আত্মহত্যা বলে প্রচার, ময়নাতদন্তে বেরিয়ে এল খুন, কে খুন করল ফাতেমা আক্তারকে
· Prothom Alo

২০২০ সালে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ফাতেমা আক্তারের (২০) মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করা হলেও ময়নাতদন্তে মাথায় আঘাত ও শ্বাসরোধে হত্যার প্রমাণ মেলে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হলেও ছয় বছরে তদন্ত শেষ হয়নি। আটবার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে। ডিবির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালত বাতিল করে সিআইডিকে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন। বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে। পরিবারের অভিযোগ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে বিচার বিলম্বিত হচ্ছে।
ছয় বছর আগে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার নিজ বাড়ি থেকে ফাতেমা আক্তারের (২০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথমে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে প্রচার করা হয়েছিল। পরে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে উঠে আসে, তাঁকে মাথায় আঘাত ও শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এরপর হত্যা মামলা হয়, প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু হত্যারহস্যের জট খোলেনি আজও।
Visit rouesnews.click for more information.
২০২০ সালের ১৯ জুলাই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয় লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার কেরোয়া ইউনিয়নের লুদুয়া গ্রামের ভূঁইয়াবাড়িতে। ফাতেমা আক্তার ওই বাড়ির মৃত সিরাজুল ইসলামের মেয়ে। ঘটনার দিন ফাতেমা একা ছিলেন বাসায়। পরিবাবের দাবি, পারিবারিক শত্রুতার জের ধরে তাঁকে প্রতিবেশীরা খুন করেছেন।
ফাতেমা হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে ছয় বছর ধরে। এর মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছেন আটবার। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বারবার বলা হয়েছে, তদন্ত শেষ পর্যায়ে; শিগগিরই আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। কিন্তু সেই উপযুক্ত সময় এখনো আসেনি। বর্তমানে মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হাতে। তারা ছয় বছরেও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
ফাতেমা হত্যার তদন্তের এই দীর্ঘসূত্রতায় হতাশ তাঁর পরিবারের সদস্যরা। মামলার বাদী ও ফাতেমার বোন সারাবান তহুরা বলেন, বারবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার তো দূরের কথা, ছয় বছরেও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।
সারাবান তহুরা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এক কর্মকর্তা বলেন তদন্ত শেষ পর্যায়ে, আবার নতুন কর্মকর্তা এসে নতুন করে তদন্তের কথা বলেন। ছয় বছর ধরে আমরা শুধু আশ্বাসই শুনছি। তৎকালীন সরকারের একটি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।’
আত্মহত্যা থেকে হত্যা
পুলিশ ও মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ১৯ জুলাই রায়পুরে নিজ বাড়ি থেকে ফাতেমা আক্তারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তখন ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে প্রচার করা হয়। পরিবারের দাবি, খুনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এমন প্রচারণা চালিয়েছিল। এ কারণে ওই সময় থানায় পুলিশ একটি অপমৃত্যু মামলা করে।
তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য উঠে আসে। ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনটি রায়পুর থানায় পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, মাথায় আঘাত ও শ্বাস রোধ করে ফাতেমাকে হত্যা করা হয়েছে।
ফাতেমা হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে ছয় বছর ধরে। এর মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছেন আটবার। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বারবার বলা হয়েছে, তদন্ত শেষ পর্যায়ে; শিগগিরই আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। কিন্তু সেই উপযুক্ত সময় এখনো আসেনি। বর্তমানে মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হাতে। তারা ছয় বছরেও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওই বছরের ২৯ আগস্ট ফাতেমার বোন সারাবান তহুরা বাদী হয়ে রায়পুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে ফাতেমা আক্তারকে নিজ কক্ষে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়। সেদিন ফাতেমা একা ঘরে ছিলেন। হত্যায় অংশ নেন একই বাড়ির রায়হান, রাইমা বেগম, শারমিন আক্তার, মো. ইয়াসিনসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজন। মামলায় ওই চারজনকে আসামি করা হয়। পুলিশ প্রধান আসামি রায়হানকে গ্রেপ্তার করে। পরে অবশ্য তিনি আদালত থেকে জামিন পান।
