্ট—সব মিলাইয়া খুব অসহায় অবস্থায় আছি।’

খোয়াই নদের বাঁধ ভাঙার কারণ নিয়ে জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভায় বলা হয়েছে, বাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে নদে পানির চাপ বাড়লে সেটি ভেঙে যায়।

জেলা প্রশাসক জি এম সরফরাজ বলেন, ভাঙনের জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভাঙা বাঁধ দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

হবিগঞ্জে খোয়াই নদের বাঁধ ভেঙে ২৫ গ্রাম প্লাবিত

Read full story at source