কিন্তু এরপরও তদন্তের গতি থেমে যায়। মামলাটি হস্তান্তর করা হয় গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি)। ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হোসেন ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মামলাটি নিষ্পত্তির আবেদন করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাতেমাকে মাথায় আঘাত ও শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হলেও তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী, নির্ভরযোগ্য বা পরোক্ষ সাক্ষী পাওয়া যায়নি। অন্য কোনো ব্যক্তি ফাতেমাকে হত্যা করেছেন—এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও তদন্তে পাওয়া যায়নি। ফলে ভবিষ্যতে মামলায় কোনো সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে ডিবির ওই প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হতে পারেনি ফাতেমার পরিবার। ২০২২ সালের ৫ মে মামলার বাদী সারাবান তহুরা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন। শুনানি শেষে আদালত ডিবির তদন্ত প্রতিবেদন বাতিল করে মামলাটি আবার তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন। এরপর শুরু হয় সিআইডির তদন্ত। কিন্তু ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই তদন্তেরও শেষ হয়নি।
জানতে চাইলে তৎকালীন ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি বর্তমানে অবসরে আছি। ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত না করার অভিযোগ সঠিক নয়। যতটুকু মনে পড়ে, তদন্তের সময় যেসব তথ্য-উপাত্ত পেয়েছি, সেগুলোর ভিত্তিতেই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছি।’
আট তদন্ত কর্মকর্তা বদল
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিআইডিতে মামলাটি যাওয়ার পর এ পর্যন্ত পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছেন। এর আগে পুলিশ ও সিআইডিতে তিনজন কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়। একেক সময় একেক কর্মকর্তা দায়িত্ব নিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মামলার তদন্তের অগ্রগতিও যেন নতুন করে শুরু হয়।
কখনো সিআইডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আবার কখনো বলা হয়েছে, নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ বলা হচ্ছে, কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। কিন্তু ছয় বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা পরিবারের সদস্যরা এখন আর এসব আশ্বাসে ভরসা করছেন না।
সারাবান তহুরা, নিহত ফাতেমা আক্তারের বোন ও মামলার বাদী। ‘এক কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত শেষ পর্যায়ে, আবার নতুন কর্মকর্তা এসে নতুন করে তদন্তের কথা বলেন। ছয় বছর ধরে আমরা শুধু আশ্বাসই শুনছি। তৎকালীন সরকারের একটি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।’বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন সিআইডির ইন্সপেক্টর ওবায়দুল ইসলাম। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলাটি আমি গত ছয় মাস ধরে তদন্ত করছি। নানান দিক থেকে ক্লু (সূত্র) পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।’
মামলার ৬ নম্বর সাক্ষী রেহানুজ্জামান রনি ভূঁইয়া বলেন, ডিবি তদন্তের সময় তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে যথাযথভাবে তদন্ত করেননি। এরপর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ফাতেমাকে মাথায় আঘাত ও শ্বাস রোধ করে হত্যার কথা উল্লেখ থাকলেও হত্যাকারীকে শনাক্ত করার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
রেহানুজ্জামানের ভাষ্য, ‘ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে হত্যার কথা বলা হয়েছে। হত্যাকারীকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব ছিল তদন্ত কর্মকর্তার। অথচ তদন্ত না করেই মামলাটি নিষ্পত্তির আবেদন করা হয়েছে। তৎকালীন সরকারের একটি রাজনৈতিক তদবিরের কারণে এমনটি করা হয়েছিল বলে আমরা মনে করি।’
ফাতেমার মৃত্যুর পর থেকেই মা হাসনা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই তাঁর। কথা বলেন খুব কম। বেশির ভাগ সময়ই চুপচাপ, অন্যমনস্ক হয়ে থাকেন। ছয় বছর ধরে মেয়েকে হারানোর সেই শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।
হাসনা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিচার তো দূরের কথা, ছয় বছরেও আমার মেয়েকে কে, কেন হত্যা করেছে—সেই রহস্যই বের হলো না। এই অবস্থায় কীভাবে বিচারের আশা করি? তবু মা তো, আশা ছাড়তে পারি না। আশা করি, খুব শিগগির ফাতেমা হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হবে, খুনি ধরা পড়বে এবং আমরা মেয়ের হত্যার বিচার পাব।’
মামলার প্রধান আসামি মো. রায়হান অভিযোগ অস্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফাতেমা আত্মহত্যা করেছেন। তাঁদের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জেরে আমাদের অন্যায়ভাবে এ মামলায় জড়ানো ও হয়রানি করা হচ্ছে।’